জীবনের মতো কোচিংয়েও জুটি

বিজ্ঞাপন
default-image

তাঁর বিয়ের জন্য বাসা থেকে মেয়ে দেখা চলছিল। কিন্তু বাইরে বেশি খোঁজাখুঁজির দরকার পড়েনি। বাসার দেয়ালেই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের একটা ছবি টানানো ছিল। সেই ছবি দেখেই বড় বোন জিজ্ঞেস করলেন, ‘...এই মেয়েটা কে? দেখতে তো ভালোই। পছন্দ হয়?’
মাহবুবুর রহমান (লিটু) আগে থেকেই মেয়েটাকে জানেন-চেনেন, ভালোও লাগে তাঁর। তাই আর দেরি কেন! বোনকে বললেন, ‘সে আমার প্লেয়ার।’ আর এই ‘প্লেয়ার’কে বোনের পছন্দ হয়ে যাওয়াতেই চার হাত একসঙ্গে হলো পারিবারিক ইচ্ছায়। মাহমুদা আক্তার (অনন্যা) হয়ে গেলেন মাহবুবুরের স্ত্রী।
এমন তো কতই হয়। কিন্তু এই দম্পতির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। এঁরা দুজনই খেলেছেন ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষ স্তরে। মাহবুব ১৯৮৯-৯৫ পর্যন্ত কাটিয়েছেন সে সময়ের ঢাকার প্রথম বিভাগের দল ইস্কাটন সবুজ সংঘে। তারপর অগ্রণী ব্যাংক হয়ে ভিক্টোরিয়ায় সাত ও ব্রাদার্সে দুই বছর। জাতীয় দলে খেলার দরজাটা না খুললেও অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জার্সি তুলেছেন গায়ে। আর নারায়ণগঞ্জের মেয়ে মাহমুদা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলে ছিলেন ২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত।
সেই খেলার পর্ব পেরিয়ে জীবনের সংসারে তাঁরা জুটি বাঁধেন ২০১১ সালে। ক্রীড়াঙ্গনে এমন জুটি বিরল হয়তো নয়। তবে দুজনই ফুটবলার, এই পরিচয়টা বাংলাদেশে একটু ব্যতিক্রম। সেটিও ছাপিয়ে এই দম্পতি নিজেদের পুরোপুরি আলাদা করছেন আরও একটি জায়গায়। খেলা ছেড়ে দুজনই পাঠ নিয়েছেন ফুটবল কোচিংয়ে। মাহবুব এএফসি ‘বি’ ও মাহমুদা ‘সি’ সনদ নিয়েছেন। এবং মজার ব্যাপার, তাঁরা দুজনই এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী দলের কোচ!
এই দলের মূল কোচ গোলাম রব্বানী (ছোটন), মাহবুব ও মাহমুদা সহকারী। ফিফার নির্দেশে এখন নারী দলে একজন নারী কোচ রাখা বাধ্যতামূলক। সেই সুযোগেই মাহমুদার নারী দলে সংযুক্তি। নেপালে গত বছর অনূর্ধ্ব-১৪ দলের সেই ‘ভূমিকম্পময়’ সফরে দলের সঙ্গে ছিলেন। তাজিকিস্তানে সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন দলেরও অংশ ছিলেন। তৃতীয়বারের মতো নিয়োগ পেয়েছেন আগামী ২৭ আগস্ট ঢাকায় শুরু এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ দলের সহকারী কোচ হিসেবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ও জাতীয় দলের সঙ্গে মাহবুব আছেন সাত-আট বছর ধরে।
তবে তাঁরা যে স্বামী-স্ত্রী, অনূর্ধ্ব-১৬ দলের চলমান ক্যাম্পে আসা নতুন খেলোয়াড়েরা তা জানে না। পুরোনো অনেকেরও অজানা। কারণ তাঁরা মাঠে এমনভাবে মেশেন যাতে কেউ বুঝতে না পারে দুজনের সম্পর্কটা। এখানে তাঁরা শতভাগ পেশাদারি ধরে রেখেছেন। তবে মাঝেমধ্যে যখন পাঁচ বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে আসেন অনুশীলন মাঠে, অনেকেই বুঝে ফেলেন। মেয়েরা নাকি মাহমুদাকে বলে, ‘ম্যাডাম আপনারা যে স্বামী-স্ত্রী এটা তো আমাদের কল্পনায়ও ছিল না।’
বাফুফের টার্ফে দল নিয়ে অনুশীলনের ফাঁকে মাহমুদা সেসব মনে করে হেসে বলছিলেন, ‘উনি আমার স্যার ছিলেন, আমি স্টুডেন্ট। ২০১০ সালে কক্সবাজারে সাফ টুর্নামেন্ট খেলেছি বাংলাদেশ দলের জার্সি গায়ে, সে সময় আমি খেলোয়াড় আর মাহবুব কোচ।’
‘গুরু-শিষ্যের’ সেই অধ্যায় শেষ হয়েও হয়নি। এখন বাসা থেকে বেরিয়ে কোচের ভূমিকায় একসঙ্গে মাঠে আসেন দুজন, তবে স্বামী-স্ত্রীর কোনো ব্যাপার তখন আর থাকে না। ‘মাঠে ঢুকলে তিনি আমার কোচ। আমি যেটা বুঝি না, তিনি তা বুঝিয়ে দেন। তাঁকে আমি সম্মান করি। তিনবার একই দলের সহকারী কোচ হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করছি। মজার ব্যাপার, প্রতিবারই স্যার স্যার করতে হয় (হাসি)।’
এই ‘স্যার’, ‘স্যার’ শব্দটা মাঠে বলা ঠিক আছে। কিন্তু মাঠের বাইরে বা ঘরের মধ্যেও যদি এসে যায়! রসিকতার ছলে মাহমুদা বলে যান,‘এক বছর পর্যন্ত এমনও হয়েছে তাঁকে আমি স্যার স্যার বলেছি বাসায়। তুমি বলতে একটু সময় লেগেছে। এখনো মাঝে মাঝে...স্যার বলি...স্যার আমি কি এই তরকারিতে এই জিনিসটা দেব...(হাসি)।

এটা দেখে তাঁদের একমাত্র সন্তানও নাকি মায়ের পথে হাঁটে। সেও বাবাকে ‘স্যার’ ‘স্যার’ বলে ডাকে! বাবা মাহবুবের ভাষায়, ‘এসব ভালোই লাগে, আনন্দে কাটে আমাদের সময়টা।’ ফুটবল তাঁদের জীবনটাকে গেঁথে দিয়েছে ভালোবাসার মালায়!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন