দুই দলের লাখ লাখ সমর্থক বাংলাদেশে। ফুটবল নিয়ে এ দেশের মানুষের উন্মাদনা ও ভালোবাসায় আমি অভিভূত। আমরা বাংলাদেশের জার্সি পরে মাঠে নামলেও অনেক সমর্থন পাই। সবার শুভকামনা থাকে আমাদের সঙ্গে। আজ সেই ভালোবাসা দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ব্রাজিল, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা। কেউ বলছেন ব্রাজিল জিতবে, কেউ আর্জেন্টিনা। চলছে নিরন্তর জল্পনা।

সমর্থকদের দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা মজা রয়েছে। অনেক পরিবারের অন্দরেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নামের দেশ দুটি ঢুকে পড়েছে। সে অবশ্য আজ হঠাৎ নয়, অনেক আগে থেকেই। পরিবারের অন্দরেও তর্কের তুবড়ি ছোটে—নেইমার না মেসি? আমার পরিবারও এ থেকে মুক্ত নয়। যদি জানতে চান আমি কোন দলের সমর্থক, একটা ক্লু দিই আপনাদের। আমার বড় ভাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাঁর সঙ্গে আমার অনেক খুনসুটি হয়। ভাইয়ের বিপরীত মেরুতে আমার অবস্থান। হ্যাঁ, ব্রাজিলের প্রতি বাড়তি একটা ভালোবাসা আমার আজও রয়েছে।

পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পর আমি ছোটবেলার মতো ফুটবল আবেগে ভাসতে পারি না। তবে ছোটবেলায় ব্রাজিলের এবং রোনালদো আর রোমারিও ছিলেন আমার আদর্শ। বিশ্বকাপসহ সব টুর্নামেন্টেই সেলেসাওদের খেলা দেখতে একটু বেশিই উদ্‌গ্রীব থাকতাম।

তবে একজন ফুটবল সমর্থক হিসেবে আজ চাইব, দারুণ একটি ফাইনাল হোক। পুরোদস্তুর পেশাদার একটা লড়াই দেখার অপেক্ষায় আছি। সেই মঞ্চও প্রস্তুত। আসলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ধ্রুপদি ফুটবল দেখতে এর চেয়ে বড় উপলক্ষ আর হতেই পারে না। ফাইনাল জিততে পারে দুই দলের যে কেউ। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের গন্ধ পাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত যে-ই জিতুক, এ লড়াই থেকে বাড়তি একটা চাওয়া আছে আমার। অন্তত ৪-৫টা গোল যেন হয় ফাইনালে। ০-০ স্কোরলাইন শেষে টাইব্রেকারে জয়—এমনটা হলে ভালো লাগবে না মোটেও। আমি গোলময় ফাইনাল দেখতে চাই।

আর্জেন্টাইন সমর্থকের মুখে বহুদিনের পুরোনো হাহাকার আবার দেখছি। লিওনেল মেসি এত বছরেও জাতীয় দলের জার্সিতে কোনো ট্রফি জিতলেন না। জানি না, এটিই তাঁর শেষ সুযোগ কি না। কিন্তু আজ (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল) ব্রাজিল জিতে গেলে মেসি হতাশ হবেন আরেকবার। তাঁর জন্য খারাপ লাগবে আমার। তবে চাইব মেসি নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে এই টুর্নামেন্টে নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সটা অব্যাহত রাখুন।

তবে মেসি যতই তাঁর ফুটবলশৈলী দিয়ে গোটা বিশ্বকে মোহিত করুন, ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে টপকে যেতে পারেননি বলেন অনেকে। ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ জিতেছেন। মেসি সেটি পারেননি। এমনকি কোপার শিরোপাও জেতা হয়নি মেসির। তাই আজ (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল) আর্জেন্টিনার মানুষের বিপুল প্রত্যাশা তাঁকে ঘিরে। সেই প্রত্যাশা পূরণের বিষম চাপ নিয়ে ফাইনালটা খেলতে নামবেন বার্সেলোনা তারকা। আমি মনে করি, মেসি নিজের সর্বোচ্চ মেধা দিয়েই চেষ্টা করবেন এই ফাইনালটা অন্তত স্মরণীয় করে রাখতে।

তবে মনে রাখতে হবে, ব্রাজিল খেলবে নিজ দেশে। কোপার বর্তমান চ্যাম্পিয়নও ওরা। গত টুর্নামেন্টের ফাইনালে পেরুকে হারিয়েছে ৩-১ গোলে। এবারও ছন্দে থাকা তিতের দল শিরোপা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। এ কারণেই মনে করছি, ব্রাজিলের হাত থেকে ট্রফি কেড়ে নেওয়া সহজ হবে না আর্জেন্টিনার জন্য।

ছন্দে থাকা নেইমার তাঁর ঝলকটা ধরে রাখতে পারলে আর্জেন্টিনার জন্য বিপদ হতে পারে। অন্যদিকে মেসি নামের জাদুকর একাই জেতাতে পারেন আর্জেন্টিনাকে। এই টুর্নামেন্টে তাঁর গোল ৪টি এবং ৫টি গোলে সহায়তা করছেন। নেইমারের ২টি গোল এবং ৩টিতে সহায়তা। টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার দৌড়ে মেসি এগিয়ে থাকলেও নেইমার প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। ফাইনালে ব্রাজিল জিতলে টুর্নামেন্ট সেরার লড়াইয়ে নেইমার থাকবেন প্রবলভাবে।

যে-ই শেষ হাসি হাসুন, ইউরো ও কোপা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। এই দুটি মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট একই সময়ে হওয়ায় ফুটবল আমাদের ভাবনার জগতেও টোকা মারছে। আমরা এই টুর্নামেন্টগুলো থেকে নিশ্চয়ই ভালো কিছু গ্রহণ করব। কোপার ম্যাচগুলো অনেক বেশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভরা, ইউরো বেশি ট্যাকটিক্যাল। আজ (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল)ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা ফুটবলাররা তাঁদের ঝলক দেখাবেন, তাঁদের পায়ে গোলবহুল সুন্দর ফুটবলের ফুল ফুটবে, সেই প্রত্যাশাই রইল।