ঘরের মাঠে এমবাপ্পের দাপট দেখেছেন মেসি।
ঘরের মাঠে এমবাপ্পের দাপট দেখেছেন মেসি।ছবি: রয়টার্স

জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। লিওনেল মেসি ও অন্য তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ক্লাবের সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। তিন মাসের মধ্যে নতুন সভাপতি পাওয়ার কথা ছিল বার্সেলোনার। ২৪ জানুয়ারি হওয়ার কথা ছিল সেই সভাপতি নির্বাচন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রকোপ আবার বাড়ায় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি আবার নতুন করে দিনক্ষণ ঠিক করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তবে আগামী ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন।

নির্বাচনে জয়ের জন্য এত দিন বার্সেলোনার সভাপতি পদপ্রার্থীদের দুটি অস্ত্র ছিল। হোয়ান লাপোর্তা, ভিক্তর ফন্ত ও টনি ফ্রেইসা—তিনজনই মেসি-স্তুতিতে নেমেছিলেন। তিনজনই দাবি করেছেন, যেকোনোভাবেই হোক মেসিকে ধরে রাখবেন। বেতন–ভাতা দিয়ে মেসিকে সন্তুষ্ট করে ক্লাবের ভবিষ্যৎও সুনিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। কদিন আগেই দেউলিয়া হওয়ার শঙ্কায় থাকা একটি ক্লাবের হয়ে কাজটা তাঁরা কীভাবে করবেন, সেটা অবশ্য কেউই পরিষ্কার করে বলেননি।

মেসি ও ক্লাবের ভবিষ্যতের পর এখন নতুন এক অস্ত্র পেয়েছে বার্সেলোনা সভাপতি পদপ্রার্থীরা। আর সেটা হলো ক্লাবের ভবিষ্যতের তারকা খুঁজে নেওয়া। যে তারকাকে দলে টেনে আনার লোভ দেখিয়ে ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছেন বার্সেলোনার এক সভাপতি পদপ্রার্থী, সেই খেলোয়াড়ের নাম আরলিং হরলান্ড।

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহেই বার্সেলোনাকে নিজেদের মাঠে স্তব্ধ করে দিয়েছেন পিএসজির কিলিয়ান এমবাপ্পে। ন্যু ক্যাম্পে গিয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড, যে কীর্তি নয় বছর রিয়াল মাদ্রিদে খেলেও করতে পারেননি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ২২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে পাওয়ার আশায় কেন বসে আছে রিয়াল মাদ্রিদ ও লিভারপুল, সেটা সেদিনের ম্যাচ আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে। মেসি-রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এমবাপ্পের নামই সবার আগে তোলা হয়। পরদিনই অবশ্য এমবাপ্পেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন হরলান্ড। সেভিয়ার মাঠে জোড়া গোল করেছেন এই ২১ বছর বয়সী নরওয়েজিয়ান। খেলার ধরনে দুজনের মধ্যে মিল নেই, কিন্তু একটি বিষয়ে দুজন একই রকম। তা হলো দুজনকে দেখলেই প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভয়ের স্রোত বয়ে যায়। তাঁকে আটকাতে গিয়ে উল্টো পিছিয়ে যায় রক্ষণের সেনারা।

চ্যাম্পিয়নস লিগের সে ম্যাচের পর এমবাপ্পে এখনো মাঠে নামেননি। হরলান্ড কাল রাতেই নেমেছেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শালকের মাঠে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে এনে দিয়েছেন ৪-০ গোলের জয়। এর মধ্যে দুটি গোল তাঁর। এর মধ্যে প্রথম গোল দেখে অধিনায়ক মার্কো রয়েস তো বলেই দিয়েছেন, ‘ও মেশিন!’ অবশ্য এ তকমা পুরোনো। গোলের পর গোল করায়, তাঁকে প্রতিপক্ষ দলগুলো বহু আগেই ‘মেশিন’ বলে ডাকছে। ডর্টমুন্ডের হয়ে মাত্র এক বছরের মতো খেলছেন হরলান্ড। ৪৩ ম্যাচে ৪৩ গোল করেছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগ ক্যারিয়ারে ১৩ ম্যাচে ১৮ গোল করেছেন এরই মাঝে। কোনো ক্লাব যদি নির্দিষ্ট কোনো তারকাকে ঘিরে প্রকল্প বানাতে চায়, তো এমবাপ্পে আর হরলান্ডই সেরা বিকল্প।

বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি হোয়ান লাপোর্তা আবার সে পদে নিজেকে দেখতে চান। এ জন্য যত রকম স্টান্টবাজি করা সম্ভব, করছেন। মেসির বর্তমান বেতন–ভাতা ক্লাবের এই পরিস্থিতিতে দেওয়া সম্ভব নয় জেনেও সম্ভব হলে বেতন আরও বাড়াবেন বলেছেন, রিয়াল মাদ্রিদকে খোঁচা দিয়ে বার্নাব্যুর সামনে বিশাল এক পোস্টার সাঁটিয়েছেন, যাতে বার্সেলোনা–ভক্তদের বাড়তি ভোট মেলে সে আশায়।

default-image

চ্যাম্পিয়নস লিগে এমবাপ্পে ও হরলান্ডের এমন পারফরম্যান্সের পর এ দুই তারকাকে বার্সায় আনবেন—এমন টোপ দেওয়ারও ইচ্ছা জেগেছে তাঁর। বিশেষ করে হরলান্ডের ক্ষেত্রে দলবদলের অঙ্কটা ১০ কোটি ইউরোর কম বলে তাঁর ব্যাপারে বেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথাই শুনিয়েছেন, ‘আমাদের ফুটবল দলকে আরও ভালো করতে হবে। আমার হাতে কিছু টেক্কা আছে এবং আমি সেগুলো ফেলতে প্রস্তুত। এমন পরিস্থিতিতে কারা প্রভাব রাখতে পারে, এমন লোকদের সম্পর্কে আমি জানি, আমার অভিজ্ঞতা সেটা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমি বার্সেলোনা–সমর্থকদের শান্ত হওয়ার বার্তা দিচ্ছি। আমরা আর্থিকভাবে আবারও সমর্থ হয়ে উঠব।’

চ্যাম্পিয়নস লিগে এমন ভরাডুবির পর ক্লাবের সম্ভাব্য সভাপতির কাছ থেকে এমন কিছুই তো শুনতে চায় সমর্থকেরা। ক্লাব আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। মেসি দলে থাকবেন এবং মেসিকে সাহায্য করার জন্য দলে ঢুকবেন হরলান্ডের মতো তরুণ গোলমেশিন!

চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথম ১৩ ম্যাচেই ১৮ গোল বলে দিচ্ছে, এ প্রতিযোগিতা কত প্রিয় হরলান্ডের। আর পাঁচ বছর ধরেই ইউরোপসেরার প্রতিযোগিতায় ধুঁকছে বার্সেলোনা। মেসিও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার মতো দল পাচ্ছেন না বলে ক্লাব ছাড়তে চাইছেন। এমন অবস্থায় হরলান্ডকে পেলে বর্তে যাবে বার্সেলোনা। কোচ রোনাল্ড কোমানকেও তাই এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছে। জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, হরলান্ডকে পেতে কেমন লাগবে তাঁর?

বিজ্ঞাপন
default-image

কোমান সরাসরি বলে ফেলেননি যে হরলান্ডকে পেতে চান। তবে এটাও বলেননি যে হরলান্ডকে তাঁর দরকার নেই, ‘ক্লাবের ভবিষ্যতে কী দরকার, এ নিয়ে আমার ধারণা আছে। কিন্তু আগে আমাকে ক্লাবের সভাপতি কে হবেন, সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর সঙ্গে বসতে হবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে হবে।’ লাপোর্তা যদি সভাপতি নির্বাচিত হন, তবে ভবিষ্যতের আলোচনায় হরলান্ড যে থাকবেন, এটা নিশ্চিত।

