১. জুলাই ২০১৩: প্রথম ধাক্কা ক্লপের

গার্দিওলার বায়ার্ন–অধ্যায়ের শুরুই হলো মৌসুমের শুরুতে জার্মান সুপারকাপে ক্লপের বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে। তারাও একেবারে ফেলনা নয়, আগের মৌসুমে জার্মান টুর্নামেন্টগুলোর মতো চ্যাম্পিয়নস লিগেও ফাইনালে বায়ার্নকে ধাওয়া করেছে ডর্টমুন্ডই।

তা ম্যাচের ফল কী? গার্দিওলার দুঃস্বপ্ন! ডর্টমুন্ড ৪-২ বায়ার্ন! গার্দিওলার টিকিটাকার সঙ্গে ক্লপের প্রেসিংয়ের প্রথম পরিচয়। মার্কো রয়েসের জোড়া গোলের সঙ্গে ইলকায় গুন্দোয়ানের গোল আর ড্যানিয়েল ফন বাইতেনের আত্মঘাতী গোলে মিলিয়ে গেল বায়ার্নের রোবেনের জোড়া গোলের আনন্দ।

২. নভেম্বর ২০১৩: বায়ার্ন ৩–০ ডর্টমুন্ড

ক্লপ যে ‘বক্সিং বাউটে’র কথা বলেন, সেটির দারুণ প্রদর্শনীর শুরু জার্মানি থেকেই। সে মৌসুমে লিগে ডর্টমুন্ডের মাঠে এসে বায়ার্ন জিতে যায় ৩-০ গোলে। আগের মৌসুমে ক্লপের ‘বুক ভেঙে’ মারিও গোতশাকে নিয়ে যায় বায়ার্ন, সেই গোতশা ডর্টমুন্ডে ফেরার ম্যাচেই করলেন গোল।

৩. এপ্রিল ২০১৪: ডর্টমুন্ড ৩–০ বায়ার্ন

ক্লপের পাল্টা জবাব বায়ার্নের মাঠে—জেতে ৩-০ গোলেই! মেখিতারিয়ান, রয়েস ও ইয়োনাস হফমানের গোলে লিগে দুই দলের লড়াইয়ে দুই ম্যাচ শেষে সমতা।

৪. মে ২০১৪: বায়ার্ন ২–০ ডর্টমুন্ড

লিগ তো জেতা হয়েছেই, মৌসুমের শেষে জার্মান কাপের ফাইনালে ক্লপকে হারিয়েই জার্মানিতে প্রথম মৌসুমে দ্বিতীয় শিরোপা গার্দিওলার। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলশূন্য ম্যাচটিতে গার্দিওলাকে শিরোপায় ভাসায় অতিরিক্ত সময়ে রোবেন ও মুলারের গোল।

৫. আগস্ট ২০১৪: ডর্টমুন্ড ২–০ বায়ার্ন

আবার সুপার কাপ, আবার ক্লপের হাসি। এবার অনেকটা দুর্বল দল নামানো বায়ার্নকে হারাতে বেগ পেতে হয়নি ডর্টমুন্ডের। দুই অর্ধে দুই গোল মেখিতারিয়ান ও পিয়ের-এমেরিক অবামেয়াংয়ের।

৬. নভেম্বর ২০১৪: বায়ার্ন ২–১ ডর্টমুন্ড

আগের মৌসুমে ডর্টমুন্ড থেকে গোতশাকে নিয়ে যাওয়া বায়ার্ন এই মৌসুমে নিয়ে যায় লেভানডফস্কিকে। গোতশার মতো পুরোনো ক্লাবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোল লেভারও, সঙ্গে পেনাল্টিতে রোবেনের গোল। ওই মৌসুমে দুর্ভাগ্য আর চোটের সঙ্গে অবিশ্বাস্য ফর্মহীনতা মিলিয়ে ডর্টমুন্ড তখন নিম্নগামী!

default-image

৭. এপ্রিল ২০১৫: বায়ার্ন ১–০ ডর্টমুন্ড

এবার লেভানডফস্কি ফিরলেন ডর্টমুন্ডের মাঠে, এবারও গোল তাঁর। সে গোলে হারের বেদনার চেয়ে প্রিয়জনের দেওয়া কষ্টের ব্যথাই বুঝি বেশি হলো ডর্টমুন্ডের।

৮. এপ্রিল ২০১৫: বায়ার্ন ১–১ ডর্টমুন্ড (টাইব্রেকারে ডর্টমুন্ড জয়ী)

জার্মান কাপের সেমিফাইনাল। ক্লপ তত দিনে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন মৌসুম শেষে ডর্টমুন্ড ছাড়বেন। বিদায়বেলায় গার্দিওলার বায়ার্নকে টাইব্রেকারে হারানোর স্বাদ পেলেন। লেভা আর অবার গোলে কাটাকাটির পর অদ্ভুত এক টাইব্রেকারই হলো বটে। বায়ার্নের কেউই বল জালে জড়াতে পারেননি। ফাইনালে উঠেও অবশ্য শিরোপায় শেষ করতে পারেননি ক্লপ, হেরেছেন ভলফ্‌সবুর্গের কাছে।

৯. ডিসেম্বর ২০১৬: লিভারপুল ১–০ সিটি

২০ মাস পর আবার মুখোমুখি ক্লপ-গার্দিওলা। এবার মঞ্চ ইংলিশ ফুটবল! জার্মানির মতো ইংল্যান্ডেও প্রথম সাক্ষাতে ক্লপের হাসি, জিনি ভাইনালডমের হেড গড়ে দেয় ব্যবধান।

১০. মার্চ ২০১৭: সিটি ১–১ লিভারপুল

এদিকে সের্হিও আগুয়েরো, ওদিকে জেমস মিলনারের গোলে কাটাকাটি। লিগে দ্বিতীয় ম্যাচেও ক্লপকে ইংল্যান্ডে হারানো হলো না গার্দিওলার।

১১. সেপ্টেম্বর ২০১৭: সিটি ৫–০ লিভারপুল

ক্লপের দ্বিতীয় পূর্ণ মৌসুম, গার্দিওলারও। দুই দলই অনেকটা গোছানো। এদিকে মানে-ফিরমিনোর সঙ্গে সালাহও যোগ হয়েছেন, ওদিকে ডি ব্রুইনা-স্টার্লিংদের সঙ্গে সানে তো ছিলেনই, গার্দিওলা রক্ষণও সাজিয়েছেন কোটি পাউন্ডে। উত্তেজনা পারদ চড়েছে! কিন্তু ইতিহাদে ম্যাচের শুরুতেই জল ঢেলে দিল সাদিও মানের লাল কার্ড।

উড়ে আসা বলের দখলে মানের মতো সিটি গোলকিপার এদেরসনও এগিয়ে যান, মানের বুট লাগে এদেরসনের মুখে। এরপর? ১০ জনের লিভারপুলের বিপক্ষে সিটির গোল-উৎসব। জেসুস ও সানের জোড়া গোলের সঙ্গে আগুয়েরোর গোলে সিটির জয়টিই এখনো ক্লপ-গার্দিওলা দ্বৈরথে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের।

১২. জানুয়ারি ২০১৮: লিভারপুল ৪–৩ সিটি

সম্ভবত ক্লপ-গার্দিওলা দ্বৈরথে সবচেয়ে উত্তেজনা ছড়ানো ম্যাচ! জানুয়ারিতে ভার্জিল ফন ডাইকও যোগ হওয়ায় লিভারপুল আরও শক্তিশালী। প্রথমার্ধে চেম্বারলেইন আর সানের গোলে কাটাকাটি। দ্বিতীয়ার্ধে আট মিনিটের মধ্যে লিভারপুলের সালাহ-ফিরমিনো-মানের ভয়ংকর ত্রয়ীর তিনজনেরই গোল! শেষ দিকে বের্নার্দো সিলভা আর গুন্দোয়ানের গোলে শেষটাও হলো রোমাঞ্চে ঠাসা।

১৩. মার্চ ২০১৮: লিভারপুল ৩–০ সিটি

মঞ্চ চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল। সিটি তখন উড়ছে, লিভারপুলের জেজেনপ্রেসিংও মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। প্রথম লেগে আধা ঘণ্টার মধ্যেই সালাহ, চেম্বারলেইন আর মানের গোলে বড় জয় লিভারপুলের।

১৪. এপ্রিল ২০১৮: লিভারপুল ২–১ সিটি

দ্বিতীয় লেগে দুই মিনিটেই জেসুসের গোল সিটির ফিরে আসার আশা জেগেছিল, সিটির একটা গোল এরপর বাতিলও হলো। কিন্তু সালাহ আর ফিরমিনোর গোলে সিটির ফিরে আসার আশা তো মাটিই, উল্টো দ্বিতীয় লেগেও হার গার্দিওলার।

১৫. অক্টোবর ২০১৮: লিভারপুল ০–০ সিটি

শেষ পর্যন্ত লিগটা দুই দলের অবিশ্বাস্য দ্বৈরথের বিজ্ঞাপন হয়ে থেকেছে বটে। লিভারপুল ৯৭ পয়েন্ট পেয়েও সিটির চেয়ে ১ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকায় শিরোপা জেতেনি। তবে অক্টোবরে অ্যানফিল্ডের ম্যাচটা হলো একেবারে ম্যাড়মেড়ে, সম্ভবত ক্লপ-গার্দিওলা দ্বৈরথের একমাত্র ম্যাড়মেড়ে ম্যাচ। একমাত্র গোলশূন্য ম্যাচও! শেষ দিকে সিটির মাহরেজ পেনাল্টি উড়িয়ে মেরেছেন।

১৬. জানুয়ারি ২০১৯: সিটি ২–১ লিভারপুল

শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচটিই হয়তো সিটিকে শিরোপা জিতিয়েছে! আগুয়েরো-ফিরমিনোর পাল্টাপাল্টি গোলের পর সানের গোলে সিটির জয়টা এসেছে, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভবত ছিল জন স্টোনসের বীরত্ব। ম্যাচ তখন গোলশূন্য, গোললাইন পেরোনোর মিলিমিটারেরও ভগ্নাংশ দূরত্ব থেকে বল ফিরিয়ে দেন স্টোনস!

১৭. এপ্রিল ২০১৯: সিটি ১–১ লিভারপুল (পেনাল্টিতে সিটির জয় ৫-৪ ব্যবধানে)

মঞ্চ যখন কমিউনিটি শিল্ড, এ নিয়ে ক্লপ বা গার্দিওলা কেউই সম্ভবত খুব একটা মাথা ঘামাননি। মাতিপের গোলে লিভারপুলের এগিয়ে যাওয়া, স্টার্লিংয়ের গোলে সমতা। টাইব্রেকার ক্লদিও ব্রাভো লিভারপুলের ভাইনালডমের শট ঠেকিয়ে দিতেই সিটির শিরোপার উল্লাস।

১৮. নভেম্বর ২০১৯: লিভারপুল ৩–১ সিটি

৩০ বছরের লিগ শিরোপার খরা ঘোচানোর পথে শুরু থেকেই দারুণ দাপুটে লিভারপুলের সামনে সিটি স্রেফ উড়ে গেল। বক্সের বাইরে থেকে ফাবিনিওর চোখধাঁধানো গোলের পর সালাহ-মানের গোলে লিভারপুলের ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া, বের্নার্দো সিলভার গোলটা শুধু সিটির সান্ত্বনা হয়ে এসেছে। মৌসুমের তিন মাস না যেতেই ৮ পয়েন্ট এগিয়ে লিগশীর্ষে লিভারপুল।

১৯. জুলাই ২০২০: সিটি ৪–০ লিভারপুল

লিভারপুল সম্ভবত এ হারে তেমন মাথা ঘামায়নি। মাঝে করোনাভাইরাস এসে বাধা সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত ফুটবল আবার মাঠে গড়াল, নিশ্চিত লিগ শিরোপা হাতে পেতে অল্প কদিনই লাগল লিভারপুলের। শিরোপার উল্লাসের দুই দিন পরই সিটির মাঠে সিটির ‘গার্ড অব অনার’ নিয়ে নামে লিভারপুল, কিন্তু তখনো বুঝি পানীয়ের প্রভাব কাটেনি তাদের। ফোডেনের জোড়া গোলের পাশাপাশি ডি ব্রুইনা, স্টার্লিংয়ের গোল লিভারপুলের কাছে যেন ছিল বিরিয়ানিতে এলাচির মতো!

default-image

২০. নভেম্বর ২০২০: লিভারপুল ১–১ সিটি

দুই পেনাল্টির ম্যাচ! পেনাল্টি থেকে সালাহর গোলে লিভারপুলের এগিয়ে যাওয়া, উল্টো দিকে পেনাল্টি থেকে জেসুসের গোলে সমতা সিটির।

২১. ফেব্রুয়ারি, ২০২১: সিটি ৪–১ লিভারপুল

সিটি যখন লিভারপুলকে হারায়, ৪-৫ গোল না দিলে যেন তাদের মন ভরে না। তবে এ বেলায় লিভারপুলের কিছু করার সম্ভবত ছিল না! ফন ডাইক, গোমেজ, মাতিপ—মূল তিন সেন্টারব্যাকের তিনজনই লম্বা সময়ের চোটে থাকায় লিভারপুল তখন ধুঁকছে, রক্ষণে ভরসা তখন তরুণ রিস উইলিয়ামস, ন্যাট ফিলিপস আর ধারে যাওয়া আরেক তরুণ ওজান কাবাক।

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফাবিনিও-ও চোটে ছিলেন, তবে চোট সারিয়ে তিনি এ ম্যাচে রক্ষণে খেলেছেন। সেন্টারব্যাকে তাঁর সঙ্গী ছিলেন আরেক মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসন। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, এ ম্যাচে গোলপোস্টে নির্ভরশীল আলিসনও বেশ কিছু ভুল করেছেন। ফল? গুন্দোয়ানের জোড়া গোলের পর স্টার্লিং আর ফোডেনের গোলে উৎসব সিটির।

২২. অক্টোবর, ২০২১: লিভারপুল ২-২ সিটি

মানে ও সালাহর গোলে অ্যানফিল্ডে দুবার লিভারপুল এগিয়ে যায়, ফোডেন আর ডি ব্রুইনার গোলে দুবারই সমতা ফেরায় সিটি। এ মৌসুমে দুই দলের কেউ কাউকে ছাড় না দেওয়ার মানসিকতার প্রথম বিজ্ঞাপন।

২৩. এপ্রিল ২০২২: সিটি ২-২ লিভারপুল

সিটি গোল করে, ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে লিভারপুল জবাব দেয়! ৫ মিনিটে ডি ব্রুইনার গোলের জবাব ৮ মিনিট পর দিলেন জোতা, ৩৬ মিনিটে জেসুসের গোলের জবাব ৪৬ মিনিটে এল মানের সৌজন্যে। মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী না দেওয়ার প্রতিজ্ঞায় চোয়াল আরও বদ্ধ দুই দলের।

২৪. এপ্রিল ২০২২: লিভারপুল ৩-২ সিটি

এই ম্যাচের স্মৃতি তো একেবারেই তাজা! গতকাল ওয়েম্বলিতে প্রথমার্ধে লিভারপুল যেমন খেলেছে, সিটির বিপক্ষে এমন দাপট সম্ভবত সাম্প্রতিক সময়ে আর কোনো দল দেখাতে পারেনি। মানের জোড়া গোল আর কোনাতের গোলে বিরতিতেই ৩-০ গোলে এগিয়ে লিভারপুল! বিরতি থেকে ফিরেই গ্রিলিশের গোলের পর যোগ করা সময়ে বের্নার্দো সিলভার গোল শেষটা জমিয়ে তুলেছিল বটে! তবে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠল লিভারপুলই।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন