তরুণ ফুটবলারদের জন্য বরুসিয়া ডর্টমুন্ড আদর্শ এক ক্লাব।
তরুণ ফুটবলারদের জন্য বরুসিয়া ডর্টমুন্ড আদর্শ এক ক্লাব।ছবি: রয়টার্স

২০ নভেম্বর, ২০২০। এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন বরুসিয়া ডর্টমুন্ড সমর্থকেরা। না, এদিন তাঁরা কোনো ট্রফি জেতেননি যে বর্ষপূর্তির উদ্‌যাপন করবেন। দিনটায় ডর্টমুন্ডের কোনো ম্যাচও নেই যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিরতি শেষে এ ম্যাচের অপেক্ষায় ছিলেন সবাই।

তবু কেন ২০ নভেম্বরের জন্য এভাবে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা? কেন এ দিনটায় প্রকাশের জন্য আগে থেকেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করে রেখেছে ইউরোপের ফুটবল–সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম।

কারণ, আজই বয়সটা ১৬ হলো ইউসুফা মৌকোকোর। কে এই মৌকোকো? প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এই কিশোরের পরিচয়টা তাহলে দিয়ে ফেলা যাক।

বিজ্ঞাপন
default-image

এই কিশোর খেলে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। জন্ম ক্যামেরুনে হলেও বয়সভিত্তিক দলে খেলার জন্য জার্মানিকে বেছে নিয়েছে সে। এই কিশোর প্রতিভা বয়সভিত্তিক দলে এমনই সাড়া ফেলেছে যে শুধু তার কারণেই জার্মানির অনেক পুরোনো এক নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ডর্টমুন্ড।

ক্লাবের প্রশ্ন, প্রতিভা আর দক্ষতা থাকলে বয়স নিয়ে চিন্তার কী আছে? নিজ যোগ্যতায় দলে জায়গা পেতে পারা একজনকে তবু নামাতে পারেনি ডর্টমুন্ড। কারণ, জার্মানিতে ১৬ বছর হওয়ার আগে কোনো ফুটবলারকে পেশাদার ফুটবলে নামানো যায় না।

ইউরোপের অধিকাংশ লিগেই এমন কঠিন নিয়ম নেই। তাই প্রায়ই ইতালিতে ১৬ পেরোনোর আগেই অভিষেকের ঘটনা দেখা যায়। স্পেনে তো গত মৌসুমেই রেকর্ড গড়েছেন ‘মেক্সিকান মেসি।’

রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ১৫ বছর ২১৯ দিন বয়সে লা লিগা অভিষেক হয়েছে লুকা রোমেরোর। লা লিগার সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলারের রেকর্ড এখন এই আর্জেন্টাইনের। কিন্তু জার্মানিতে যত দিন একজন ফুটবলার পেশাদার চুক্তি (১৬ বছর বয়সে) করতে পারে না, তত দিন তাকে নামতে দেওয়া হয় না।

এ কারণেই মৌকোকোকে এত দিন ডর্টমুন্ডের মূল দলে দেখা সম্ভব হয়নি। আগামীকাল হার্থা বার্লিনের বিপক্ষে ম্যাচ আছে ডর্টমুন্ডের। এ ম্যাচেই দেখা যেতে পারে এই কিশোর ফরোয়ার্ডকে।

অবশ্য কিছুদিন ধরে মৌকোকোকে যেভাবে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে জার্মানিতে, তাতে কালই তাকে না–ও নামাতে পারেন লুসিয়েন ফাভ্রে। ১২ বছর বয়সেই ডর্টমুন্ডের অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলেছে মৌকোকো।

বিজ্ঞাপন
default-image

সেই ডাক পাওয়া যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সেটা প্রমাণিত হয়েছে ১৪ বছরেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পাওয়াতে। সে সূত্রে জার্মানির অনূর্ধ্ব-১৬ দলেও খেলেছে সে।

কিন্তু এত কম বয়সে সংবাদমাধ্যমের অযথা আগ্রহের কেন্দ্রে যেন পড়তে না হয়, তাই তাকে কিছুদিন জার্মানির বয়সভিত্তিক দলে ডাকার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল জার্মান বোর্ড ও ডর্টমুন্ড।

বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ৮৪ ম্যাচে ১২৭ গোলই তাকে চরম প্রার্থিত এক ফুটবলার বানিয়ে দিয়েছে। এমনই অবস্থা যে পারলে এ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের স্কোয়াডেও তার নাম ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ডর্টমুন্ড কোচ লুসিয়েন ফাভ্রের ভাষায়, ‘সে খুব ভালো, অসাধারণ সম্ভাবনা। সে বাঁ পায়ে খেলে নাকি ডান পায়ে, সেটাই বুঝতে পারা যায় না। গোলের সামনে ভয়ংকর।’

এ মৌসুমে চার ম্যাচে ১৩ গোল মৌকোকোর। তিন ম্যাচে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে অন্য ম্যাচে চার গোল! এমন দুর্দান্ত ফর্ম দেখেই জার্মানির অনূর্ধ্ব-২০ দলেও ডাক মিলেছে তার।

কিন্তু কিশোর প্রতিভা তো কম নেই ইউরোপে। ডর্টমুন্ডেই আছেন গোল মেশিন আরলিং হরলান্ড। ইংল্যান্ডের জাডোন সাঞ্চোও ১৭ বছর বয়সে যোগ দিয়ে গত তিন মৌসুম ধরে আলো ছড়াচ্ছেন সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিস্ময় জিওভান্নি রেইনার বয়সও মোটে ১৮। ইংলিশ জুড বেলিংহামের বয়সও ১৮ হয়নি। ওদিকে রেনের এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা ১৮ পেরোনোর আগেই ফ্রান্সের ১০০ বছরের পুরোনো এক রেকর্ড ভেঙেছেন।

আনসু ফাতি তো বার্সেলোনার সব রেকর্ড থেকে মেসির নাম মুছে ফেলার প্রতিজ্ঞা করেই যেন নেমেছেন। স্পেনের জাতীয় দলে খেলেছেন, গোলও করে ফেলেছেন বয়স ১৮ হওয়ার আগেই। তবু কেন মৌকোকোকে নিয়ে এত আলোচনা?

default-image

ইঙ্গিতটা মিলতে পারে বার্সেলোনারই এক কিংবদন্তির কথায়। মেসি-রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের নামই বলা হয়। ২১ বছর বয়সেই যা অর্জন করেছেন ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকার, তা প্রায় অকল্পনীয়। হরলান্ড, ফাতিরাও তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন।

কিন্তু স্যামুয়েল ইতোর চোখে মেসির সঙ্গে যদি কারও তুলনা করা যায়, তবে সেটা একজনই। গত অক্টোবরে বলেছেন, ‘ডর্টমুন্ডে একটা ছেলে আছে নাম ইউসুফা মৌকোকো। ১৫ বছর বয়স। আমার চোখে মেসির পর সেই পরবর্তী সেরা খেলোয়াড়।’

নিজের দেশে জন্ম বলে মৌকোকোর প্রতি আলাদা টান থাকতেও পারে ইতোর। কিন্তু জার্মান কোচ ইওয়াখিম লুভের কণ্ঠেও তো একই ধরনের বিস্ময়, ‘ওর বয়সের একটা ছেলে যে তার চেয়ে দুই বা তিন বছরের বড়দের সঙ্গে খেলে সব সময়, সে এত গোল করছে এটা বিস্ময়কর।’

বিজ্ঞাপন

ওদিকে ফাভ্রে এখনো সবাইকে অপেক্ষায় রাখতে চাইছেন। অনুশীলনের পর আজ বলেছেন, ‘এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বার্লিনের বিপক্ষে তাকে নামানো হবে কি না। ওর দারুণ সম্ভাবনা আছে। ওর সঙ্গে অনুশীলন করে অনেক মজা পেয়েছি।’

আগামীকাল যদি বার্লিনের বিপক্ষে তাকে নামানোর সাহস না–ও দেখান ফাভ্রে, তবু এই মৌসুমেই হয়তো ভেঙে যাবে নুরে সাহিনের রেকর্ড। ডর্টমুন্ডেরই আরেক বিস্ময়বালক হয়ে উঠে আসা এই মিডফিল্ডারের ১৬ বছর ১১ মাস বয়সে অভিষেক হয়েছিল। মৌকোকোর হাতে এখনো ১১ মাস আছে।

এমন নয় যে ডর্টমুন্ড খুব করে চাইছে এমন একটি রেকর্ড নিজেদের পক্ষে নিতে। বরং হাতের কাছে থাকা এমন এক প্রতিভাকে দলের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে না পারার দুঃখটাই ছিল তাদের।

এ ব্যাপারে ক্লাবের তরুণ দল সমন্বয়ক লার্স রিকেন বলেছেন, ‘আমরা রেকর্ড ভাঙার চেষ্টা করছি না। কিন্তু অবিশ্বাস্য প্রতিভাধর তরুণদের ব্যবহার করার সুযোগ না দিয়ে অন্য লিগের ক্লাবগুলোর চেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

মন্তব্য পড়ুন 0