ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জুভেন্টাসের জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে ব্যর্থ।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জুভেন্টাসের জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে ব্যর্থ। ছবি: রয়টার্স

সপ্তাহের পালাবদল এবার রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকদের নির্ঘাত আশাবাদী করে তুলেছে। কাল রাতে লিগে এলচের বিপক্ষে যোগ করা সময়ের গোলে রিয়ালকে ২-১ ব্যবধানের জয় এনে দিয়েছেন করিম বেনজেমা। এ জয়ে লিগের শীর্ষে থাকা আতলেতিকো মাদ্রিদের সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধান ৬-এ নামিয়ে এনেছে বর্তমান স্প্যানিশ লিগ চ্যাম্পিয়নরা।

রিয়াল সমর্থকদের আশার প্রদীপ অবশ্য এ ম্যাচ বা এ মৌসুম ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুভেন্টাস। গত মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে পোর্তোর বিপক্ষে প্রতিপক্ষের মাঠে গোলের হিসাবে হেরে গেছে জুভেন্টাস। তাতে টানা তিন বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ না জেতা নিশ্চিত হয়ে গেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। এরপরই গুঞ্জন উঠেছে, জুভেন্টাসে আর থাকতে রাজি নন রোনালদো। ফিরতে চান রিয়ালে।

এমন গুঞ্জনের মধ্যেই কাল দলকে মহামূল্যবান তিন পয়েন্ট এনে দেওয়া দুই গোল করেছেন বেনজেমা। আর সেই সঙ্গে এটাও জানিয়ে দিয়েছেন, গত তিন মৌসুমে তিনি দলের জন্য যা করেছেন, সেটা রোনালদোর তুলনায় কম নয় মোটেও।

বিজ্ঞাপন

সাদা চোখে এমন কথা হাস্যকর শোনায়। ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরাদের একজন রোনালদো। লিওনেল মেসির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেড় যুগ ধরে ফুটবল–বিশ্ব শাসন করছেন। যেকোনো মঞ্চেই আলোটা কেড়ে নেন। সে তুলনায় বেনজেমা যেন মঞ্চের কোণে পড়ে থাকা কেউ। নাটকের পূর্ণতায় অবদান রাখছেন ঠিকই, কিন্তু আলোটা কখনোই ওদিকে যায় না। মাঠে তাঁর উপস্থিতির ধরনও এর পেছনে ভূমিকা রাখে। বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটির ‘নাম্বার নাইন’ তিনি, কিন্তু কোনো মৌসুমেই ইউরোপের সর্বোচ্চ গোল স্কোরারদের শীর্ষ পাঁচে দেখা যায় না তাঁকে।

default-image

রোনালদোর উপস্থিতির কারণে ৯ বছর ধরে বেনজেমার গোল করার চেয়ে গোল বানানোতেই বেশি মনোযোগ দেওয়া এতে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আড়াই বছর ধরে রোনালদো পাশে নেই। এখন আর অন্য কাউকে মাঠে জায়গা করে দিতে হয় না বেনজেমাকে। কিন্তু এ সময়েও তাঁর গোলক্ষুধা অনেক বেড়েছে, এমনটা অন্তত পরিসংখ্যান দেখে বলার উপায় নেই।

গতকাল এলচের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর এ মৌসুমে বেনজেমার নামের পাশে ২০ অক্ষরটি লেখা যাচ্ছে। ২০১৮–১৯ মৌসুম থেকে হিসাব শুরু করলে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে রিয়ালের হয়ে বেনজেমার গোল এখন ৭৭টি। অর্থাৎ ২০১৮ সালে রোনালদো রিয়াল ছাড়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রিয়ালকে ৭৭টি গোল এনে দিয়েছেন বেনজেমা।

আর এ সময়ে জুভেন্টাসে সবচেয়ে দামি ফুটবলারের রেকর্ড ভাঙা রোনালদো তাঁর ক্লাবকে এনে দিয়েছেন ৯২টি গোল। ১২১ ম্যাচে ৯২ গোল করেছেন রোনালদো। ওদিকে ১৫ গোল কম করা বেনজেমা রোনালদোর চেয়ে ম্যাচ বেশি খেলেছেন ১০টি। পরিসংখ্যান তাই বলছে, শুধু সাম্প্রতিক সময়ের হিসাবে বেনজেমা রোনালদোর ধারেকাছে নেই। আর অতীতের রেকর্ড তো এই তুলনার যৌক্তিকতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে!

জুভেন্টাসের জার্সিতে এখন পর্যন্ত যত গোল করেছেন রোনালদো, তার ২৭টিই এসেছে পেনাল্টি থেকে। পেনাল্টি ছাড়া ‘ওপেন প্লে’ থেকে রোনালদোর গোল ৬৫টি, ওদিকে বেনজেমার গোল ৬৯টি।

কিন্তু গোলের সংখ্যায় নয়, রোনালদো জুভেন্টাসে যাওয়ার পর রিয়ালে বেনজেমার বদলকে দেখতে হবে টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা রিয়াল মাদ্রিদ দলে সমর্থকদের চোখের বালি হয়ে উঠেছিলেন বেনজেমা। জিনেদিন জিদান শুধু ফরাসি বলেই বেনজেমাকে খেলাচ্ছেন, এমন অভিযোগ কম ওঠেনি। ২০১৬–১৭ মৌসুমে লিগে মাত্র ১১ গোল করার পরও বেনজেমার জায়গায় কোনো স্ট্রাইকারকে নিতে রাজি হননি জিদান। পরের মৌসুমে আস্থার প্রতিদান দেবেন কী, উল্টো লিগে ৩২ ম্যাচে মোটে ৫ গোল করেছিলেন বেনজেমা।

সেই বেনজেমা রোনালদো যাওয়ার পর ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। এ নিয়ে টানা তিন মৌসুমে অন্তত ২০ গোল করেছেন। তিন মৌসুম ধরেই রিয়ালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রথম মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যারেথ বেলের গোলসংখ্যা বেনজেমার অর্ধেকের কম ছিল। আর দ্বিতীয় মৌসুমে বেনজেমার সঙ্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ফরোয়ার্ডের পার্থক্য ২০ গোলের! বর্তমান মৌসুমে এখনো আড়াই মাস বাকি, কিন্তু পরিস্থিতি এবারও এখন পর্যন্ত একই। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার নাম মিডফিল্ডার কাসেমিরো এবং তাঁর গোলসংখ্যা ৬! গোলের জন্য বেনজেমার ওপর রিয়াল কতটা নির্ভরশীল, সেটা এতেই বোঝা যায়।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে রোনালদোর আবার রিয়ালে ফেরার সম্ভাবনা জাগায় সমর্থকেরা খুশি হবেন, এটাই স্বাভাবিক। গত কয়েক দিনে অধিনায়ক সের্হিও রামোস ও কোচ জিদানের কথাবার্তাও আশা জাগাতে বাধ্য। তবে রোনালদো ফিরলে বেনজেমার গোল যে কমে যাবে, এটাও মাথায় রাখা উচিত এবং বেনজেমা ও রোনালদোর মধ্যে যেকোনো একজনকেই হয়তো বেছে নিতে হবে রিয়ালকে। এত দিন এমন প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই উত্তরটা রোনালদো হতো। কিন্তু ৩৭ ও ৩৪ বছর বয়সী দুই ফরোয়ার্ডের মধ্যে তুলনা টানলে এখন হয়তো বেনজেমাই এগিয়ে আছেন।

default-image

এমন কথা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। গোলের হিসাবে রোনালদো যে এগিয়ে, সেটা দেখাই যাচ্ছে। গোলের সঙ্গে গোলের সহায়তাকে হিসাবে নিলেও রোনালদো এগিয়ে থাকবেন। গত তিন মৌসুমে সতীর্থদের দিয়ে রোনালদো গোল করিয়েছেন ২২টি। ওদিকে বেনজেমা সতীর্থদের গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন ২৭ বার। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গোলে অবদান রোনালদোর ০.৯৪, বেনজেমার ০.৭৯।

কিন্তু এই হিসাব থেকে যদি পেনাল্টি গোল সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলেই চিত্রটা একদম বদলে যায়। জুভেন্টাসের জার্সিতে এখন পর্যন্ত যত গোল করেছেন রোনালদো, তার ২৭টিই এসেছে পেনাল্টি থেকে। ওদিকে রিয়ালের মূল স্ট্রাইকার হয়েও পেনাল্টি থেকে গোল করার অধিকারটা বেনজেমার নেই। মাঝেমধ্যে রামোসের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পান আর সে সুযোগে ৮টি গোল করেছেন পেনাল্টি থেকে। অর্থাৎ পেনাল্টি ছাড়া ‘ওপেন প্লে’ থেকে রোনালদোর গোল ৬৫টি, ওদিকে বেনজেমার গোল ৬৯টি।

মাঠের খেলায় অবদান রাখায় এখন যে বেনজেমাই এগিয়ে আছেন, সেটা বোঝা যায় পেনাল্টি ছাড়া ম্যাচপ্রতি গোলের অবদানে। ম্যাচপ্রতি গোলের অবদানে এ ক্ষেত্রে বেনজেমা (০.৭৩) শতাংশের এক ভাগে এগিয়ে আছেন রোনালদোর চেয়ে (০.৭২)।

পেনাল্টি ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদিক থেকে চিন্তা করলে রোনালদোর পেনাল্টি দক্ষতাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা মনে হতে পারে এ পরিসংখ্যানকে। মজার ব্যাপার, পেনাল্টি সফলতায়ও কিন্তু বেনজেমাই এগিয়ে আছেন। রোনালদো ক্লাবের জার্সিতে ২৭টি পেনাল্টি গোল করলেও সুযোগ হাতছাড়া করেছেন ৪ বার। অর্থাৎ আড়াই মৌসুমে ৮৭ ভাগ সময় পেনাল্টি কাজে লাগিয়েছেন রোনালদো। আর বেনজেমা?

আটবার সুযোগ পেয়ে আটবারই গোল করেছেন বেনজেমা। অর্থাৎ শতভাগ সাফল্য রিয়াল ফরোয়ার্ডের!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন