মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে উজ্জ্বল উপস্থিতি আছে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনেরও। স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা ফিরে তাকাব সেই দিকে। শুনব খেলার জগতের মানুষের ত্যাগ আর বীরত্বের কথা
default-image

আর কিছুক্ষণ পরই ভয়ংকর এক অপারেশন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থান জামালপুরের কামালপুর বিওপিতে (সীমান্তচৌকি)। সরাসরি যুদ্ধ করে দখল করে নিতে হবে বিওপিটি। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বালুচ রেজিমেন্টের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল সেটি। আর কিছুক্ষণ পরই জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যোদ্ধারা। যুদ্ধে নেতৃত্বে দেবেন হাফিজউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানেন না, সেটিই তাঁর শেষ যাত্রা কি না!

যেকোনো সৈনিকেরই হয়তো বড় কোনো যুদ্ধযাত্রার আগে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সুখে মোড়া আনন্দময় পারিবারিক জীবনের কথা। প্রিয়জনদের কথা। হাফিজউদ্দিন আহমেদও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তার ওপর কামালপুরের যুদ্ধটি ছিল অসম লড়াই। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদে সমৃদ্ধ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্টের ইউনিট। যে সীমান্তচৌকিটিতে আক্রমণ করা হবে, সেটিকে রীতিমতো দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে তারা।

১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট কি পারবে? বালুচ রেজিমেন্টের তুলনায় তাদের শক্তিমত্তা নগণ্য। এত দিন গেরিলা কায়দায় আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করে আসা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের এবার পরিচয় ঘটবে ভয়াবহ পদাতিক যুদ্ধের সঙ্গে, যেখানে সৈনিকেরা জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে সরাসরি শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গেলে হাতাহাতি যুদ্ধও করতে হয়। শরীরের জোরে পরাভূত করার চেষ্টা করতে হয় শত্রুসৈন্যকে।

এমন একটা ভয়াবহ যুদ্ধের আগে হাফিজউদ্দিন আহমেদের মনে পড়ছিল তাঁর ফুটবলার-জীবনের কথা। খুব দূর অতীতের বিষয় ছিল না সেটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দুর্দান্ত এক ফুটবলার হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। খেলছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো দেশসেরা ক্লাবে। হয়ে উঠেছিলেন সাদা-কালো শিবিরের অপরিহার্য খেলোয়াড়। পরে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। সেনাবাহিনী দলের হয়েও এমন পারফরম্যান্স ছিল তাঁর, বাঙালিদের প্রতি চরম বৈরী পশ্চিম পাকিস্তানিরাও তাঁর পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে খেলা আটকাতে পারেনি। তারকাখ্যাতিতে উদ্ভাসিত ছিল হাফিজউদ্দিনের ফুটবল-জীবন। খেলাটা উপভোগও করতেন দারুণ। মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ ম্যাচে তো ছিলেন অধিনায়কই। কিন্তু দেশমাতৃকার ডাকের কাছে তাঁর তুচ্ছ মনে হয়েছিল সবকিছুই। কামালপুর যুদ্ধের আগমুহূর্তে ভাবছিলেন, এই তো কিছুদিন আগেই পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে তুরস্ক সফর করেছেন। এশিয়ান কাপের আসর খেলতে গিয়েছিলেন বার্মার রেঙ্গুনে (এখন মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন)। পাঁচ তারকা হোটেল, ছেঁকে ধরা অটোগ্রাফ শিকারিদের দল, মাঠে বল পায়ে এলেই হাজার দর্শকের উল্লাসধ্বনি; কামালপুর যুদ্ধের আগে সেসব একটু বেশিই মনে পড়ছিল তাঁর।

হাফিজউদ্দিন আহমেদের জীবনের গল্প বৈচিত্র্যে ভরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র ছিলেন, ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলার পাগল। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস—এমন কোনো খেলা ছিল না, যাতে তাঁর আগ্রহ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সবাই যখন নানা রোমান্টিকতায় বুঁদ হয়ে থাকেন, তখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল খেলাধুলা। ফুটবল প্রতিভাটা ছিল ঈশ্বর-প্রদত্ত। বেগ পেতে হয়নি মোহামেডানের মতো দলে সুযোগ করে নিতেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাশাপাশিই চালিয়ে গেছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা। এমনি করে একদিন সুযোগ এসে যায় আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার গৌরবমাল্য পরার। সুযোগ করে নেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে, যে সুযোগ পাকিস্তান আমলে খুব কম বাঙালি ক্রীড়াবিদেরই হতো।

default-image
বিজ্ঞাপন

সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেওয়ার চাপ ছিল পরিবার থেকে। কিন্তু এখানেও জয়ী হয় তাঁর খেলোয়াড়ি সত্তা, ‘বাবা আজহারউদ্দিন আহমেদ চেয়েছিলেন আমি সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষা দেব (এখনকার বিসিএস)। বাবার কথায় বইপত্র জোগাড় করে পড়াশোনাও শুরু করলাম। কিন্তু ওই সময়ই পাকিস্তান দলে সুযোগ পেয়ে গেলাম। এশিয়ান কাপের খেলা হবে বার্মায়। পরীক্ষা যেদিন, সেদিনই দল বার্মা যাবে। দোটানায় পড়ে গেলেও জয়ী হয়েছিল আমার খেলোয়াড়ি সত্তাই। পরীক্ষার হলে না গিয়ে জাতীয় দলের ব্লেজার চাপিয়ে চলে গেলাম ঢাকা বিমানবন্দরে, পাকিস্তান দলের সঙ্গে। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিই যখন, তখনো মাথায় ছিল ওই ফুটবলই।’

এই মানুষটিই ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ যশোরের ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নেতা হয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণার বিরুদ্ধে। ৮ ঘণ্টা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বেরিয়ে এসেছিলেন যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে। সেই স্মৃতি মনে করে হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা জানতাম না, দেশের মানুষ সেই বিদ্রোহ কীভাবে নেবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্য ইউনিটগুলোর খবরও আমরা জানতাম না। সেনাবাহিনীতে তখন সব সময়ই বাঙালি-পাঞ্জাবি দ্বন্দ্ব ছিল। পাঞ্জাবিরা আমাদের বিশ্বাস করত না, আমরা পাঞ্জাবিদের বিশ্বাস করতাম না। আমরা যশোর থেকে একটু দূরে জগদীশপুরে শীতকালীন প্রশিক্ষণে ছিলাম। ২৫ মার্চ ঢাকায় কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে, সেটাও আমরা জানতাম না। সেনাবাহিনীর ইউনিটে রেডিও শোনা নিষিদ্ধ ছিল। হঠাৎ করেই জানতে পারলাম আমাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরতে হবে, ফেরার পর দেখলাম পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের সৈনিকদের দিকেই অস্ত্র তাক করে আছে। কারণ তাঁরা বাঙালি। এরপর বিদ্রোহ করা ছাড়া উপায় ছিল না।’

জাতীয় ফুটবল দলের তারকা ফুটবলার হাফিজ ৯ মাস অস্ত্র হাতে কাটিয়েছেন রণাঙ্গনেই। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল নিত্যসঙ্গী। সহযোদ্ধার মৃত্যু দেখা ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা। যুদ্ধের ময়দানে প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সহকর্মীদের হারিয়েছেন, কিন্তু মনোবল হারাননি। স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন বাংলাদেশের। খেলতে চেয়েছেন স্বাধীন দেশের জার্সি গায়ে, ‘মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস মাথায় অন্য কিছু ছিল না। পরিবার-পরিজনের কথা মনে হতো। প্রিয় ফুটবল, ফুটবলার জীবনের কথা মনে পড়ত। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ধ্যানজ্ঞান ছিল, যেকোনো মূল্যে দেশ স্বাধীন করতে হবে। বাঙালি জাতিকে মুক্ত করতে হবে। কী অসম্ভব দেশপ্রেম দেখেছি মানুষের মধ্যে! যে বাঙালিকে “ভেতো” বলে গাল দেওয়া হতো, সেই বাঙালি যুবকদের মধ্যেই দেখেছি রক্ত টগবগে আবেগ, সে সময় যেকোনো বাঙালিই দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারত অবলীলায়। আমি সে সময়ের সাক্ষী। আমি ভাগ্যবান। ওই সময়ের দাবির কাছে ফুটবলার জীবন, তারকাখ্যাতি, ক্যারিয়ার—সবই ছিল তুচ্ছ।’

default-image

কামালপুর বিওপি দখলের যুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন হাফিজউদ্দিন। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে অপর কোম্পানি কমান্ডার, হাফিজের প্রিয় বন্ধু ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হয়েছিলেন। শহীদ হতে পারতেন হাফিজ নিজেও। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। চারদিকে মর্টার শেল আর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণের মধ্যে হতাহতের আর্তচিৎকার। অসম লড়াইয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক সৈনিক নিহত হন। শত্রুর শেলের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হয়েছিলেন হাফিজউদ্দিনও। সে মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারেননি তিনি, ‘সৈনিকদের জীবন মানেই তো “জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য”। কামালপুর যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ। আমাদের ৩০ জন বীর সৈনিক শাহাদত বরণ করেছিলেন। সালাউদ্দিন মমতাজ, আমার প্রিয় বন্ধু, সহকর্মী; তিনিও শহীদ হন। যুদ্ধটা ছিল এমন যে রাতের বেলা আমরা বাংকারে বসা পাকিস্তানি সৈনিকদের দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আমাদের সৈনিকদের তারা দেখছে। আমরা কেবল গুলির ফ্ল্যাশ দেখছি, আর কিছুই নয়। আমার পরম সৌভাগ্য যে সে যুদ্ধে আমি বেঁচে ফিরেছিলাম। তবে সীমিত লোকবল আর অস্ত্র সম্ভার নিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা সেদিন কামালপুরে যা করেছিলেন, সেটি অভাবনীয়। সেই বীরত্বগাথার কোনো তুলনা হয় না।’

মুক্তিযুদ্ধে হাফিজউদ্দিন আহমেদের অবদানের স্বীকৃতি স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছে। ‘বীর বিক্রম’ খেতাব এখন যেন তাঁর নামেরই অংশ। তারপরও একটা আক্ষেপ রয়েই গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি যে গায়ে তুলতে পারেননি তিনি! হাফিজউদ্দিন বলছিলেন, ‘আমি জানি না কেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দলে আমি খেলতে পারিনি। এটা খুব কষ্টের এক অনুভূতি। হয়তো সে সময়ের ফুটবল প্রশাসকেরা আমাকে যোগ্য মনে করেননি। হয়তো অন্য কোনো কারণ আছে। এই আক্ষেপ আমার কোনো দিনও যাবে না।’

এ শতাব্দীর শুরুতে ফিফা হাফিজউদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশের ‘শতাব্দী-সেরা ফুটবলারে’র মর্যাদা দেয়। বাফুফে সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন আশির দশকের শুরুতে। এরপর আসেন রাজনীতিতে, ভোলার লালমোহন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ছয়বার। মন্ত্রিত্ব করেছেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরযোদ্ধা, দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা।

বাংলাদেশ দলে খেলতে না পারলেও মুক্তিযুদ্ধই হাফিজউদ্দিন আহমেদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সত্যিকারের জনযুদ্ধ। এর কোনো তুলনা হয় না। যে যাঁর অবস্থান থেকে অবলীলায় সাড়া দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার ডাকে। আমি তারকা ফুটবলার ছিলাম কি ছিলাম না, সেটি বড় কোনো ব্যাপার নয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করাটাকে আমি আমার দায়িত্ব মনে করেছি। সেটি করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমি দেশের মুক্তির একজন সৈনিক ছিলাম। আমার কাছে এর চেয়ে বড় গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন