ফাউলে ফাউলে নেইমারকে হারাচ্ছে না তো ফুটবল?
চোটে মাঠে কাতরাচ্ছেন নেইমার। জলটলমল চোখ। কাঁদছেন। স্ট্রেচারে তোলা হলো, দুই হাতে মুখ ঢেকে মাঠ ছাড়ছেন নেইমার। এই দৃশ্য নতুন কিছু নয়।
কিন্তু প্রতিবারই এমন কিছু হলে দম আটকে যায় ফুটবল বিশ্বের। রোববার রাতেও এমন একবার হলো। লিওঁর বিপক্ষে ম্যাচে কাঁদতে কাঁদতে স্ট্রেচারে মাঠ ছেড়েছেন পিএসজি ফরোয়ার্ড। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, মৌসুমের বাকি সময়ের সিংহভাগ নেইমারকে মাঠে দেখা যাবে না।
কিন্তু কাল পিএসজি কোচ টমাস টুখেল জানিয়েছেন, নেইমারের চোট তেমন গুরুতর কিছু নয়। আজ তাঁর আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হবে। রোববার লিলের বিপক্ষে ম্যাচটা খেলা তাঁর জন্য অসম্ভব কিছু নয়।
ব্রাজিল তারকার ভক্তদের জন্য খবরটা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। তবে তাঁর ভক্তদের মধ্যে ক্ষোভও আছে। এই ক্ষোভও নতুন কিছু নয়। নেইমারকে যেভাবে ফাউল করা হয়, তাতে খেপেছেন ভক্তরা।
তাঁর বাবা নেইমার সিনিয়র এমনই এক ভক্ত। রাগটা তিনি ঝেড়েছেন রেফারিদের ওপর। ম্যাচ অফিশিয়ালরা তাঁর ছেলেকে মাঠে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই ধারণা নেইমার সিনিয়রের, ‘আমরা বাড়তি সহিংসতাকে হালকা করে দেখছি বারবার। কেন শুরুতেই এগুলো থামানো হয় না? কেন প্রথম ফাউলেই শাস্তি দেওয়া হয় না। কেন ৭, ৮ বা ৯ নম্বর ফাউল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
লিওঁর বিপক্ষে ছয় নম্বর ফাউলে পায়ে চোট পান নেইমার। থিয়াগো মেন্দেজের সেই ফাউলও ছিল ভয়ংকর। ব্যথায় ঘাস মুঠো করে চেপে ধরে কাতরাচ্ছিলেন পিএসজি তারকা।
ব্যথাটা টের না পেতে দিতে মুখ ঢেকেছিলেন দুই হাতে। বিকৃত মুখে কথিত অভিনয়ের লেশমাত্র ছিল না!
আর তাই নেইমারের বাবার খেপে যাওয়াও অযৌক্তিক কিছু নয়। এমনকি নিরপেক্ষ সমর্থকদেরও ঘা লাগতে পারে। নেইমারের মতো খেলোয়াড়দের ভয়ংকর সব ফাউল থেকে মাঠে যদি সুরক্ষাই না করা যায়, তাহলে ফুটবলের সৌন্দর্যটা থাকে কোথায়!
দুঃখের কথা হলো, মাঠে আর কোনো ফুটবলার সম্ভবত এত নির্মম ফাউলের শিকার হন না। পরিসংখ্যান এ দাবির পক্ষে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে চলতি মৌসুমে ন্যূনতম ২৫টি ফাউলের শিকার হয়েছেন, এমন খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি হিসাব কষা হয়েছে।
কোন খেলোয়াড় কত মিনিট পর পর ফাউলের শিকার হয়েছেন, এ তালিকায় নেইমারের থেকে এগিয়ে (ফাউলের শিকার হওয়ার সময়ের ব্যবধানে) শুধু বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের ব্রিল এমবোলো।
প্রতি ১৮.৩ মিনিট পরপর একটি করে ফাউলের শিকার হয়েছেন নেইমার। অর্থাৎ পিএসজির ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের প্রতি ডিফেন্ডারের মার মার কাট কাট চাহনির অভিযোগ মিথ্যা নয়।
অবশ্য নেইমার এসব পরিসংখ্যান জানলে হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন। ইউরোপের ময়দানে তো এসব সয়েই তাঁকে নিজের পথ করে নিতে হচ্ছে।
২০১৩ সালে তিনি বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার আগে কথাটা বারবার উঠেছে, ইউরোপিয়ান ফুটবলে কড়া ট্যাকলের সংস্কৃতি সইতে পারবেন তো নেইমার? সময় বলে দিয়েছে, তিনি এসব সয়েই বিশ্বসেরা তিন ফুটবলারদের একজন।
পিএসজিতে এ নিয়ে চার মৌসুম খেলছেন নেইমার। এর মধ্যে প্রতি মৌসুমেই সবচেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে ফাউলের শিকার হওয়ায় শীর্ষে ২৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। আর ইউরোপের ময়দান বিবেচনায় নিলে আগের তিন মৌসুমে আছেন শীর্ষ পাঁচে। এই ধারার শুরু ২০১৭-১৮ মৌসুম থেকে, পিএসজিতে তাঁর প্রথম মৌসুম।
গত নভেম্বরে চ্যাম্পিয়নস লিগে লাইপজিগ-পিএসজি ম্যাচের কথাই ধরুন। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা নেইমারকে যেন শরীরী আঘাত করতে ছুটেছেন! দলবদলে বিশ্ব রেকর্ড গড়া নেইমার নিজে ফাউলের শিকার হয়েছেন ৭ বার, ওদিকে তাঁর সতীর্থরা সবাই মিলে ১১ বার।
এর মধ্যে নেইমারের প্রতি কিছু ফাউল ছিল ভীষণ বিপজ্জনকও।
‘অপটা’র পরিসংখ্যান বলছে, চ্যাম্পিয়নস লিগে এবারের মৌসুমে গ্রুপ পর্বে নেইমার অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ফাউলের শিকার হয়েছেন।
প্রতিপক্ষের মাঠে পাঁচবার গিয়ে ফাউলের শিকার হয়েছেন ২৪ বার, এর মধ্যে প্রতি ১৬ মিনিট পরপর একটি করে ফাউল। ভাবা যায়!
কিন্তু সংখ্যাগুলো নির্মম সত্য বলেই প্রশ্নটা ওঠে, নেইমারের প্রতি ডিফেন্ডারের প্রতিহিংসার চাহনি কি শুধু লিগ ওয়ানেই?
অবশ্যই নয়।
কিন্তু লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমারদের মতো ফুটবলার প্রতি হাটবারে মেলার মতো ‘বস্তু’ নন। মেসি-রোনালদোর বয়স তাঁদের পৌঁছে দিয়েছে ক্যারিয়ার-সায়াহ্নে।
মধ্যগগণে থাকা নেইমার প্রতিনিয়ত এভাবে ফাউলের শিকার হলে ফুটবল তাঁকে কত দিন পাবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।