পুলিশ হতে না পেরে ‘মনোবিদ’ ফুটবলার

রবিন গোসেনসছবি: রয়টার্স

ফুটবলাররা কখন আত্মজীবনী লেখেন? সাধারণত অবসরের পর। কেউ কেউ এর আগেও লেখেন, যদি তাঁর জীবনটা সে রকম বর্ণাঢ্য হয়, যদি সেখানে থাকে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া নানা ঘটনা এবং অতি অবশ্যই তিনি যদি হন সে রকম বিখ্যাত কেউ।

পরশু রাতের আগে ‘রবিন গোসেনস’ নামটা আসলে ফুটবলপ্রেমীদের কতজন জানতেন? বাকি পৃথিবীর কথা বাদ দিন, যে দেশের হয়ে তিনি এখন খেলছেন, সেই জার্মানিতেই কজন চিনতেন তাঁকে? সংখ্যাটা খুব বেশি হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু পরশু জার্মানির জার্সি গায়ে পর্তুগালকে হারিয়ে দেওয়া ম্যাচের নায়ক হয়ে যাওয়ার পর সেই রবিন গোসেনসের নামটাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। সেই সূত্রে তাঁর কুষ্ঠি ঘেঁটে জানা গেল, এরই মধ্যে ট্রয়মেন লোনট জিশ নামে গোসেনসের একটা আত্মজীবনীও আছে! ২৬ বছর বয়সের একজন ফুটবলার, এখন পর্যন্ত যিনি ইউরোপের নামীদামি কোনো ক্লাবেই খেলেননি, কোনো ক্লাবের হয়ে কোনো ট্রফিও নেই এবং যাঁর জার্মানির জার্সিতেও অভিষেক মাত্র গত বছরের সেপ্টেম্বরে, তাঁর একটা আত্মজীবনী থাকা একটু বিস্ময়কর বৈকি।

দেশের হয়ে নবম ম্যাচ খেলতে নেমেই গোসেনস পেয়ে গেলেন অনেক কিছু।
ছবি: রয়টার্স

জার্মান ভাষায় গোসেনস নিজের আত্মজীবনীর যে নাম দিয়েছেন, সেটার বাংলা করলে অবশ্য জীবনী লেখার উদ্দেশ্য কিছুটা বোঝা যায়। ‘ট্রয়মেন লোনট জিশ’ মানে ‘স্বপ্ন দেখা সার্থক’। খুব বড় স্বপ্ন গোসেনস দেখেননি যদিও। স্বপ্ন বলতে ফুটবলার হওয়া এবং জার্মানির জার্সি গায়ে খেলা। তা সেই স্বপ্ন তো তাঁর সত্যি হয়েছেই। পরশু রাতে যখন পর্তুগালের বিপক্ষে গোল করে এবং করিয়ে মাঠ ছাড়ছেন, সেটা স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছুই মনে হচ্ছিল হয়তো। তারকায় ঠাসা জার্মানি ও পর্তুগাল দলের সবাইকে ছাড়িয়ে অচেনা গোসেনসই যে তখন সবচেয়ে বড় তারকা। ৪-২ গোলে জার্মানির জয়ের পর তিনিই ম্যাচসেরা। গোসেনসও ভাবেননি, দেশের হয়ে মাত্র নবম ম্যাচ খেলতে নেমেই এত কিছু পেয়ে যাবেন!

ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা অবশ্য গোসেনসের ‘প্ল্যান বি’ ছিল। ‘প্ল্যান এ’ ছিল দাদার মতো পুলিশ হওয়ার। জার্মান মা ও ডাচ বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া গোসেনস ছোটবেলায় দাদাকে পুলিশের পোশাকে দেখতে দেখতে নিজেকেও একসময় সেই পোশাকে কল্পনা করতে শুরু করেন। কিন্তু কপাল মন্দ, স্থানীয় এক পুলিশ অফিস থেকে বলা হলো, শরীরের তুলনায় তাঁর পা দুটো বেখাপ্পা, পুলিশের শারীরিক পরীক্ষায় তিনি উতরাতে পারবেন না। অগত্যা প্ল্যান ‘বি’তেই যেতে হলো।

পর্তুগালের বিপক্ষে একটি গোল করেছেন, আরেকটি করিয়েছেন।
ছবি: রয়টার্স

নেদারল্যান্ডসের সীমান্তবর্তী জার্মান শহর এমেরিখে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সেখানেই স্থানীয় কয়েকটি ক্লাবে ফুটবলের পাঠ নেওয়া। গোসেনস এরপর চলে যান বাবার দেশ নেদারল্যান্ডসে, সেখানেই ভিতেসে ক্লাবের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু। ওই ক্লাবের হয়ে অবশ্য খেলা হয়নি তাঁর। পেশাদার চুক্তি হওয়ার পরই ভিতেসে তাঁকে ধারে পাঠিয়ে দেয় আরেক ডাচ ক্লাব দোরদেশে। সেটা ২০১৪ সালের কথা, এক বছর সেখানে কাটিয়ে আসার পর ক্লাব বদলে চলে যান হিরাক্যালস আলমেলোতে। সেখান থেকে দুই বছর পর ইতালির আতালান্তায়।

মূলত জিয়ান পিয়েরো গ্যাসপারিনির অধীন আতালান্তায় খেলেই জার্মান কোচ ইওয়াখিম লুভের চোখে পড়েন গোসেনস। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, পরে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন লেফট উইংব্যাক। এখন এটাই তাঁর নিয়মিত পজিশন।

আত্মজীবনীতে গোসেনস দাবি করেছেন, লুভের আগেই তাঁকে নেদারল্যান্ডস দলে খেলার জন্য ডেকেছিলেন তখনকার কোচ রোনাল্ড কোমান। পৈতৃক সূত্রে তাঁর একটা ডাচ পাসপোর্টও আছে। তবে মন বলছিল, মাতৃভূমি ও জন্মস্থান জার্মানির কথা। মনের কথাই শুনেছেন গোসেনস।

ফুটবলার পরিচয়ের বাইরে আরও একটা পরিচয় আছে গোসেনসের। মনোবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী তিনি। খেলা না থাকলে তিনি মনোবিদই হয়ে যান। মানুষের মনস্তত্ত্ব ঘাঁটাঘাঁটি করা গোসেনসের প্রিয় শখগুলোর একটি।

পরশু রাতের পর আত্মজীবনীতে লেখা আরও একটা ঘটনা বেশ আলোচনায়। বছর দুয়েক আগে কোপা ইতালিয়ায় জুভেন্টাসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে জার্সি বদল করতে চেয়েছিলেন। ম্যাচ হেরে রোনালদো তখন খুব খারাপ মেজাজে। গোসেনস বইয়ে লিখেছেন, ‘আমি তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আমি কি আপনার জার্সিটা পেতে পারি?” তিনি আমার দিকে ফিরেও তাকাননি। না তাকিয়েই “না” বলে দিয়েছিলেন।’ স্বাভাবিকভাবেই খুব কষ্ট পেয়েছিলেন গোসেনস, ‘নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। আমি এক পাশে সরে গিয়েছিলাম, লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম।’ সেদিন ড্রেসিংরুমে ফেরার পর সতীর্থরাও নাকি খুব খেপিয়েছিলেন তাঁকে। একটা জার্সিতে ‘রোনালদো’ আর ‘৭ নম্বর’ লিখে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর লকারের সামনে।

তো মিউনিখে পরশু সেই রোনালদোর সামনে, রোনালদোকে ম্লান করে, রোনালদোর দলকে হারিয়েই হয়েছেন নায়ক। এবার আর জার্সি চাননি?

প্রশ্ন শুনে গোসেনসের সহাস্য উত্তর, ‘না, আমি উদ্‌যাপনে ব্যস্ত ছিলাম, জয়টা উপভোগ করতে চেয়েছি।’

সময়টা তো গোসেনসের উপভোগেরই।