ইকার্দির গোলের পর নেইমারের হাসি।
ইকার্দির গোলের পর নেইমারের হাসি। ছবি: এএফপি

নেইমারের নিষেধাজ্ঞা চলছে। লিলের বিপক্ষে গত ৩ এপ্রিল লিগে ১-০ গোলে হারের ম্যাচে শেষ মুহুর্তে লাল কার্ড দেখেছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। দুই হলুদ কার্ড হলেও লিগ কমিটির সিদ্ধান্তে নেইমারের নিষেধাজ্ঞাটা পরে দাঁড়ায় দুই ম্যাচের। মাঝে স্ত্রাসবুর্গের বিপক্ষে ম্যাচ গেছে, নেইমারের দুই ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল আজ সেঁত এতিয়েনের বিপক্ষে। মাঠে না থাকা নেইমার তাই গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখেছেন।

যা দেখেছেন, তাতে নেইমারের স্নায়ুর ওপর দিয়ে বড় ঝড়ই যাওয়ার কথা। পিএসজি সমর্থকদেরও তা-ই। বিরতিতে গোলশূন্য ম্যাচটা শেষ ১৯ মিনিটে দেখেছে ৫ গোল! এর মধ্যে যোগ করা সময়ে গোল হয়েছে দুটি। ৯২ মিনিটে সেঁত এতিয়েনের গোল, ৯৫ মিনিটে পিএসজির!

সেঁত এতিয়েন ৯২ মিনিটে সমতা ফেরানোর পর মনে হচ্ছিল, ড্র করে লিগের শিরোপাদৌড়ে আবারও বড় ধাক্কা খাচ্ছে পিএসজি। কিন্তু নেইমারহীন পিএসজিকে ৯৫ মিনিটে গোল করে বাঁচিয়েছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার মাউরো ইকার্দি। গোলটা গড়ে দিয়েছেন আরেক আর্জেন্টাইন আনহেল দি মারিয়া। গোলটার পর গ্যালারিতে থাকা নেইমারের হাসিই বলে দিচ্ছিল, কতটা স্বস্তি প্যারিসিয়ানরা পাচ্ছেন এই গোলে।

পিএসজির মাঠে অতিনাটকীয়তা দেখা ম্যাচটা আজ শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতেছে পিএসজি। ইকার্দির গোলের আগে পিএসজির হয়ে জোড়া গোল করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।

বিজ্ঞাপন

গত মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে নেইমার অসাধারণ খেলেছেন। যদিও গোল পাননি, তবে বায়ার্নকে বিদায় করে দিয়ে পিএসজির টানা দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে বড় অবদান ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডেরই। আজ কি নেইমারের অভাব কিছুটা বোধ করেছে পিএসজি? ম্যাচে পিএসজির ৭২ শতাংশ বল দখল আর ১৭টি শট নেওয়া অবশ্য বলে, আক্রমণ গড়তে অত বেগ পেতে হয়নি ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের। দুবার বার আর পোস্টও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পিএসজির।

default-image

নিষেধাজ্ঞার কারণে নেইমারের পাশাপাশি ছিলেন না দুই মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস আর ইদ্রিসা গানা গেয়ে। বায়ার্নের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়া মারকিনিওস নেই চোটের কারণে, বায়ার্নের বিপক্ষে গত মঙ্গলবার কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগেও ছিলেন না। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার বায়ার্ন ম্যাচের একাদশে আটটি বদল আনেন পিএসজির আর্জেন্টাইন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো। এমবাপ্পে, ডিফেন্ডার কিমপেম্বে আর মিডফিল্ডার দানিলো—এই তিনজনই শুধু জায়গা ধরে রাখতে পেরেছেন।

অবশ্য দলে বদল আনারই কথা পিএসজির। একে তো আগামী বুধবার ফ্রেঞ্চ কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, তার ওপর লিগ-চ্যাম্পিয়নস লিগে বড় পরীক্ষা সামনে অপেক্ষায়। পাশাপাশি রেকর্ডও পিএসজিকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগানোর কথা। সেঁত এতিয়েনের বিপক্ষে লিগে সর্বশেষ ১৫ ম্যাচে হারেনি পিএসজি, ঘরের মাঠে হারেনি ৬ ম্যাচে। কিন্তু এবার জিততে এত নাটক করতে হবে, তা যদি আগে জানত পিএসজি!

৩৩ ম্যাচে ৬৯ পয়েন্ট নিয়ে লিগের পয়েন্ট তালিকার দুই নম্বরে পিএসজি। শীর্ষে থাকা লিলের পয়েন্ট ৩৩ ম্যাচে ৭০। ৩২ ম্যাচে ৬৫ পয়েন্ট নিয়ে তিন নম্বরে থাকা মোনাকো আজই বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় খেলতে নামবে বোর্দোর বিপক্ষে।

২৯ মিনিটে নাটকের প্রথম বড় কিস্তি। পিএসজির স্প্যানিশ উইঙ্গার পাবলো সারাবিয়ার শট ফেরে পোস্টে লেগে। ৩৩ মিনিটে দুর্ভাগ্য সঙ্গী সেঁত এতিয়েনের, তাদের ফরোয়ার্ড ওয়াহাবি খাজরি দারুণ হাফ ভলিতে গোল করলেও তা বাতিল হয় অফসাইডের কারণে। বিরতিতে ম্যাচ গোলশূন্য, ৬৭ মিনিটে পিএসজি একসঙ্গে তিন বদল করে দি মারিয়া, ইকার্দি ও মার্কো ভেরাত্তিকে নামানোর পর ম্যাচের চিত্রনাট্যে আসে বদল। ১০ মিনিটের মধ্যে দুটি গোলের সুযোগ পায় পিএসজি, কিন্তু গোল আসেনি।

এরপর ৭৭ মিনিটে পিএসজির জন্য ধাক্কা! ম্যাচে হঠাৎ ঝড়ের শুরু সেখান থেকে। স্ট্রাইকার দেনিস বুয়াঙ্গার গোলে হঠাৎ এগিয়ে যায় সেঁত এতিয়েন। এগিয়ে তো যায়নি, যেন সাপের লেজ মাড়িয়েছে! আঘাতটা সম্ভবত বেশি লেগেছে কিলিয়ান এমবাপ্পের গায়ে। এর আগপর্যন্ত তিন-চারবার ছোট-বড় সুযোগে গোল করতে ব্যর্থ এমবাপ্পে জবাব দিতে সময় নিলেন দুই মিনিট। পিএসজির মিডফিল্ডার আন্দের এরেরার দারুণ ভাসানো পাস ধরে গোল ২২ বছর বয়সী ফরাসি স্ট্রাইকারের।

আট মিনিট পর আবার এমবাপ্পের গোল। এবার উৎস, পেনাল্টি। এমবাপ্পেকেই বাধা দিতে গিয়ে ফেলে দেন সেঁত এতিয়েন গোলকিপার গ্রিন। পেনাল্টি পায় পিএসজি, বলটা জালে জড়িয়ে ম্যাচে পিএসজিকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পেই। এরপর একটা করে মিনিট পার হয়, আর পিএসজি সমর্থকদের মানসিক চাপ আরও যেন বাড়ছিল! সেঁত এতিয়েন একটা গোল করে ফেললেই তো ঝামেলা!

বিজ্ঞাপন

যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আসলেই ঝামেলা সত্যি হয়ে হাজির! বুয়াঙ্গার শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন পিএসজির গোলকিপার রিকো, কিন্তু ঠেকিয়ে বলটাকে বেশি দূর পার করতে পারেননি। বক্সের মধ্যেই বল পড়ে রোমাইন হানুমার পায়ে। তাঁর শট জালে। ২-২! ম্যাচের সময় তখন প্রায় শেষ!

এর মধ্যে যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে দি মারিয়ার একটা শট পোস্টে লেগে ফিরল! তখন হয়তো অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, ম্যাচটা ড্র হচ্ছে আর কপাল পুড়ছে পিএসজির। লিগের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা লিল গতকাল ড্র করেছে, নিজেদের ম্যাচ ড্র করা মানে তো পিএসজির আর সেটির সুবিধা নেওয়া হচ্ছে না!

default-image

কিন্তু দি মারিয়া ও ইকার্দি তা হতে দিলেন না। ডান দিকে আঁকাবাঁকা দৌড়ে দুই সেঁত এতিয়েন ডিফেন্ডারের কড়া ট্যাকল এড়িয়ে গেলেন দি মারিয়া। এরপর বক্সের কোণ থেকে দূরের পোস্টে মাপা ক্রস পাঠালেন। পড়ল ইকার্দির মাথায়! তাঁর প্লেসিং হেড ঠাঁই করে নেয় জালে। ইকার্দি বাঁধা পড়লেন সতীর্থদের গলে। এদিক-ওদিক ছোটাছুটি, পাগলাটে উদ্‌যাপন... স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচ একেই বলে!

এই জয়ের পর ৩৩ ম্যাচে ৬৯ পয়েন্ট নিয়ে লিগের পয়েন্ট তালিকার দুই নম্বরে পিএসজি। শীর্ষে থাকা লিলের পয়েন্ট ৩৩ ম্যাচে ৭০। ৩২ ম্যাচে ৬৫ পয়েন্ট নিয়ে তিন নম্বরে থাকা মোনাকো আজই বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় খেলতে নামবে বোর্দোর বিপক্ষে। ৩২ ম্যাচে ৬৪ পয়েন্ট নিয়ে চার নম্বরে থাকা লিওঁ কাল খেলবে নঁতের বিপক্ষে।

এরপর লিগে সব দলের বাকি থাকবে আর পাঁচ ম্যাচ। শিরোপাদৌড়ের নাটক দেখাবে সেগুলো, এটা হয়তো বলেই দেওয়া যায়!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন