default-image

ওই একটা মুহূর্তের পাগলামি না করলে হয়তো পেলে-ম্যারাডোনাদের সারিতে নাম থাকত তাঁর। এমনিতেই জিনেদিন জিদান সর্বকালের সেরাদের একজন, অনেকের চোখে সেরাদের সেরা। কিন্তু জিদান নামটি বললেই অলস সৌন্দর্যে ফুটবল মাঠে সৃষ্টিশীলতার ফুল ফোটানোর দৃশ্যগুলো যেমন আসে, তেমনি আসে কিছু বিতর্কও। হয়তো আসত না, যদি এক দশক আগের বিশ্বকাপে ওই ‘দুই মিনিটের পাগলামি’টা না করতেন ফ্রেঞ্চ কিংবদন্তি। এমন আপনারও মনে হচ্ছে? তাহলে এনজো ফ্রান্সেসকোলি আপনাকে স্বাগত জানাবেন। জিদানের শৈশবের নায়ক এই উরুগুয়ে কিংবদন্তির ধারণা, জার্মানির বিশ্বকাপের ফাইনালে মার্কো মাতেরাজ্জিকে ওই ঢুঁসটা না মারলে ফুটবলের আরও উঁচু বেদিতে জায়গা পেতেন বর্তমান রিয়াল মাদ্রিদ কোচ।

মায়ামির বাড়িতে সেদিন দুই ছেলে ব্রুনো ও মার্কোকে পাশে নিয়ে ইতালি ও ফ্রান্সের ফাইনালটা দেখতে বসেছিলেন ফ্রান্সেসকোলি। এই আশায়, ম্যাচ শেষে ট্রফিতে জিদানের চুমু আঁকার দৃশ্যটা দেখতে পাবেন। সেই বিশ্বকাপে জিদানকে দেখে যে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ম্যারাডোনার কথাই বারবার মনে পড়ছিল তাঁর। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ফ্রান্সকে যেভাবে প্রায় একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, জিদানের নামই ফ্রান্সেসকোলি দিয়ে রেখেছিলেন ‘ফ্রান্সের ছিয়াশির ম্যারাডোনা’। কিন্তু জিদান আর ম্যারাডোনা হতে পারলেন কই! পারলেন না অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে ওই ‘বিখ্যাত’ ঢুঁসের কারণে। মাতেরাজ্জি অশোভন কিছু বলেছিলেন, রেগে গিয়ে তাঁর বুকে ঢুঁস মেরে বসলেন জিজু। টিভির সামনে বসা ফ্রান্সেসকোলির মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, ‘কী পাগলামি! কী নির্বুদ্ধিতা!’

default-image

পরে ফিফা ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সেসকোলি বলেছিলেন, ‘ খুবই উগ্র ব্যাপার । এটা ওর চারিত্রিক গড়নেরই অংশ, ওই দুটি মিনিট।’ সঙ্গে জিদানের জন্য আফসোসের কথাও, ‘ওর জন্য খারাপ লাগছিল আমার। ওভাবে মাথায় রক্ত চড়ে না গেলে খেলাটার ইতিহাসে আরও উঁচু স্থানে থাকতে পারত ও। এখনো অনেক উঁচুতেই আছে, তবে সেটি আরও উঁচু হতো। কারণ তখন ওর কারণে ফ্রান্স (দুটি) বিশ্বকাপ জিতত। ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর বিদায় হতো সেটি।’
তেমন বিদায় জিদানের প্রাপ্যও ছিল। ক্যারিয়ারে কি জেতেননি! চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরো—বড় সব শিরোপাই পেয়েছে জিজুর ছোঁয়া। ট্রফির হিসাব একপাশে সরিয়ে রাখুন, জিদান তো ফুটবলীয় সৌন্দর্যকেও একটু ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে গেছেন। শারীরিক ক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয় যে খেলা, তাতে তিনি যেন ছড়িয়েছেন সুরের মূর্ছনা। যেন ফুটবলের ‘মোজার্ট’। এমন এক শিল্পীর শেষটা তো সর্বোচ্চ সাফল্যের শিরোপা মঞ্চেই হওয়া উচিত ছিল।
হয়নি, তাতে ফ্রান্সেসকোলিও হতাশ। তবে সেটি শুধুই ফুটবলে জিদানের অবদান বিবেচনায় নয়। জিজুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা যে অন্যরকম। উরুগুয়ে কিংবদন্তির মুখেই শুনুন, ‘অনেকবারই জিদানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমি এনজোর সঙ্গেও দেখা করেছি। ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা এসব কিছুর কারণেই।’ এনজো কে, বুঝেছেন তে? জিদানের বড় ছেলে। ফ্রান্সেসকোলির নামের প্রথম অংশের সঙ্গে মিলটা একদমই কাকতালীয় নয়। নায়কের নামের সঙ্গে মিলিয়েই ছেলের নাম রেখেছেন জিদান।
পরে দুজন বন্ধুই হয়ে গেছেন। তবে জিদানের শৈশবে ফ্রান্সেসকোলি ছিলেন তাঁর স্বপ্নের নায়ক। যাঁকে তিনি বলতেন, ‘ফুটবল ঈশ্বর’! ফ্রান্সেসকোলির ব্যাপারে জিদানের মুগ্ধতার প্রমাণ পেতে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। ১৯৮৯ সালে জিদান যখন কানের যুব দল থেকে উঠে মাত্র পেশাদার ফুটবলে পথ চলা শুরু করেছেন, অলিম্পিক মার্শেইয়ের হয়ে মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন ফ্রান্সেসকোলি। মাঠে চলাফেরায় সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ, যে কারণে নামই হয়ে গিয়েছিল ‘এল প্রিন্সিপে (দ্য প্রিন্স)’। জিদানের ভালো লাগার শুরু সেখানেই।
এক সময় মাঠেও দেখা হলো দুজনের। সেটি ১৯৯৬ সাল, জিদান খেলেন জুভেন্টাসে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে আর্জেন্টিনার রিভার প্লেটের সঙ্গে ম্যাচ ছিল জুভের। জিদানের জন্য সেটি হয়ে গেল প্রতিযোগিতার সীমানা ছাড়িয়ে অনেক বড় কিছু। তা সেই ম্যাচে জিদান কী করলেন? ফ্রান্সেসকোলির স্মৃতিচারণা, ‘এমন একজন, যে কিনা খেলাটির এত বড় তারকা—যখন এসে বলে, প্রতি বিকেলেই সে আমাকে দেখতে যেত; আমি কী করতাম, কী বলতাম সবই বলে যায়...সেটি আপনাকে প্রেরণা জোগাবেই।’ ওই ম্যাচ থেকে পাওয়া জিদানের সেরা উপহার ফ্রান্সেসকোলির ৯ নম্বর জার্সি। ফ্রান্সের হয়ে খেলার সময় জিদান নাকি ওই জার্সিটি গায়ে দিয়ে ঘুমাতেন। ‘ওর স্ত্রী তো বলে, ঘরেও নাকি মাঝে মধ্যে ওই জার্সি গায়ে জড়িয়ে ঘুমাত। ফুটবলাররা একটু পাগলই হয়’—বলার সময় হয়তো একটু গর্বও খেলা করে ফ্রান্সেসকোলির কণ্ঠে।
করবে না-ই বা কেন! জিদানের দেওয়া ‘ফুটবল ঈশ্বর’ নামে একটু লজ্জাই পান। জিদানও তো শিশুর সরলতায় অনুকরণ করে গেছেন ফ্রান্সেসকোলিকে। একবার বলেও ছিলেন, ‘তাঁর ব্যাপারে এতই মুগ্ধ ছিলাম, মাঠে তাঁর চলাফেরা অনুকরণ করতাম, যা করতেন সবই আমিও করতাম। তাঁর মতো করে খেলতে যা কিছু করার দরকার সবই করেছি।’

default-image

জিদান পেরেছেন, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আদরের ভাবশিষ্যের ওই ঢুঁস কাণ্ডেও নিজের ছায়া দেখেন ফ্রান্সেসকোলি, ‘এমন পাগলামির মুহূর্ত আমাদের সবার জীবনেই আসে। চিলির বিপক্ষে ১৯৮৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে আমিও এমন ঢুঁস মেরেছিলাম। ব্রাজিলিয়ান রেফারি আরপ্পি ফিলহো আমাকেও লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দিয়েছিলেন, সঠিকই ছিল সিদ্ধান্তটা।’ তবে বড় মঞ্চে এমন পাগলামির মূল্য কতটা দিতে হয়, সেটি ফ্রান্সেসকোলির মুখেই শুনুন, ‘মন চাইছিল, নিজেকে খুন করে ফেলি। সাধারণ কোনো ম্যাচে এমন হলে কিচ্ছু মনে করতাম না আমি, কিন্তু ফাইনালে না। সাধারণ ম্যাচে লাল কার্ড মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এমন বড় ম্যাচে...’
সেটি না হলে সেদিন ফ্রান্সই জিতত বলে ধারণা তর্কসাপেক্ষে উরুগুয়ের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের, ‘হ্যাঁ, ওরা পেনাল্টিতে হেরেছিল। জিদান মাঠে থাকলেও সেটি হতে পারত। কিন্তু আমার মনে হয়, ও যে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছিল তা ’৮৬ বিশ্বকাপের ম্যারাডোনার মতো।’ ফ্রেঞ্চ ফুটবলারদের ওপর ওই ঘটনার প্রভাবও ব্যাখ্যা করলেন, ‘এমন কিছু হলে পুরো দলের ওপরই প্রভাব পড়ে। জিজুর ওভাবে মেজাজ হারানো হয়তো ম্যাচে তেমন প্রভাব ফেলেনি, কারণ ওটা হয়েছে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে। কিন্তু এটা (ফ্রেঞ্চ খেলোয়াড়দের) মনে দাগ কেটে গেছেই। আমি যখন দেখেছি, বড় ধাক্কাই লেগেছে।’
ম্যাচের শুরুতেই দুঃসাহসী এক চিপে করা পেনাল্টি গোলে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেওয়া জিদান সেদিন দারুণ ফর্মেই ছিলেন। কিন্তু সব কিছুই তো মিথ্যা হয়ে গেল ওই দুই মিনিটের পাগলামিতে। এ জন্যই হয়তো, ছয় দিন আগে দশক-পূর্তি হওয়া ঘটনাটায় আজও দীর্ঘশ্বাস পড়ে ফুটবল রোমান্টিকদের। ফ্রান্সেসকোলির মতো। সূত্র: ফিফা ডটকম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন