ডাবলিনেও শোনা গেছে বার্সেলোনার পতনের শব্দ

বিজ্ঞাপন
default-image
>চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনার সশব্দ পতন! লিভারপুলের উল্লাসধ্বনি শোনা যাচ্ছে আইরিশ সাগরের এ পারেও। আয়ারল্যান্ডের মানুষ লিভারপুল বলতে পাগল। প্রিয় ক্লাবের সাফল্যে আয়ারল্যান্ডের মানুষের আনন্দটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন রাজীব হাসান

চিৎকারটা শুনে বুকে কাঁপন ধরবেই! ডাবলিন থেকে লিভারপুলের দূরত্ব মাত্র ২৬০ কিলোমিটার। কিন্তু মাঝখানের আইরিশ সাগর দূরত্বটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তা কখনো কখনো সাগরের গর্জনও তো হেরে যায় সোল্লাসে। মঙ্গলবার রাতে লিভারপুল যখন মঙ্গলবার্তায় নতুন আরেকটি রূপকথা লিখল, সেই উচ্ছ্বাসের ঢেউ খেলে গেল ডাবলিনেও।

চিৎকারটা সাগর পেরিয়ে আসেনি ঠিক, তার প্রয়োজনও পড়েনি। লিভারপুল আর ডাবলিনকে মাঝখানের সাগরও বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারেনি আসলে। একটা যোগসূত্র তৈরি করে রেখেছে ইতিহাস। ডাবলিনের নাড়ি পোঁতা আছে লিভারপুলে, লিভারপুলও নাড়ির টান অনুভব করে ডাবলিনে। ইংলিশ-আইরিশদের এত সাপে-নেউলের পরও ইংল্যান্ডের একটি ক্লাবকে কেন এত আপন করে নিয়েছে আইরিশরা, সেই রহস্য খুঁজতেই হলো।

আয়ারল্যান্ডের রাজধানীতে আসার পর গত কদিনে যে কবারই ট্যাক্সিতে উঠেছি, প্রতিবারই চালকের আসনে খুঁজে পাওয়া গেছে লিভারপুল সমর্থককে। শুরুটা হয়েছিল বিমানবন্দরে নেমেই, ব্যারি নামের যে চালক হোটেলে পৌঁছে দিয়েছেন। এখানকার ট্যাক্সিচালকেরা শুরুতে এক-দুটো নিতান্তই ভদ্রগোছের প্রশ্ন করেন। প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি, এখন বোঝা যায়, এই প্রশ্নগুলো দিয়ে তাঁরা আন্দাজ করে নেন, যাত্রী মিশুকে, নাকি নিজের মধ্যে থাকতেই ভালোবাসে। যদি দেখেন যাত্রী গল্প করতে আগ্রহী, তাঁরাও বেশ জমিয়ে আলাপ জমান। অচেনায় শহরে অতিথিকে একটু নির্ভরতার উষ্ণতাও দেওয়া হয় তাতে।

কেন, কী করতে এসেছি? এসব প্রশ্নের উত্তরে অবধারিতভাবে চলে আসে ক্রিকেট। এবং বেশির ভাগই চালকের ভাবখানা থাকে এমন, ‌‘ওহ্‌, ক্রিকেট, হুম, নাম শুনেছি, তবে দেখা হয়নি কখনো।’ ক্লনটার্ফে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন দেখতে যাওয়ার দিন তো চালক ভুল করে অনতি দূরের গলফ ক্লাবে নিয়ে গেলেন! সাধারণত চালকেরা এমন ভুল করেন না।

ক্রিকেটে অরুচির কথাটা বলার পরই চলে আসে ফুটবল। আয়ারল্যান্ড ফুটবল আর রাগবির পাগল। গলফ আর পোলোর বড়োলোকি খেলাও এখানে বেশ কদর পায়। ক্রিকেট এখনো আগ্রহের জায়গা নিতে পারেনি। সম্মান আছে অবশ্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, আরও স্পষ্ট করে বললে ‘টাইগার’দের খেলা কাভার করতে এসেছি জানলে সব জায়গায় কদর পাওয়া যায়।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের টেবিলের শীর্ষে তৈরি হওয়া উত্তেজনার আঁচ এখানেও স্পষ্ট। একের পর এক চালককে লিভারপুলের সমর্থক হিসেবে আবিষ্কার করার পর একটু পড়াশোনা করে নিতেই হলো। তাতেই পাওয়া গেল, লিভারপুলকে কেন এতটা আপন করে নিয়েছে ডাবলিন, কিংবা গোটা আয়ারল্যান্ড।

কারণটা খুব সহজ। লিভারপুলের সঙ্গে একটা আইরিশ যোগসূত্র তৈরি করেছে দ্বীপের ওপার থেকে এ পারে চলে আসা মানুষের দল। সেই যাতায়াতটা কয়েক শতাব্দী ধরেই চলেছে। খুব সাধারণভাবে নিজ ভূমি থেকে আইরিশরা গিয়ে ওঠে যুক্তরাজ্যের ধারেকাছের কোনো জায়গায়। তারপর সেখানে যারা থিতু হতে পারেনি, তারা ছুটে গেছে অন্য কোনোখানে। সবচেয়ে বড় অংশের মানুষ আয়ারল্যান্ড ছেড়েছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে, যখন আয়ারল্যান্ড তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছিল। আইরিশদের মূল খাবার আলু। সেই সময়ে জীবাণুর সংক্রমণে ব্যাপক হারে আলুতে পচন ধরেছিল। খাবারের সংকট মানুষকে বাধ্য করেছিল নতুন জায়গায় গিয়ে থিতু হতে।

আইরিশ গৃহত্যাগী মানুষের দলের একটা বড় অংশ লিভারপুলে জায়গা করে নেয়। রোমান ক্যাথলিকদের জন্য ইংল্যান্ডের সব জায়গায় উষ্ণ অভ্যর্থনাও ছিল না। লিভারপুলের সঙ্গে তখনই মিশে যায় আইরিশ সংস্কৃতি। লিভারপুলের মানুষের ভাষার টানও তাই অনেকটাই আইরিশদের মতো। এমনকি এই দুই দেশে অভিন্ন অনেক জায়গার নামও আছে। এখনো লিভারপুলের ৭২ শতাংশ মানুষ আসলে আইরিশ বংশোদ্ভূত। লিভারপুল শহরের প্রথম মেয়রই ছিলেন একজন আইরিশ।

স্বাভাবিকভাবেই ফুটবলেও এর ছাপ পড়েছে। শুধু লিভারপুল নয়, একই শহরের অন্য ক্লাব এভারটনেও আছে আইরিশ চাপ। তবে লিভারপুল বড় ক্লাব বলে সেখানে যোগসূত্রটা আরও বেশি করে চোখে পড়ে। লিভারপুলের প্রথম কোচও ছিলেন একজন আইরিশ।

আসল কথাটাই তো বলা হয়নি, লিভারপুলের মাঠের নাম যে অ্যানফিল্ড, সেটিও আয়ারল্যান্ডেরই একটি জায়গার নাম থেকে ধার করা!

ঠিক এ কারণে বার্সার সশব্দ পতনের কিংবা লিভারপুলের সমর্থকদের উদ্‌যাপনের গর্জনটা যখন শোনা গেল আইরিশ একটা পাব থেকে, প্রথমে খানিকটা ভড়কে গেলেও বোঝা গেল, ওই যে ট্যাক্সিচালক ব্যারি এখানে আসার প্রথম দিনেই বলেছিল, ‘উই উইল গিভ দেম (বার্সেলোনা) আ স্কয়ার’, সেই ব্যারিই যেন এখানকার পানশালার কোনো চেয়ারে বসে বিয়ারে চুর হয়ে অ্যানফিল্ডে চলে গেছে। আর মেসিদের একদম কানের কাছে এমন চিৎকার দিচ্ছে, বার্সেলোনা তো তাতেই আধমরা!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন