জার্মানির বিপর্যয়ে ‘আনন্দিত’ ব্রাজিল।
জার্মানির বিপর্যয়ে ‘আনন্দিত’ ব্রাজিল।ছবি: রয়টার্স

২০১৪ সালের ৯ জুলাই। স্থান ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তে। এস্তাদিও দি মিনেইরোতে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি স্বাগতিকেরা। গ্যালারি ছেয়ে গেছে হলুদ রঙে। সবারই প্রত্যাশা ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলবে ব্রাজিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশার চাপেই কিনা ব্রাজিল ভেঙে পড়ল। জার্মানির কাছে হেরে গেল ৭-১ গোলে।

সমর্থকদের কাছে অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ছিল জার্মান ফুটবলারদের কাছেও। একেকটি গোল ব্রাজিলের জালে দিয়ে তারাই যেন চমকে উঠছিল। ফুটবল ইতিহাসে ‘মিনেইরো ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত সেই ম্যাচটি ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের চিরকালীন ক্ষত হয়ে আছে। এমনকি ঘরের মাঠে ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে যাওয়ার ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’কেও যেন ছাপিয়ে গেছে ‘মিনেইরো ট্র্যাজেডি’।

ছয় বছর ধরে সেই কষ্ট তাড়া করে বেরিয়েছে ব্রাজিলীয় ফুটবলপ্রেমীদের। কিন্তু বুধবার রাতে হঠাৎ করেই যেন সেই কষ্টে বড় ধরনের এক প্রলেপ লেগে গেল ব্রাজিলের মানুষের। যে জার্মানি তাদের ৭-১ গোলে হারিয়েছিল, তারাই এবার স্পেনের কাছে হেরে গেল ৬-০ গোলে। ইউরোপিয়ান নেশনস লিগের ম্যাচে জার্মানদের এই হারও ফুটবল দুনিয়ার কাছে অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয় ঠেকেছে। ইতিহাস বলছে ফুটবলে চিরদিনই ‘যন্ত্র’ হিসেবে পরিচিত জার্মানরা এর আগে এমন ব্যবধানে হেরেছে প্রায় ৯০ বছর আগে। ব্রাজিলের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জার্মানির ভাগ্য বিপর্যয়ে রীতিমতো উল্লসিত। ব্রাজিলীয় ফুটবলপ্রেমীরা যেন ‘এবার একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারব’ জাতীয় অনুভূতির দেখা পেলেন। এস্তাদিও দি মিনেইরোর মতো সেভিয়ার কার্তুজা স্টেডিয়াম করোনাভাইরাসের কারণে খালি ছিল তো কী হয়েছে!

default-image
বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলীয়দের উল্লাসের একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে ‘এস্পোর্তে ইন্তারাতিভো’ নামের একটি টেলিভিশন চ্যানেল। এই চ্যানেলটিই সেদিন ইউরোপিয়ান নেশনস লিগে জার্মানি-স্পেনের ম্যাচটি ব্রাজিলে সম্প্রচার করেছে। ইন্তারাতিভো ব্রাজিলীয়দের সরাসরি নির্মল আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েই থেমে থাকেনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষকে এর সঙ্গে সম্পৃক্তও করেছে। টুইটারে টুইট করে তারা রীতিমতো উল্লাস প্রকাশ করেছে নিজেদের মতো করেই। ইন্তারাতিভোর কল্যাণে গোটা ব্রাজিলই যেন সেদিন পরিণত হয়েছিল স্পেনের সমর্থকে। নিরপেক্ষ দর্শকদের কাছে ব্যাপারটি কিছুটা ‘বিকৃত আনন্দ’ মনে হলেও ব্যাপারটা কিন্তু বোধগম্য।

ব্রাজিলের ছয় বছর আগের সেই কষ্টটি অনুভবের বিষয়। একটা দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তারা বিশ্বকাপের চিরকালীন ফেবারিট। দলটি সেমিফাইনাল পর্যন্তও উঠে গেল তরতরিয়ে। দর্শক-সমর্থকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে সেমির আগে। শেষ চারের লড়াইয়ে জিতে ফাইনালে তারা কেবল উঠবেই না, শিরোপা জিতেও সবাইকে আনন্দে ভাসাবে। এমন সময় বিপর্যয়। ভীষণ বিপর্যয়। খেলায় হার–জিত আছে। তাই বলে ৭-১ গোলে হেরে বিদায়! ব্রাজিলীয় ফুটবল অহমে এর চেয়ে বড় আঘাত আর আছে নাকি! কেবল সে কারণেই যদি ব্রাজিলীয়রা ফুটবল মাঠে জার্মানদের একটি বিপর্যয় দেখার জন্য কায়মনো-প্রার্থনায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকে, তাহলে তাদের খুব দোষ দেওয়া যায় না।

ফুটবল খেলাটাই এমন। দুটি সম্পূর্ণ। ভিন্ন দৃশ্যপটের অনুষঙ্গ। কখনো এটি আনন্দ, কখনো তীব্র বেদনার মঞ্চ। জার্মানরা ক ২০১৪ সালের ৯ জুলাই বেলো হরিজন্তেতে ভেবেছিল, এমনই একটা বিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য। বিশ্বকাপ আর নেশনস লিগের প্রেক্ষিত পুরো ভিন্ন হলেও ৬-০ গোলের হার জার্মান অহমকে ব্রাজিলের মতোই যে আঘাত দিয়েছে। যে আঘাতের ক্ষত মুছে ফেলা খুব সহজ নয়।

মন্তব্য পড়ুন 0