লিডস ইউনাইটেড কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। কাল লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচের এক মুহূর্তে। ছবি: এএফপি
লিডস ইউনাইটেড কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। কাল লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচের এক মুহূর্তে। ছবি: এএফপিছবি: এএফপি

মরিজিও সারির সিগারেট, ফার্গুসনের চুইংগাম আর বিয়েলসার কফির কাপ। ফুটবল ছাড়া তাঁদের মধ্যে মিল সামান্যই। তবে রূপক অর্থে একটি জায়গায় বেশ মিল। সিগারেট পোড়ানোর মতো মাঠে প্রতিপক্ষকে পোড়াতে ভালোবাসেন সারি। ফার্গি খেলোয়াড়দের ছেদন দন্ত বানিয়ে চুইংগাম বানিয়ে ফেলেন প্রতিপক্ষকে। আর মার্সেলো বিয়েলসা? পুরোটাই প্যাশন। কফির কাপে অল্প অল্প চুমুকের মতো তিলে তিলে শেষ করেন প্রতিপক্ষকে। কাপ থেকে ছলকে পড়া কফির মতো উত্তেজনা ছড়ান মাঠে। ডাগ আউটে সুস্থির হয়ে বসার অভ্যাস তাঁর নেই। বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে কিংবা পেছনে রেখে পায়চারি করেন মাথা নিচু করে—কেউ কী ভাবতে পেরেছিল দৃশ্যটা দেখা যাবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে!

বিজ্ঞাপন

চ্যাম্পিয়নশিপে লিডস তা নিশ্চিতের আগে কেউ ভাবতে পারেনি। তখনো হয়তো কারও মাথায় আসেনি আর্জেন্টিনার ‘পাগল’ কোচকে দেখা যাবে ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় লিগে। কিন্তু বিয়েলসা তা ঠিক করে দেওয়ার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। অগাধ ফুটবলজ্ঞানে ঋদ্ধ বিয়েলসাকে নিয়ে এত দিন কারও তেমন আগ্রহ না থাকলেও কাল থেকে শুরু হয়েছে নতুন পর্ব—আর্জেন্টাইন কোচ কেমন করবেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে?

এই প্রশ্নের উত্তরের সূচনাটা অন্তত মিলেছে কাল রাতে। গত মৌসুমে প্রমাণ ব্যবধান রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়া লিভারপুলকে আরেকটু হলেই হারিয়ে দিয়েছিল বিয়েলসার লিডস ইউনাইটেড। স্কোরলাইন বলছে ৪-৩ গোলে হেরেছে লিডস। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মনের স্কোরকার্ডে বিয়েলসাকে নিয়ে অনুভূতিটা কোরবানির গরুর দাম শুনে উৎসুক পথচারীদের প্রতিক্রিয়ার মতো—জিতছেন ভাই জিতছেন! লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ও ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডাইকের কথার সুর অনেকটাই এমন, ‘লিডস তো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে!’ অথচ গত মৌসুমের মাঝপথ পর্যন্তও আলোচনায় ছিল না লিডস। ছিল না তার আগের মৌসুমেও...এভাবে গত ১৬ বছর ধরে। বিয়েলসা কোচ হয়ে দলটিকে ১৬ বছর পর প্রিমিয়ার লিগে তোলার পরই শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। লিভারপুলের মাঠ থেকে লিডস ঘুরে আসার পর এসব আরও ডালপালা মেলাই স্বাভাবিক।

default-image
বিজ্ঞাপন

প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। এমন দলের বিপক্ষে ম্যাচে তিনবার পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে লিডস—সেটিও গত ১৬ বছরের মধ্যে প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে! আরও খোলাসা করে বলা যায়, লিভারপুল তো প্রেসিং ফুটবল খেলতে অভ্যস্ত—তাদের মুখোমুখি হয়ে কাটার জবাব কাটা দিয়েই দিয়েছেন লিডস কোচ। সেই একই প্রেসিং ফুটবল এবং মাঠে দুর্দান্ত পজিশনজ্ঞান দেখা গেল লিডস ফুটবলারদের মধ্যে। টাচ লাইনের ওপাশ থেকে বিয়েলসা যেন তাঁর খেলোয়াড়দের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেন আয়তাকার সবুজ গালিচার দাবার ছকে।

তাতে শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল, বল দখলের হারে লিভারপুলই পিছিয়ে। হ্যাঁ, বিয়েলসার রক্ষণভাগ নিয়ে কাটাছেঁড়া হতেই পারে। তবে ৬৫ বছর বয়সী এ কোচকে আর্জেন্টিনা-চিলির ডাগ আউটে দেখা থাকলে বিষয়টি নিয়ে কারও এত ভাবার কথা নয়। বিয়েলসা আক্রমণে বিশ্বাসী। প্রথম ম্যাচেই লিভারপুলকে মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা তারই প্রমাণ। আরও একটি বিষয়। ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় লিগে শরীর-নির্ভর ফুটবল খেলার কায়দা কৌশল নতুন কিছু নয়। বিয়েলসার খেলায় তার রেশ ছিল কতটুকু? ওটা না করেও যে চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়দের গলা শুকিয়ে দেওয়া যায়—সেটাই তো দেখালেন সর্বকালের অন্যতম প্রভাব জাগানিয়া এ কোচ। তাঁর দীক্ষা নেওয়া ব্যক্তিদের নামগুলো একবার দেখুন—পেপ গার্দিওলা, মরিসিও পচেত্তিনো, হোর্হে সাম্পাওলি, এদুয়ার্দো বেরিজ্জো, জেরার্ডো মার্টিনো। এঁদের মধ্যে কজন শরীর-নির্ভর ফুটবলে বিশ্বাসী?

বিজ্ঞাপন

বিয়েলসা তো পাগল মানুষ। আবেগটাও একটু বেশি। এমনও হতে পারে কাল হারের চেয়ে দর্শকশূন্য গ্যালারি তাঁকে বেশি কষ্ট দিয়েছে। অবশ্য প্রতিপক্ষ দলের কোচের কথা শুনলে দুঃখ একটু উপশম হতে পারে। ইয়ুর্গেন ক্লপ কাল একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলেন। নিজের ঘর বাঁচানোর পাশাপাশি যাঁর কারণে ত্রাহি উঠেছে সেই বিয়েলসার কৌশলও তাঁকে খেয়াল করতে হয়েছে। এমন নয় যে ক্লপ অন্য কোচের কৌশল খেয়াল করেন না। কিন্তু লোকটার নাম মার্সেলো বিয়েলসা বলেই কাল ক্লপের কপালে ভাঁজ পড়েছে বেশি। শেষ বাঁশিতে পরিত্রাণ পাওয়ার পর সেই ভাঁজগুলো ফুটেছে মুখের হাসি হয়ে। আর কণ্ঠে ঝরেছে প্রশংসাবাণী, ‘লিডস বিশেষ একটা দল। দলটার সবাইকে অভিনন্দন রইল। কী দারুণ একটা দল! অবিশ্বাস্য। মৌসুমজুড়ে আমি তাদের খেলা দেখব।’

লিডসে প্রতিষ্ঠিত তারকা নেই। তাদের মন্ত্রটা দল হিসেবে খেলার। খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব এতটুকু খাটো না করেই বলা যায়, ম্যাচ শেষে লিডস নিয়ে লিভারপুল কোচের প্রশংসার হেতু কিন্তু বিয়েলসাই। তাঁর ছোঁয়াতেই তো গায়ে জ্বর উঠেছিল লিভারপুলের। যদিও মাঝ মাঠে লিভারপুলকে খেলার সুযোগ করে দিয়েছিল তারা, যেটা সালাহ-ফিরমিনো-মানেদের মতো খেলোয়াড়দের বিপক্ষে বিপজ্জনক। কিন্তু দৌড়ে খেলে জায়গা ভরাট করা এবং লাইন দিয়ে বলা নিয়ে এগোনোর দুর্দান্ত কৌশল কাজে দেয় লিডসের জন্য। ক্লপ তাই পুরোনো কথাটাই আবার বলেছেন ম্যাচ শেষে, ‘ আগেই বলেছি ওদের বিপক্ষে খেলাটা শতভাগ কঠিন হবে। কারণ ওদের খেলার ধরনটা অস্বস্তিকর। অন্য দলগুলোর মতো না।’

বিজ্ঞাপন

বিয়েলসাও কিন্তু আর সব কোচের মতো নন। মাত্র দুই মৌসুমের চেষ্টায় লিডসের স্বপ্নের পরিধি বড় করেছেন। কিন্তু আর্জেন্টাইন এ কোচকে ধরে রাখা খুব কঠিন কাজ। লিডস তাঁর সঙ্গে এক বছর চুক্তি নবায়ন করলেও বিষয়টি অজানা নয়। শুধু আর্জেন্টিনা ও চিলি জাতীয় দল ছাড়া কোথাও দুই মৌসুমের বেশি কোচিং করাননি। কোথাও ছিলেন এক মৌসুম, কোথাও আবার ছয় মাস। সর্বোচ্চ দুই মৌসুম। বিয়েলসা যে আগামী পরশু নয়, শুধু আগামীকালের কথাই ভাবেন, তা জানেন সবাই। একদিন হয়তো হুট করে লিডসেই দেখা যাবে সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কথা ফলে গেছে ‘পাগল...চলে যাবে খুঁজেও পাবে না/ পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে ফিরেও আসবে না।’

লিডস নিশ্চয়ই তা চাইবে না। এমনকি প্রিমিয়ার লিগের সমর্থকেরাও না। এমন কোচ সব সময় দেখা যায় না।

মন্তব্য পড়ুন 0