মেসির যুগে বার্সা সফল।
মেসির যুগে বার্সা সফল। ছবি: রয়টার্স

রিয়াল মাদ্রিদে হয়তো এখন হতাশা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরছে।

কল্পনায় আরেকটু নাটকীয়তার পরশ আনতে চাইলে ভাবতে পারেন, রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের অফিসকক্ষের কোনো এক কোনায় স্প্যানিশ ভাষায় একটা গান বাজছে। ‘ওহে কী করিলে বলো পাইব তোমারে...’ রবীন্দ্রসংগীতের এই চরণগুলোর সঙ্গে স্প্যানিশ ভাষার ওই গানের মিল আছে।

আরেকটু নাটকীয়তা চাই? আচ্ছা! কল্পনায় ধরে নিন, পঞ্চাশ দশকের টিভি পর্দার মতো করে পেরেজের অফিসকক্ষের টিভিতে সাদা-কালো ছবিতে ভেসে উঠছে একের পর এক চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের মুহূর্তগুলো। হৃদয় রাঙিয়ে যাওয়া গোলগুলো।

এই তো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো লিসবনে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে জার্সি খুলে বনবন করে ঘোরালেন। এক যুগের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ২০১৪ সালে রিয়ালের দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ বা লা দেসিমা জেতার মুহূর্তটা পেরেজের ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে দিল। আহা, এই তো সেদিনের কথা।

বিজ্ঞাপন
default-image

বলতে গেলে রিয়ালের চ্যাম্পিয়নস লিগের ‘স্লুইসগেট’ খুলে দেওয়ার মতো। মাঝে একটা বছর বার্সেলোনা একটা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। ঝরঝর করে এরপর আবার মাদ্রিদের কূলীন অংশে চ্যাম্পিয়নস লিগের যেন বর্ষণ হলো। একটি, দুটি...টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ! যেখানে চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে কারও টানা দুটিও ছিল না!

কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার দীর্ঘশ্বাস বলে গেল পেরেজের একটা চাপা আক্ষেপের কথা। এত করেও কী হলো। পেছনে আবার গানের কলি ভেসে আসছে, ‘ওহে, কী করিলে বলো পাইব তোমারে...!’

আচ্ছা, কল্পনার ঘোড়ায় লাগাম টানা যাক। অত একেবারে দুঃখে মরোমরো হয়ে যাওয়ার কিছু ঘটেনি। তবে রিয়ালের একটু ভ্রু কুঁচকে তাকানোর মতো ঘটনা ঘটেছে বটে। টানা তিনটিসহ গত এক দশকের মধ্যে পাঁচ বছরে চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতল রিয়াল, অথচ দশকসেরা ক্লাবের স্বীকৃতি কিনা পেল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা। গত দশকের মতো এবারও!

ফুটবলের ইতিহাস ও পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা বিখ্যাত ওয়েবসাইট আইএফএফএইচএস (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল, হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স) দিয়েছে পুরস্কারটা। তাতে রিয়াল মাদ্রিদ ২৭৮২ পয়েন্ট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে, ৯৫ পয়েন্ট বেশি নিয়ে বার্সেলোনা শীর্ষে। তিনে বায়ার্ন মিউনিখ, জার্মান চ্যাম্পিয়নদের পয়েন্ট ২৫৯৪.৫।

পুরস্কারটা কীভাবে দেওয়া হয়, সেটি না জানলে রিয়াল সমর্থকমন পুরস্কারটার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিতে পারেন বটে! ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দেয় যে ট্রফিটা, সেটা দশ বছরে রিয়াল জিতল চারবার, বার্সা জিতেছে দুবার, তাহলে বার্সা দশকসেরা হলো কীভাবে? খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন।

গত দশকেও পুরস্কারটা বার্সার ঘরে গেছে, তখন নাহয় পেপ গার্দিওলার অধীনে মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তাদের বার্সা সর্বজয়ী ছিল, তারও আগে রোনালদিনিও নামের এক জাদুকর এসে বার্সার ইতিহাসে বদলে দেওয়ার সূচনা করে দিয়েছিলেন...সব মিলিয়ে গত দশকের পুরস্কারটা মেনে নেওয়া গেছে। কিন্তু এই দশকে বার্সা কেন?