ওদিকে লাপোর্তার এমন আশাবাদের বেলুন ফুটো করে দিয়েছেন অন্য সভাপতি প্রার্থী ফন্ত। কোচ হিসেবে কিংবদন্তি জাভিকে ক্লাবের ফেরাতে বদ্ধপরিকর ফন্ত। মেসিকে ধরে রেখে ক্লাবের একাডেমি থেকে উঠে আসা আনসু ফাতি ও তরুণ পেদ্রি ও ত্রিনকাওদের নিয়েই ভবিষ্যৎ গড়তে আগ্রহী এই প্রার্থী। বার্সেলোনার যে আর্থিক অবস্থা, তাতে এমবাপ্পে বা হরলান্ডদের কেনার কথা বলাটা যে বাগাড়ম্বর, সেটা জানা আছে তাঁর।

জানুয়ারির দলবদলে একজন ডিফেন্ডার খুব দরকার ছিল বার্সেলোনার। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে বার্সা একাডেমিরই এরিক গার্সিয়া ফিরতে উন্মুখ হয়ে ছিলেন। চুক্তির মাত্র ছয় মাস বাকি থাকায় নামমাত্র মূল্যেই তাঁকে ছেড়ে দিত সিটি। কিন্তু আর্থিকভাবে হাত-পা এমনভাবেই বাঁধা বার্সেলোনার যে গার্সিয়াকেও নেওয়া যায়নি। ফন্ত সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, এমন অবস্থায় এমবাপ্পের নাম মুখেও তোলা উচিত নয় ক্লাবের, ‘বার্সেলোনা ১৫ লাখ ইউরো জোগাড় করতে পারেনি এরিক গার্সিয়াকে কেনার জন্য। এ অবস্থায় বড় তারকাদের কেনার কথাবার্তা সব ফালতু কথা। আমাদের ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের (বুদ্ধিমান) মতো আচরণ করা উচিত। ক্লাব এখন ১৫ থেকে ২০ কোটি নতুন দেনার মধ্যে আছে, এ গ্রীষ্মে কোনো বড় দলবদল আমরা করতে পারব না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, হরলান্ড দারুণ এক প্রতিভা। আমি তাঁর ভক্ত। হরলান্ড বা এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড় এনে দলকে শক্তিশালী করাকে আমার “ফ্লোরেন্তিনিজান্দো” (রিয়াল সভাপতির মতো আচরণ) মনে হয়। পেদ্রি ও কুন্দের (সেভিয়া ডিফেন্ডার) মতো তরুণ ও অপরিচিত খেলোয়াড় কিনে তাদের বড় করা সে তুলনায় কঠিন কাজ। এটাই আমাদের কাজ হবে ভবিষ্যতে। বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ তারকা সৃষ্টি করা।’

default-image

তরুণদের সুযোগ না দিয়ে বাইরে থেকে তারকা টানার চেষ্টা করায় কোমানের ওপর যে ক্ষিপ্ত ফন্ত, সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন এক ফাঁকে, ‘রোনাল্ড কোমান ভালো কাজ করলেও পিএসজির বিপক্ষে যে ফল ছিল, সেটা হজম করা কঠিন। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে ক্লাবে একটা নিরেট প্রকল্প আছে।’ নিরেট প্রকল্প বলতে ফন্ত যে কোচ হিসেবে জাভিকেই বোঝেন, সেটা তো বহু আগ থেকেই জানা।

ফন্ত যতই হরলান্ডদের কেনার পক্ষে আপত্তি জানান, নির্বাচনে জিততে চাইলে এমন প্রলোভন তো দেখাতেই হবে। কারণ, নির্বাচনের বছর তারকার প্রলোভন না দেখিয়ে রিয়াল মাদ্রিদে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের মতো সভাপতিই টেকার আশা করেন না। আর বার্সেলোনার জন্য হরলান্ড যে কত লোভনীয়, সেটা এর আগে এমিলি রুশোও বুঝিয়ে দিয়েছেন। পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এই প্রার্থী। কিন্তু যত দিন সভাপতি দৌড়ে ছিলেন, তত দিন বলেছেন, হরলান্ডকে কেনার কথা পাকা করে ফেলেছেন, বার্সেলোনা তাঁকে সভাপতি পদে নির্বাচিত করলেই এনে দেবেন এই স্ট্রাইকারকে। লাপোর্তাও সে পথেই হাঁটছেন।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন