ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি: যখন রাঙাতেন এল ক্লাসিকো। চ্যাম্পিয়নস লিগেও অতীত হয়ে যাবেন দুজন?
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি: যখন রাঙাতেন এল ক্লাসিকো। চ্যাম্পিয়নস লিগেও অতীত হয়ে যাবেন দুজন? এএফপি ফাইল ছবি

যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রেই কথাটা বলা হয়। নিজেকে এমনভাবে বানিয়ে নিন যাতে আপনার অনুপস্থিতি হয়ে যায় আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ধারণার পেছনে এই শক্তিকেই হয়তো কাজে লাগাতে চাইছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাবগুলো।

ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর ১২টি মিলে চ্যাম্পিয়নস লিগের বিকল্প হিসেবে এই বিদ্রোহী লিগকে আনতে চাইছে, কারণ তাদের জানা আছে, তারা খেলবে বলেই দর্শকের চোখ সেদিকে থাকবে। আর না থাকলে চ্যাম্পিয়নস লিগ হারাবে আকর্ষণ। এর প্রভাব পড়বে আর্থিক হিসেব-নিকেশে। উয়েফাও হয়তো তখন এই সুপার লিগকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে। এ-ই হয়তো ভাবনা সুপার লিগের আয়োজনের নেপথ্যে জড়িয়ে থাকা ১২ ক্লাবের।

উয়েফা অবশ্য এরই মধ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছে। বিদ্রোহী এই লিগে যে ক্লাবগুলো খেলবে, তাদের নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছেন উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন। পাশাপাশি এই ক্লাবগুলোর খেলোয়াড়দের ফিফা কিংবা উয়েফার কোনো টুর্নামেন্টে খেলতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন। এর আগে গতকাল থেকেই প্রতিটি দেশের লিগের আয়োজক কমিটি জানিয়ে রেখেছে, এই দলগুলোকে নিজেদের লিগেও খেলতে দেবে না।

হুমকিটা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে অনেকের। কিন্তু যদি উয়েফা শক্ত হাতে আসলেই রুখে দাঁড়ায়, যদি আসলেই নিষিদ্ধ করে বার্সা-রিয়ালের মতো ক্লাবগুলোকে, সে ক্ষেত্রে আগামী মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে কারা খেলবে? বিশেষ করে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের কোন কোন দল যাবে ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বসূচক টুর্নামেন্টে? কিছুটা ধারণা দিতে পারে এই মুহুর্তে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের পয়েন্ট তালিকা।

বিজ্ঞাপন

বলতে পারেন, মধ্যবিত্তদের চ্যাম্পিয়নস লিগ হবে সেটি। ভাবুন তো একবার, বার্সা, রিয়াল, লিভারপুলের মতো ক্লাব নেই। চ্যাম্পিয়নস লিগের আবহসঙ্গীতটা ম্যাচের আগে বেশ রোমাঞ্চ নিয়ে গায়ে মাখিয়ে নিচ্ছেন ওয়েস্ট হাম, লিডস ইউনাইটেড, রিয়াল বেতিস কিংবা রিয়াল সোসিয়েদাদের মতো ক্লাবের খেলোয়াড়েরা!

আসলেই কি এ দলগুলোই আসবে? ইউরোপের সেরা পাঁচের লিগের পয়েন্ট তালিকা থেকে সুপার লিগের আয়োজক ১২ ক্লাব বাদ দিলে চিত্রটা তো তা-ই দাঁড়ায়! হ্যাঁ, এখন পর্যন্ত জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালেরও কোনো ক্লাব সুপার লিগে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি—অন্তত প্রকাশ্যে নয়, সে ক্ষেত্রে বায়ার্ন মিউনিখ, ডর্টমুন্ড, পিএসজি, পোর্তোর মতো দলগুলো তো থাকবেই। কিন্তু এদের পাশে রিয়াল-বার্সার জায়গায় খেলবে বেতিস-ওয়েস্ট হামের মতো ক্লাব! ভাবা যায়!