বার্সার গত দশ বছরে ৬টি লিগ জেতার কথা মনে করতেই পুরস্কারের তালিকায় তিনে বায়ার্নকে দেখে আবার পাল্টা প্রশ্ন করে বসতে পারে বার্সাকে শীর্ষে দেখতে না চাওয়া রিয়াল সমর্থকমন—বার্সা হলে বায়ার্ন নয় কেন? বায়ার্নও তো গত এক দশকে বার্সার মতো দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, লিগ শিরোপা বার্সার যেখানে ৬টি, বায়ার্নের তো লিগ শিরোপা ৮টি। আবারও যৌক্তিক প্রশ্ন!

বিজ্ঞাপন

এখানে ব্যাখ্যা হয়ে আসবে পুরস্কারের মানদণ্ড। বার্সেলোনার পুরস্কারটা জেতার খবর নিজেদের ওয়েবসাইটে দিয়ে লিখেছে, এই পুরস্কারে ম্যাচ জয়, গোলের হিসাবও আসে। স্প্যানিশ দৈনিক মার্কা লিখেছে, পুরস্কারটা কে পাবে, সে সিদ্ধান্তে শিরোপার সংখ্যা তো আছেই, এর পাশাপাশি হিসাবে আসে এক দশকে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে একটা ক্লাবের জয়ের সংখ্যা, গোল করা ও খাওয়ার সংখ্যা। দশকসেরা পুরস্কার জেতার আগে এই দশকে আইএফএফএইচএসের কাছ থেকে ২০১১, ২০১২ ও ২০১৫ সালের বর্ষসেরা ক্লাবের পুরস্কারও পেয়েছে বার্সা।

চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল এগিয়ে থাকলেও শিরোপার হিসাবে এই দশকে বার্সার অর্জনের ডালি বেশ পূর্ণই। স্পেনের ঘরোয়া ফুটবলে বার্সারই ছিল জয়জয়কার। ৬ বার লিগ জিতেছে, কোপা দেল রে জিতেছে ৫ বার, স্প্যানিশ সুপারকাপ ৪ বার। সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগ ২টি, ক্লাব বিশ্বকাপ ২টি, ২টি উয়েফা সুপারকাপও আছে। তুলনায় রিয়াল মাদ্রিদ? ৪ চ্যাম্পিয়নস লিগের বাইরে লিগ জিতেছে ৩ বার, কোপা দেল রে ২ বার, সুপারকোপা ৩ বার, উয়েফা সুপার কাপ ৩ বার, ক্লাব বিশ্বকাপ ৪ বার।

বার্সা, রিয়াল ও বায়ার্নের পর দশকসেরা ক্লাবের এই তালিকায় আছে পিএসজি। সেরা পাঁচে তৃতীয় স্প্যানিশ ক্লাব হয়ে পাঁচ নম্বরে আছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। এরপর স্প্যানিশ ক্লাব খুঁজতে গেলে যেতে হবে তালিকার ১৩ নম্বরে—সেভিয়া।

সেরা দশে ইতালির একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে জুভেন্টাস আছে ছয় নম্বরে। এরপরের চারটি ক্লাবই ইংল্যান্ডের। ক্রম মেনে একের পর এক অবস্থান চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আর্সেনালের!

গত এক দশকে ইউরোপে-ইংল্যান্ডে শিরোপার লড়াইয়ে সেভাবে না থাকা ম্যান ইউনাইটেড আর আর্সেনালকে সেরা দশে দেখে যদি চমকে গিয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আরও বড় চমক আপনার অপেক্ষায়—টটেনহাম আছে তালিকার ১৫ নম্বরে, আর গত দুই বছরে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা লিভারপুল আছে ১৭ নম্বরে।

সেরা বিশে ইউরোপের বাইরের একমাত্র ক্লাব ব্রাজিলের গ্রেমিও, আছে ১৪ নম্বরে।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন