মালিকপক্ষের সঙ্গে লিভারপুলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ
মালিকপক্ষের সঙ্গে লিভারপুলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপছবি : টুইটার

‘যে করেই হোক আমি এ ব্যাপারে সাহায্য করার চেষ্টা করব, ঝামেলা মেটানোর চেষ্টা করব।’

কথাটা লিভারপুলের ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপের। ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ঘোষণা আসার পর থেকে আরও দশজনের মতো ক্লপও হতাশ হয়েছিলেন নিজেদের মালিকপক্ষের হঠকারী সিদ্ধান্তে। কী কারণে ঠিক এই ১২ ক্লাব উয়েফার অধীনে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ না নিয়ে আলাদা একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করার তোড়জোড় শুরু করছিল, সেটা বুঝেছিলেন তিনি। আর বুঝেছিলেন দেখেই আরও বিরক্ত হয়েছিলেন। কারণ যে লিভারপুলকে ভালোবেসে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যে মূলনীতির ওপর লিভারপুল প্রতিষ্ঠিত, এ সিদ্ধান্ত সে মূলমন্ত্রকে সায় দেয় না মোটেও। সব মিলিয়ে ক্লপ কথা দিয়েছিলেন, যেভাবেই হোক, এই ঝামেলা মেটানোর চেষ্টা করবেন।

বিজ্ঞাপন

সে চেষ্টায় কাজ হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ভক্ত-সমর্থকদের বিক্ষোভ ও সমালোচনার জের ধরে দুদিন পরেই ঘোর কেটে গেছে ১২ বিদ্রোহী ক্লাবের মধ্যে ইংল্যান্ডের ৬টার, ইতালি ও স্পেনের ১টার। সুপার লিগ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল, টটেনহাম, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ইন্টার মিলান ও আতলেতিকো মাদ্রিদ। লিভারপুলের মালিক, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী জন ডব্লিউ হেনরি নিজেদের সেই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন সমর্থকদের কাছে।

default-image

ক্লাবের অন্য কাউকে দোষী না বানিয়ে, বরং পুরো দোষটাই নিজের ঘাড়ে টেনে এনেছেন হেনরি। স্বীকার করেছেন, এই ঝামেলা সৃষ্টির জন্য তিনিই দায়ী, ‘গত ৪৮ ঘণ্টায় আমি যেসব ঝামেলার জন্ম দিয়েছি, তার জন্য আমি লিভারপুল ক্লাবের সমর্থকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, তা–ও বলা উচিত যে আমরা যে প্রকল্পটা হাতে নিয়েছিলাম, সমর্থকদের সমর্থন ছাড়া সে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা একদমই সম্ভব না। ইংল্যান্ডে এমন কখনোই হয়নি। ৪৮ ঘণ্টা ধরে আপনারা খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে না। আমরা আপনাদের কথা শুনতে পেয়েছি। আমি শুনতে পেয়েছি।’

ক্লাবসংশ্লিষ্ট সবার কাছেই ক্ষমা চেয়েছেন লিভারপুলের মালিক, ‘আমি ইয়ুর্গেনের (কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ) কাছে, বিলির (প্রধান নির্বাহী বিলি হোগান) কাছে, খেলোয়াড়দের কাছে এবং প্রত্যেকের কাছে ক্ষমা চাইছি, যারা আমাদের ভক্তদের গর্বিত করার জন্য প্রতিনিয়ত লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের হয়ে কাজ করে থাকে। এই ঝামেলার জন্য তাদের বিন্দুমাত্রও দায় নেই। বরং এই ঝামেলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তারাই হয়েছে। এটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। তারা আপনার এই ক্লাবকে ভালোবাসে, আপনাকে প্রতিনিয়ত গর্বিত করার জন্য কাজ করে।’

ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আবারও যেন মালিকপক্ষের ওপর সমর্থকেরা ভরসা রাখেন, সে আশাই করেছেন হেনরি, ‘আমি জানি এই ঝামেলা থেকে উত্তরণের জন্য, আবারও আস্থা আনার জন্য পুরো লিভারপুল দলের যথাযথ নেতৃত্ব, যোগ্যতা ও আবেগ আছে। এক দশকের আগে যখন আমরা এই দায়িত্বটা নিয়েছিলাম, তখন আমরাও আপনাদের মতো স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমরা আপনাদের ক্লাবকে আজকের এই অবস্থানে আনার জন্য অনেক কাজ করেছি। সে কাজ এখনো শেষ হয়নি। আশা করব আপনারা বুঝবেন যে আমরা যখন কোনো ভুলও করি, ক্লাবের সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্য কাজ করছি দেখেই করে ফেলি। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে আমরা আপনাদের মাথা নত করে দিয়েছি।’

বিজ্ঞাপন

সুপার লিগ চালু করার ব্যাপারে রিয়াল মাদ্রিদের ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ, আর্সেনালের স্ট্যান ক্রোয়েঙ্কে, জুভেন্টাসের আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জোয়েল গ্লেজারের পাশাপাশি এই জন হেনরিও ছিলেন সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী। দুদিন পরই খামোকা দলে একটা অস্বস্তির বাতাস বইয়ে দেওয়ার জন্য হেনরি নিজেই অনুতপ্ত, ‘আমি আবারও ক্ষমা চাইছি। আমি নিজে এই কাজের জন্য দায়ী। গত দুই দিন ধরে খামোকা নেতিবাচকতা এনেছি আমি। এটা আমি কখনো ভুলব না। এই ঘটনা আমাদের সমর্থকদের শক্তির প্রমাণ দেয়, যা আজ আছে, আগামীতেও থাকবে।’

সবশেষে ফুটবল খেলায় সমর্থকদের ভূমিকার কথাই স্বীকার করেছে, ‘এই ভীতিকর মহামারি যদি আমাদের একটা জিনিসও শিখিয়ে থাকে, সেটা হলো যেকোনো খেলাতেই সমর্থক কত বড় ভূমিকা পালন করে। খালি স্টেডিয়াম দেখলেই সে কথা আরও মনে পড়ে। খুবই কঠিন একটা বছর যাচ্ছে, কেউই এই মহামারির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, এমন নেই। এই সময়ে আমাদের লিভারপুল পরিবার যেন এককাট্টা থাকে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি ওয়াদা করছি ক্লাবের এই মান বাড়ানোর জন্য যা যা করা দরকার, আমি করব। শোনার জন্য ধন্যবাদ।’

default-image

লিভারপুলের আগে আর্সেনালও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসার বিবৃতি দিয়েছিল গতকাল। তবে এই প্রসঙ্গে এভাবে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে ক্লাবমালিকের ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা লিভারপুলই প্রথম করে দেখাল।

লিভারপুলের কোচ তো বটেই, অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসনও এই সংকটকালে এগিয়ে এসেছিলেন গতকাল। লিগের বিশ দলের বিশজন অধিনায়কের সঙ্গে সভা করেছেন, তাঁদের মতামত জেনেছেন। সভা শেষে সমর্থকের সঙ্গেই সুর মিলিয়েছেন, জানিয়েছেন এই লিগে খেলার কোনো ইচ্ছা নেই তাঁদের, ‘আমরা এই সিদ্ধান্ত পছন্দ করছি না এবং এমন কোনো কাজ আমরা হতে দিতে পারি না। এটা আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। এই ক্লাব ও ক্লাবের সমর্থকদের প্রতি আমাদের পুরোপুরি ও শর্তহীন দায়বদ্ধতা রয়েছে।’

জর্ডান হেন্ডারসনের বিবৃতি পরে রি-টুইট করে সমর্থন জানিয়েছেন ভার্জিল ফন ডাইক, জেমস মিলনার, থিয়াগো আলকানতারা, ওজান কাবাক, জের্দান শাকিরি, অ্যালিসন বেকার, ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আরনল্ড, অ্যান্ডি রবার্টসনের মতো একাধিক তারকা।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন