default-image

বেচারা পেলে! ভেবেছিলেন, কেউ তাঁর গোলের রেকর্ড ভাঙতে পারবে না। কিন্তু পরিসংখ্যান তো কল্পনাবিলাসী না! হিসাব–নিকাশে সংখ্যাও মিথ্যা বলে না।

পেলের তা অজানা না থাকলেও এত বছর ধরে আগলে রাখা রেকর্ড হাতছাড়া করতে কারই–বা ভালো লাগে!

তাই চলতি মৌসুমে লিওনেল মেসি–ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মিলে যখন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির মাইলফলক টেনে নামাচ্ছিলেন, পেলের তখন একপ্রকার সংকটে পড়াই স্বাভাবিক। হাজার হোক পেলেও তো রক্ত–মাংসের মানুষ! আর মানুষমাত্রই ‘সেরা’ হতে চায়।

তাই ওসব সংখ্যা–টংখ্যার ধার ধারেননি তিনবার বিশ্বকাপজয়ী। রোনালদো তাঁর সর্বোচ্চ গোলের (পরিসংখ্যানমতে) রেকর্ড ভাঙার পর পেলে আর একমুহূর্ত দেরি করেননি (সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য)। সংকট কাটাতে, মানুষের আস্থা (!) ধরে রাখতে ইনস্টাগ্রামে ‘বায়ো’তে পেলে লেখেন, সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১২৮৩)।

বিজ্ঞাপন

পরে তো এ নিয়ে এলাহি কাণ্ড ঘটে গেল! সংবাদমাধ্যম রটিয়ে দেয়, জগৎজোড়া খ্যাতি ও সম্মান ভুলে হীনম্মন্যতা থেকে ইনস্টগ্রামে ‘বায়ো’ পাল্টেছেন পেলে।

কেউ কেউ আড়েঠারে বলেছেন, পেলে আসলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাঁর অফিশিয়াল ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা। ফুটবলের ইতিহাস, বই–পুস্তক ও পরিসংখ্যান–পোকাদের হিসাবে অবশ্য অফিশিয়াল ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ৭৫৭।

রোনালদো এ রেকর্ডই ভেঙেছেন কিছুদিন আগে। কিন্তু বেরসিক সংবাদমাধ্যম পেলের ‘বায়ো’ পাল্টানোর খবর চাউর করার পর নিজের চিরকালীন পজিশন (ফরোয়ার্ড) পাল্টে পেলে হয়ে যান ডিফেন্ডার।

ফাউল করেও ডিফেন্ডাররা রেফারির সামনে নিজেদের যেভাবে ‘নিষ্পাপ’ দাবি করেন, পেলেও তেমন সুরে টুইট করেন, তাঁর ইনস্টাগ্রামে সর্বোচ্চ গোলদাতার বায়ো শুরু থেকেই ছিল।

পেলের ‘বায়ো’ সাক্ষ্য দিচ্ছে অফিশিয়াল ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১২৮৩। ফুটবলের অনন্যসাধারণ এই ইতিহাসের সত্য–মিথ্যা নিয়ে ঘোর সংকট এখনো কাটেনি।

তার মধ্যে আবার মেসি কিছুদিন আগে ভেঙেছেন পেলের এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। সান্তোসের হয়ে পেলের ৬৪৪ গোলের রেকর্ড ভাঙেন বার্সা তারকা। কিন্তু সান্তোস তা মানবে কেন!

ব্রাজিলিয়ান ক্লাবটি নিজেদের মতো হিসাব কষে ভুলটা ধরিয়ে দেয় তামাম বিশ্বসংসারকে—সান্তোসের জার্সিতে পেলের গোলসংখ্যা ১০৯১। অতএব?

অতএব, ভূতপূর্ব আমলের গোলসংখ্যা আর ইন্টারনেট–পরবর্তী আমলের গোলসংখ্যা নিয়ে এই বিবাদে না জড়ানোই ভালো। শুধু ছোট করে একটু বলে রাখা ভালো, পেলের সময়ে স্বীকৃত ও প্রীতি ম্যাচ ফুটবলের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা হতো না।

এদিকে প্রীতি ম্যাচের গোল হিসাবে নেওয়া হয় না, পেলের ক্ষেত্রেও করা হয়নি, কিন্তু কার ঘাড়ে কয়টা মাথা যে ‘রাজা’কে (ও রেই) বোঝাবে! বরং ‘রাজা’র আবদার মেনে প্রজাদের মতো মনে মনে কলা খাওয়া যায়। কৃষ্ণ (পেলে) করলে লীলা, ‘মেসি–রোনালদো’ করলে দোষ! পর্তুগিজ–আর্জেন্টাইনের প্রীতি ও যুব পর্যায়ের গোলগুলো হিসাবে জুড়ে দিলেই তো হয়! তাহলেই তো নির্বাচনী ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হয়ে যায়!

default-image

কিন্তু সেখানেও সমস্যা। মেসি–রোনালদো সব প্রীতি ও যুব পর্যায়ের ম্যাচের গোলের সঠিক তথ্য–উপাত্ত সংরক্ষিত নেই। সংবাদমাধ্যমগুলো তাই আন্দাজে তির ছুড়ে থাকে—এসব মিলিয়ে রোনালদোর গোলসংখ্যা মেরেকেটে ৮০৮, মেসির ৭৬৭।

অর্থাৎ, প্রীতি ম্যাচে পেলে যে পরিমাণ গোল করেছেন, সে তুলনায় এই প্রীতি ম্যাচেরই গোল থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘নির্বাচন’–এ ১০ শতাংশও লাভবান হননি মেসি–রোনালদো। অর্থাৎ ‘রাজা’ এখানেও জয়যুক্ত।

তাই পেলের ১২৮৩ গোলকে ‘কল্পতরু’ ধরে এগোনোই ভালো। মানে, মেসি–রোনালদো ঠিক কত বছর বয়সে পেলের এই কীর্তি ছুঁতে পারবেন?

বিজ্ঞাপন

সে জন্য কিন্তু খুব গভীর কল্পনাশক্তি থাকতে হবে। রোনালদোর বয়স ৩৫ বছর, মেসির ৩৩ বছর—সময় গড়ানোর সঙ্গে তাঁদের পারফরম্যান্সের গ্রাফও নিম্নমুখী হবে (অন্তত রক্ত–মাংসের শরীরের গতিপ্রকৃতি ধরে)। সে জন্য মৌসুমপ্রতি তাঁদের ম্যাচ ও গোলসংখ্যার গড় বের করে ফেলাটা ভালো।

রোনালদো তাঁর ১৯ মৌসুমে দেশ ও ক্লাব মিলিয়ে গড়ে ৫২ ম্যাচে ৪২.৫টি করে গোল করেছেন। মেসির গড় ৪৯ ম্যাচে ৪৫.১ গোল। এখন মেসি–রোনালদোর ভক্তসংখ্যা তো দুনিয়াজোড়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে তাঁদের খেলার ধার কমবে, চোট বাড়বে—এ যুক্তিতে ভক্তদের মন সায় দেবে কেন!

দিবাস্বপ্নে তো আর যুক্তি চলে না! আর ভক্ত মানেই যুক্তির ধার ধারেন না, তাই মেসি–রোনালদো ১০ বছর পরও একই সুর–তাল–রয়ে খেলবেন—সেটা ভেবে নেওয়াও অন্তত কোনো ফৌজদারি অপরাধ না! আর এভাবে না ভাবলে তো পেলের ১২৮৩ গোলের ‘কল্পতরু’র দেখা পাওয়াও অসম্ভব।

যে গড় দেওয়া হয়েছে, মেসি–রোনালদো তা ধরে (?) রাখতে পারলেও পেলের ১২৮৩ ‘পর্বত’ টপকাতে বেশ সময় লাগবে, দুজনেরই চুল পেকে যাবে হয়তো। ২০৩০–৩১ মৌসুমে গিয়ে রেকর্ডটি ভাঙতে পারেন ৪৬ বছর বয়সী রোনালদো। মেসি তাঁর পরের মৌসুমে (২০৩১–৩১), তখন তাঁর বয়স হবে ৪৪ বছর।

অর্থাৎ দুজনকে আরও ১১ বছর পেশাদার ফুটবল খেলতে হবে, এই একই ছন্দ ধরে রেখে। তা না হলে বয়স হয়তো পঞ্চাশ পেরিয়ে যাবে। কিংবা অন্যভাবেও সম্ভব। সময় থাকতে শীর্ষ পর্যায় থেকে নেমে গিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিভাগীয় পর্যায়ে খেলা, বেশি বেশি গোল করা। এই যাহ, মেসি–রোনালদোর ভক্তদের গায়ে নুনের ছিটা লাগল!

তাহলে পেলের ভক্তদের অবস্থা একবার ভাবুন। এ মৌসুমে মেসি–রোনালদো তো রাজার রেকর্ড–ঘরে স্রেফ আগুন দিয়েছেন!

মন্তব্য করুন