দেখে নেওয়া যাক, এই মুহূর্তে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের মধ্যে ইংল্যান্ড-স্পেন ও ইতালির লিগের (যেহেতু জার্মানি ও ফ্রান্সের কোনো দল এখন পর্যন্ত সুপার লিগে যাওয়ার কথা জানায়নি, সে ক্ষেত্রে তাদের চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা থাকবে না) পয়েন্ট তালিকার হিসাবে বার্সা-রিয়াল-লিভারপুল-জুভেন্টাসের মতো ক্লাবগুলোর বিকল্প হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবে কারা?

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ

ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আয়োজনের নেপথ্যে ‘নাটের গুরু’ যে ১২টি ক্লাব, তার মধ্যে ৬টিই ইংল্যান্ডের। ইংলিশ ফুটবলে যে ছয়টি ক্লাবের জন্য বেশ গালভরা এক নাম আছে—‘বিগ সিক্স।’ ইংল্যান্ডের সফলতম দুই ক্লাব লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তো আছেই, এই শতকে সবচেয়ে সফল চেলসি আর ম্যানচেস্টার সিটিও যোগ দিয়েছে সুপার লিগে। এদের পাশাপাশি যোগ দিয়েছে ইউরোপে এখনো কোনো সাফল্যের দেখা না পাওয়া আর্সেনাল আর টটেনহামও।

এই ছয়টি ক্লাবই যদি নিষিদ্ধ হয়ে যায়, লিগে আর খেলতে না পারে, সে ক্ষেত্রে এদের বাদ দিয়েই তো এবারের লিগের পয়েন্ট তালিকার হিসাব হবে। সে ক্ষেত্রে পয়েন্ট তালিকা কেমন দাঁড়াবে?

default-image

এই মুহূর্তে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের দুই ক্লাব ম্যান সিটি (৩২ ম্যাচে ৭৪ পয়েন্ট) ও ম্যান ইউনাইটেড (৩২ ম্যাচে ৬৬ পয়েন্ট) আছে লিগের পয়েন্ট তালিকার সেরা দুইয়ে। তারা নিষিদ্ধ হলে তিনে থাকা লেস্টার সিটি (৩১ ম্যাচে ৬৬ পয়েন্ট) প্রথম দল হিসেবে যাবে চ্যাম্পিয়নস লিগে। চারে এই মৌসুমের চমক ওয়েস্ট হাম (৩২ ম্যাচে ৫৫ পয়েন্ট)। পয়েন্ট তালিকা এভাবেই থাকলে তারা চ্যাম্পিয়নস লিগে যাবে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় দল হিসেবে।

পাঁচ থেকে সাত নম্বরে ‘সুপার লিগের আয়োজক’দের মধ্যে তিন ক্লাব চেলসি (৩১ ম্যাচে ৫৪ পয়েন্ট), লিভারপুল (৩১ ম্যাচে ৫২) ও টটেনহাম (৩২ ম্যাচে ৫০)।

বিজ্ঞাপন

এই তিন ক্লাব নিষিদ্ধ হলে সে ক্ষেত্রে শিঁকে ছিড়বে ৩১ ম্যাচে ৪৯ পয়েন্ট নিয়ে আট নম্বরে থাকা এভারটনের ভাগ্যের।

নয় নম্বরে আর্সেনাল (৩২ ম্যাচে ৪৬ পয়েন্ট), তারাও নিষিদ্ধ হলে সে ক্ষেত্রে দশ নম্বরে থাকা লিডস ইউনাইটেড (৩১ ম্যাচে ৪৫ পয়েন্ট) ইংল্যান্ডের চতুর্থ দল হিসেবে খেলবে চ্যাম্পিয়নস লিগে! অথচ মার্সেলো বিয়েলসার দলটা গত মৌসুমে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছে।

অবশ্য বিগ সিক্স নিষিদ্ধ হলে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে তখন ভালোভাবে ফিরবে এই মৌসুমে ইংল্যান্ডের আরেক চমক দেখানো দল অ্যাস্টন ভিলা। ৩০ ম্যাচে ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা আছে লিগের ১১ নম্বরে।

default-image

স্প্যানিশ লা লিগা

এখানে হিসেবটা সোজা হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে স্প্যানিশ লিগের শিরোপার পথে ইঁদুর-বিড়াল দৌড় চলছে আতলেতিকো মাদ্রিদ (৩১ ম্যাচে ৭০ পয়েন্ট), রিয়াল মাদ্রিদ (৩১ ম্যাচে ৬৭) ও তিনে থাকা বার্সেলোনার (৩০ ম্যাচে ৬৫ পয়েন্ট)। উয়েফা ও লা লিগা কর্তৃপক্ষের হুমকি সত্যি হলে এই তিন দলই সুপার লিগে খেলার দায়ে হবে নিষিদ্ধ। সে ক্ষেত্রে পয়েন্ট তালিকার চার থেকে সাত নম্বরে যথাক্রমে থাকা চার দল— - সেভিয়া, ভিয়ারিয়াল, রিয়াল বেতিস ও রিয়াল সোসিয়েদাদ থাকবে চ্যাম্পিয়নস লিগে যাওয়ার দৌড়ে।

এই মুহূর্তে সেভিয়া শিরোপাদৌড়ে রিয়াল-বার্সা-আতলেতিকোর সঙ্গেই লড়ছে। তিনে থাকা বার্সার চেয়ে এক ম্যাচ বেশি খেলে ১ পয়েন্ট পিছিয়ে হুলেন লোপেতেগির দল, শীর্ষে থাকা আতলেতিকোর সমান ম্যাচ খেলে পিছিয়ে ৬ পয়েন্টে। ৩১টি করে ম্যাচ শেষে ভিয়ারিয়াল, বেতিস ও সোসিয়েদাদ যে অবস্থানে আছে, তাতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তাদের আগামী মৌসুমে ইউরোপা লিগে খেলার কথা। আটে থাকা গ্রানাদার (৩০ ম্যাচে ৩৯ পয়েন্ট) পক্ষে এই তিন দলকে টপকে যাওয়া বেশ কঠিনই, প্রায় অসম্ভব।

ইতালিয়ান সিরি ‘আ’

আতালান্তার কপাল খুলল আর কী! গতকালই জুভেন্টাসের মাঠে দুই দশক পর লিগে জয়ের দেখা পেয়েছে দলটা, জুভেন্টাসকে লিগের পয়েন্ট তালিকার ঠেলে দিয়ে নিজেরা উঠে গেছে তিন নম্বরে। সুপার লিগে খেলা দলের নিষেধাজ্ঞার শাস্তি কার্যকর হলে সেই আতালান্তা ইতালির প্রথম দল হিসেবে চলে যাবে চ্যাম্পিয়নস লিগে!

default-image

লিগের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা ইন্টার মিলান, দুইয়ে থাকা এসি মিলান আর চারে থাকা জুভেন্টাস—ইতালিতে সুপার লিগের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব এই তিনটিই। ক্লাব তিনটি নিষিদ্ধ হলে (এই মুহূর্তের পয়েন্ট তালিকা অনুযায়ী) আতালান্তা সবার আগে যাবে চ্যাম্পিয়নস লিগে। এরপর পাঁচে থাকা নাপোলি, ছয়ে থাকা লাৎসিও, সাত নম্বরে থাকা রোমা...ইতালিয়ান ফুটবল থেকে একেবারে অপরিচিত দল দেখতে হবে না আর কি!

জার্মানি ও ফ্রান্সের দলগুলোর মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, লাইপজিগ পিএসজি, মার্শেই...সব ক্লাবেরই সুপার লিগে খেলার সম্ভাবনার কথা শোনা গিয়েছিল কদিন ধরে। এই ক্লাবগুলোর মধ্যে কোনোটি যদি আসলেই যোগ দেয় সুপার লিগে, তখন ইউরোপে অনিয়মিত কোনো ক্লাবের নামও তখন উঠে আসবে দৌড়ে।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন