তাঁর সাফল্যের শুরুটা আতলেতিকো মাদ্রিদে, চার মৌসুমের মধ্যে দুবার লিগ জয়। এরেরাই সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি ফুটবল ক্যাম্পের নামে তাঁর খেলোয়াড়দের ‘মিলিটারি ট্রেনিং’ করাতেন। আতলেতিকোর আলফন্সো আপারিসিও বলতেন, ‘প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা ট্রেনিং করাত এরেরা, যা আমাদের পাগল করে দিত। উদ্দেশ্য শুধু একটাই, রবিবার এলে আমরা যাতে না হারি।’

জেনারেল ফ্রাঙ্কোর প্রিয় রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লড়াইয়ে বার্সা ভরসা খোঁজে এলেনিও এরেরার কাছে। মাঝে মালাগা, দেপোর্তিভো লা করুনিয়া ও সেভিয়ার দায়িত্বে থাকা এরেরাকে ১৯৫৮ সালে টানা হলো কাতালুনিয়ায়। এরেরার অধীন শুরু হলো অনুশীলন। প্রথম দিকে ফুটবলাররা বমি করতেন প্রতিদিন, এতটাই চরমভাবাপন্ন তাঁর পদ্ধতি। দুই বছর পর এরেরা যখন বার্সার দায়িত্ব ছাড়েন, তখন তাঁর নামের পাশে আরও দুটি লিগ শিরোপা।

ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন এমনই। সংযত পরিমাণে খেতেন, সিগারেট কিংবা মদ ছুঁতেন না, যোগব্যায়াম করতেন প্রতিদিন। আর সব সময় বলতেন, ‘যে সবকিছু উজাড় করে দেয় না, সে কিছুই দেয় না।’ ১৯৬০ সালে বার্সা ছেড়ে ইন্টার মিলানে যোগ দেয় এলেনিও এরেরা। তাঁর গল্পটা আসলে শুরু হলো মাত্র।

যেকোনো ফুটবল ইতিহাস লেখার সময় সমসাময়িক একটি দেশ বা ক্লাবকে ঘিরেই লেখা হয়। কাতেনাচ্চিওর প্রসঙ্গ এলে সবার আগে নাম আসে এলেনিও এরেরা ও তাঁর সেই ইন্টার মিলানের কথা। ষাটের দশকের এরেরার সর্বজয়ী ক্লাব দ্য গ্রেট ইন্টারন্যাসিওন্যাল। এরেরার মতে, কাতেনাচ্চিও তাঁরই আবিষ্কার, আর এর নাম ‘দ্য সিমেন্ট সিস্টেম’।

যদিও ইতালিয়ান ফুটবলের ‘বাইবেল’ দ্য ক্যালসিওতে জন ফুটের দাবি, তখনকার ইন্টার সভাপতি অ্যাঞ্জেলো মোরাত্তির পরামর্শে এরেরা ডিফেন্সিভ ফুটবলে মনোযোগী হন। কারণটা অনুমেয়। ইন্টার গোল করত, গোল খেত, মাঝেমধ্যে সেটা এত বেশি হতো যে ম্যাচ হারত।

যে কারণেই হোক, এরেরা বেছে নিলেন একটু বেশি রক্ষণাত্মক পন্থা। ডিফেন্ডারে মনোযোগ এল আর জিয়াসিন্তো ফাচেত্তির আবির্ভাব। ইন্টারের যুবদল থেকে উঠে আসা ফাচেত্তির অভিষেক ম্যাচটাও বেশ কয়েকটি কারণে স্মরণীয়। লিগ কমিটির কোনো এক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এরেরা যুবদলের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দল নামিয়ে দেন তা–ও আবার ওমর সিভোরির শক্তিশালী জুভেন্টাসের বিপক্ষে। সিভোরি একাই করেন ছয় গোল আর তুরিনের ক্লাব ম্যাচটি জেতে ৯-১ ব্যবধানে। দুটিই ছিল তখনকার রেকর্ড।

১৯৬২ সাল থেকেই ইন্টারের জার্সি নিয়মিত পরা শুরু ফাচেত্তির। এরেরা ফাচেত্তিকে সেন্টারব্যাক থেকে পাঠালেন লেফটব্যাকে আক্রমণে অংশ নেওয়ার জন্য। আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক, বর্তমানের দানি আলভেজ, মার্সেলো বা আলেকজান্ডার আরনল্ডদের দেখা সেই পঞ্চাশ-ষাটের যুগেও মিলত। ফাচেত্তিই ছিল প্রথম দিককার পরিপূর্ণ ফুটবলার, যিনি রক্ষণ সামলে আক্রমণে যেতেন এবং গোলও করতেন। এমনকি এক মৌসুমে ফাচেত্তি ১০ গোলও করেন।

১৯৫৪ সালের পর থেকেই ইন্টার কোনো শিরোপা জেতেনি। এরেরা এসেই যে লিগ জিতে গেছেন, এমন নয়। তবে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ছিল। ১৯৬১ সালে ইন্টার হলো তৃতীয়, আর ১৯৬২–তে দ্বিতীয়। ১৯৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপে স্পেনের দায়িত্বও পালন করে আসেন, যদিও স্পেন সেবার গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি।

১৯৬৩ সালেই ইন্টারের ঘরে এল লিগ। সাংবাদিকেরা এরেরাকে ডাকতে লাগলেন ‘এল ম্যাগো’ মানে জাদুকর নামে। যদিও এরেরার পছন্দ হয়নি এ নাম। উল্টো বলতেন, ‘আমার পাওয়া সেরা প্রশংসা ছিল, কেউ একজন বলেছিল, আমি দিনে ৩০ ঘণ্টা কাজ করি।’ ইন্টারের ফুটবলার স্যান্দ্রো মাজ্জোলা তো কোনো রাখঢাক না করেই বলতেন, এরেরার আগে কেউ কোচদের মনেই রাখত না।

রক্ষণে জিয়াসিন্তো ফাচেত্তি, আরমান্দো পিচ্চি, গুয়ারনেরি আর তারচিসিও মাঝমাঠে বার্সা থেকে এরেরার সঙ্গে ইন্টারে যোগ দেওয়া লুইস সুয়ারেজ আর দুই উইংয়ে জায়ের ও করসো। একমাত্র ফরোয়ার্ড হিসেবে বিখ্যাত ফুটবলার ভ্যালেন্তিনোর ছেলে স্যান্দ্রো মাজ্জোলা। এই ছিল এরেরার হাতের গুটি। অল্প কিছু শট আর দ্রুত পাসেই খেলাতেন নিজের দলকে। ড্রিবলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষের গোলে যত তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায়, ততই মঙ্গল। পরের বছর মানে ১৯৬৪ সালে ইন্টারের পরম আকাঙ্ক্ষার চ্যাম্পিয়নস লিগের ছোঁয়া। সেবার অবশ্য ইতালিয়ান লিগ জেতা হয়নি প্লে-অফে বোলোনিয়ার কাছে হেরে যাওয়ায়।

ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে ইন্টার। মাজ্জোলার জোড়া গোলেই জয়টা সহজ হয়ে যায়। যদিও পুরো মাদ্রিদ দলকে সেদিন ভিয়েনায় পাগল করে দিয়েছিলেন লেফটব্যাক ফাচেত্তি। আলফ্রেডো ডি স্টেফানোও ফাচেত্তির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ইন্টারের কাতেনাচ্চিওর কাছেই হার মানতে হলো রিয়াল মাদ্রিদের। লিবেরো/সুইপার আরমান্দো পিচ্চি এতটাই নিচে খেলেছেন যে স্টেফানো বলতে বাধ্য হলেন, ‘সবাইকে এড়িয়ে গিয়েও দেখতাম, কেউ না কেউ ঠিকই রয়ে গেছে, এরা কি ১২ জন নিয়ে নেমেছে?’

কাতেনাচ্চিওর আবিষ্কারক কে, এ নিয়ে চলে ব্যাপক তর্কাতর্কি। এরেরা বলতেন, ডিফেন্ডার হিসেবে খেলা অবস্থায় তিনি নিজেকে ইচ্ছা করেই অনেক নিচে রাখতেন, আর সেখান থেকেই তো আসে এই কাতেনাচ্চিও।

প্রকৃতপক্ষে এরেরা কাতেনাচ্চিওর আবিষ্কারক না হলেও তিনিই ছিলেন এর সবচেয়ে ভালো ব্যবহারকারী। আর তিনিই এ পদ্ধতিকে সবচেয়ে জনপ্রিয় করেছেন। কাতেনাচ্চিও নিয়ে লিখতে চাইলে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির কথা না বললে চলে না। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির সেরা বই ছিল ‘দ্য প্রিন্স’। সেখানে একজন প্রিন্সের কেমন হওয়া উচিত, তা বলেছিলেন; এটাও বলেছিলেন, যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। যাঁরা এমন কাজে দক্ষ, তাঁদের বলা হয় ম্যাকিয়াভেলিয়ান।

এলেনিও এরেরাও ম্যাকিয়াভেলিয়ানদের মতোই প্রাপ্ত সব সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। ম্যাচ ফিক্সিং, ঘুষ, ডোপিং—অনেক বারই তাঁর বিরুদ্ধে এসব নিয়ে কথা উঠেছে, কিন্তু প্রমাণ মেলেনি। এরেরা নীতিগতভাবে সব সময় সঠিক পথে চলতেন, এটা বলার উপায় নেই। হাজার হলেও ম্যাকিয়াভেলিয়ান চরিত্র! ইন্টার মিলান পরের মৌসুমেও চ্যাম্পিয়নস লিগ ঘরে তোলে বেনফিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে।

১৯৬৬ সালে ইতালিয়ান লিগ জিতলেও সেবার চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিতেই বাদ পড়ে ইন্টার। পরেরবার জক স্টেইনের সেল্টিকের কাছে ফাইনালে হার। আর এতেই অনেকেই ইন্টারে এলেনিও এরেরার শেষ দেখতে পেলেন। আবার ঘুরতে বের হলেন। রোমা হয়ে আবার ইন্টার। সেখান থেকে আবার কিছুদিন বার্সেলোনায় গিয়ে ইতি টানলেন কোচিং ক্যারিয়ারের। যদিও ইন্টারের সে সাফল্যের ধারেকাছেও যেতে পারেননি আর।

এরেরা শুধু একজন ভালো কৌশলী ছিলেন না, ছিলেন পারফেকশনিস্ট। ১৯৯৭ সালে পরলোকে চলে যাওয়া এরেরা বলতেন, ‘নিজের জন্য যারা খেলে, তারা আসলে খেলে প্রতিপক্ষের জন্য; আর দলের জন্য যারা খেলে, তারা খেলে নিজের জন্য।’ একবার এক ফুটবলারকে এরেরা নিষিদ্ধ করেছিলেন। দোষ, সে ফুটবলার ‘আমরা রোমে জিততে এসেছি’ না বলে বলেছিলেন ‘আমরা রোমে খেলতে এসেছি’। খুঁটিনাটি এসব বিষয়ে চোখ ছিল বলেই ফুটবলের প্রথম সেলিব্রিটি কোচ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন এরেরা। এ কারণেই সব ক্লাবের পরিচয় যখন তাদের সেরা খেলোয়াড় দিয়ে হতো, সেখানে ইন্টারকে বলা হতো এরেরার ইন্টার।

এরেরাকে চাইলে বলতে পারেন সার্কাসের ক্লাউন, জিনিয়াস, অভদ্র, যোগী, মেগালোম্যানিয়াক—যা ইচ্ছা। সিদ্ধান্ত আপনার! কিন্তু আরেকটি এরেরার দেখা মিলবে না। জাদুকর নামে আপত্তি তোলা এই কোচের আজ ১১২তম জন্মদিন।