বাবার সঙ্গে আরলিং হরলান্ড।
বাবার সঙ্গে আরলিং হরলান্ড।ছবি: টুইটার

কাবুলিওয়ালা নাকি ফেরিওয়ালা?

কার সঙ্গে চলে তুলনা? নাকি কারও সঙ্গেই নয়? দুজনের ঝোলাতেই থাকত লোভনীয় সব বস্তু। একজনের ঝোলায় নানান দেশের দারুণ সব বিলাস পণ্য, আরেকজনের ঝোলার পণ্য দেশ-জাতের সীমা পেরোতে পারত না। কিন্তু একদিক থেকে দুজনের মধ্যে মিল তো ছিলই। ঝোলাতে তাদের পণ্যের অভাব ছিল না। যে যত কিছুর আবদার নিয়েই আসুক, খরচ করতে জানলে খালি হাতে ফিরতে হতো না কাউকে।

এদিক থেকে মিনো রাইওলা ও আলফ-ইং হরলান্ডের সঙ্গে কাবুলিওয়ালাদের ব্যাপারটা মিলছে না। এখানে ঝোলা নিয়ে দুজন ঘুরলেও পণ্য মাত্র একটি। তবে একটি হলেও আগ্রহী ক্রেতার কিন্তু অভাব নেই। আর সবার জিহ্বার জল গড়ানোর ইচ্ছা নিয়ে ঝোলা নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘোরা শুরু করেছেন দুজন। কাল যাত্রা শুরু করেছেন, এই সপ্তাহে শেষ হবে সে যাত্রা। তারপরও যে কোনো ভাগ্যবান পণ্য পাবেন, সে নিশ্চয়তা নেই। পণ্যটা যে এখন প্রায় অমূল্য হয়ে উঠেছে। এ প্রজন্মের সবচেয়ে ভয়ংকর ‘নাম্বার নাইন’, আর্লিং হরলান্ড!

বিজ্ঞাপন
default-image

গতকাল ইউরোপিয়ান ফুটবল দুনিয়ায় ঝড় উঠেছিল হঠাৎ। দলবদলের বাজারের জন্য বিশ্বাসযোগ্য যত সূত্র আছে, সবাই একযোগে জানিয়ে দিলেন বার্সেলোনার নতুন সভাপতি হোয়ান লাপোর্তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন মিনো রাইওলা। ইউরোপের সেরা সব তারকার এজেন্ট রাইওলা। কিন্তু এই সময়ে তাঁর এভাবে কাতালুনিয়ায় আবির্ভূত হওয়ার মানে একটাই, বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের স্ট্রাইকারকে পাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করছে দুই পক্ষ।

নতুন করে বার্সেলোনার সভাপতি হয়েই মেসিকে সেরা এক দল উপহার দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন লাপোর্তা। মেসিকে ধরে রাখবেন, দলের তরুণ সব তারকা পেদ্রি, আনসু ফাতি, রিকি পুচ ও ত্রিনকাওদের নিয়ে এগোবেন আর স্বপ্ন গাঁথবেন হরলান্ডের মতো দুর্দান্ত কোনো স্ট্রাইকারকে কিনে এনে। গতকাল এভাবে তাই রাইওলার বার্সেলোনায় আবির্ভূত হওয়ার পর সবাই ধরেই নিয়েছিলেন, বার্সেলোনার সঙ্গে কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন রাইওলা। এখন শুধু বেতন–ভাতা, সাইনিং বোনাস আর ডর্টমুন্ডের সঙ্গে দলবদলের অঙ্ক মেলানো বাকি।

এর আগের দিনই রাইওলা অবশ্য ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন, ইউরোপে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়দের একজনকে নিয়ে শিগগিরই কিছু করতে যাচ্ছেন। ডর্টমুন্ডের মতো ক্লাবে দেড় বছর কাটানোই যে যথেষ্ট, এখন বড় কোনো পরাশক্তিতে যাওয়ার সময় হয়েছে হরলান্ডের, এমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন, ‘আমি হয়তো হরলান্ডের ব্যাপারে একটু বেশিই সাবধানী ছিলাম, যখন বলেছিলাম, “অন্য কোথাও না গিয়ে চল ডর্টমুন্ডে যাই।” এই ছেলেটা—আমি শতভাগ নিশ্চিত এবং সবাই নিশ্চিত ও যেকোনো ক্লাবে যেতে পারে, যেখানে ইচ্ছা। সে এখন ওই মানে চলে গেছে এবং সেটা গত বছরই করতে পারত। তবে গত বছর কিছু ক্লাব হয়তো বলতেও পারত, “সে তো রেড বুলে (সালজবুর্গ) খেলে, সে কি অন্য ক্লাবে পারবে?” সে নিজের পূর্বানুমানের চেয়ে দ্রুতগতিতে উন্নতি করেছে।’

default-image

এরপরই বার্সেলোনায় আবির্ভূত হয়েছেন রাইওলা। সঙ্গে গেছেন আর্লিংয়ের বাবা আলফ-ইং। সাংবাদিকদের ধোঁকা দেওয়ার ভালোই চেষ্টা করেছিলেন দুজন। রাইওলা প্রথমে বেরিয়ে লাপোর্তার সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। সাংবাদিকেরা যেন বুঝতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে আলফকে বিমানবন্দরের শৌচাগারে অপেক্ষা করতে বলেন। আধা ঘণ্টা পর বের হয়েও অবশ্য লাভ হয়নি। ঠিকই সাংবাদিকদের কাছে ধরা পড়ে গেছেন সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি খেলোয়াড়। নরওয়েজিয়ান সাবেক ফুটবলার নিজেও লাপোর্তার সঙ্গে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেছেন।

আলোচনা এতটাই আওয়াজ তুলেছিল যে ডর্টমুন্ডের ক্রীড়া পরিচালক এ ব্যাপারে দ্রুত নিজেদের অবস্থান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। জার্মান ক্লাবটির হয়ে মাইকেল জর্ক জানিয়েছেন, ‘গতকালই (বুধবার) মিনো রাইওলার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি।’ অবস্থানটা কী, সেটা আন্দাজ করা যায়। গত বছরের জানুয়ারিতে যখন ডর্টমুন্ডে যোগ দেন হরলান্ড, তখন ২০২৪ সাল পর্যন্ত চুক্তি করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, ২০২২ সালে তাঁর রিলিজ ক্লজ হবে ৭ কোটি ৫২০ লাখ ইউরো। কিন্তু দেড় মৌসুমেই এতটা সাড়া ফেলে দিয়েছেন যে হরলান্ডকে এখনই পেতে চায় বড় সব ক্লাব। তাই ডর্টমুন্ডও জানিয়ে দিয়েছে, ১৫ কোটি ইউরোর নিচে কোনোভাবেই তাঁকে বিক্রি করা হবে না।

নাটকের পর্ব বাড়ে কালই। লাপোর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই ভাড়া করা উড়োজাহাজে চড়ে বসেন আলফ ও রাইওলা। কাতালুনিয়া ছেড়ে মাদ্রিদ পানে উড়াল দেন দুজন। সেখান থেকে সোজা রিয়াল মাদ্রিদে। বার্সেলোনার পর রিয়াল মাদ্রিদেরও হর্তাকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন দুজন। বাজারে দাম বাড়াতে চাইলে এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ—দুই পক্ষকেই জানিয়ে দেওয়া, ‘খুব বেশি দর-কষাকষি করলে তোমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবেই যাব আমরা।’

বিজ্ঞাপন

আলফ ও রাইওলার ইউরো ভ্রমণ শেষ হচ্ছে না এখানে। স্পেন ঘোরা শেষে তাঁরা এবার ইংল্যান্ডে যাবেন। সেখানে যে হরলান্ডের মতো স্ট্রাইকার পাওয়ার আশায় বসে আছে চারটি দল। পেশাদার ফুটবলে হরলান্ডের প্রথম কোচ উলে গুনার সুলশারের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাঁকে পেতে চায়। চেলসিও চাইছে দুর্দান্ত আক্রমণভাগের সৃষ্টি করে দেওয়া সুযোগ কাজে লাগানোর মতো এক স্ট্রাইকার। লিভারপুলেও বহুদিন ধরেই একজন বড় তারকা কেনার কথা শোনা যাচ্ছে। আর আলফের সাবেক দল ম্যানচেস্টার সিটি মাত্র কদিন আগেই ক্লাবের ইতিহাসের সেরা গোলদাতা সের্হিও আগুয়েরোকে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। হরলান্ডও তাঁর বাবার ক্লাবের প্রতি দুর্বলতার কথা জানিয়েছেন।

এই ঘোরাঘুরির পর শেষ পর্যন্ত হরলান্ডকে কোন দল পাবে, সেটা মৌসুম শেষ হওয়ার আগে জানার উপায় নেই। তবে যে ক্লাবই পাক না কেন, ফেরিওয়ালারূপী রাইওলা আর আলফ–ইং হরলান্ডের পকেট যে বেশ ভরে উঠবে, সেটা নিশ্চিত। ২০২০–এর জানুয়ারিতেই যেমন ডর্টমুন্ড মাত্র দুই কোটি ইউরোতে কিনেছিল হরলান্ডকে। কিন্তু হরলান্ডের মতো এক প্রতিভাকে অন্য কোনো ক্লাবে না নিয়ে ডর্টমুন্ডে নেওয়ার পুরস্কার হিসেবে আরও দুই কোটি ইউরো ঠিকই নিজের পকেটে নিয়েছিলেন রাইওলা। ইউরোপের ছয় বড় ক্লাবের সামনে এভাবে টোপ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে নির্ঘাত এবার পকেটে আরও অনেক বেশি কিছুই নিতে চাইবেন রাইওলারা।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন