ফ্রান্সকে ঠেকিয়ে দিল ক্ষুধার্ত হাঙ্গেরি

ড্রয়ের হতাশা ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের চোখেমুখে স্পষ্ট।ছবি: রয়টার্স

আগের ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে ৮০ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেছিল দলটা। সেদিন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নামের এক অতিমানবের সামনে আর পারেনি। শেষ দশ মিনিটে রোনালদোর দুই গোলে পর্তুগাল ম্যাচ জিতে নিয়েছিল ৩-০ গোলে।

কিন্তু ইউরোতে ফ্রান্স-জার্মানি-পর্তুগালের মৃত্যুকূপ থেকে অন্তত একটা পয়েন্টের জন্য ক্ষুধা তো ছিল হাঙ্গেরির। ক্ষুধার্ত হাঙ্গেরিই আজ ইউরোতে ছোটখাটো অঘটন ঘটিয়ে দিল! তাদের সামনে থেকে আজ আর জিতে যেতে পারল না ফ্রান্স।

অঘটনের প্রকৃতিটা আরও বড় হওয়ারও শঙ্কা ছিল ৬৫ মিনিট পর্যন্ত। ম্যাচে বলের দখল, গোলের সুযোগ সবদিক থেকেই এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। কিন্তু বুদাপেস্টের ফেরেঙ্ক পুসকাস স্টেডিয়ামের শতভাগ পূর্ণ গ্যালারির সমর্থনে পুষ্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রথমে পিছিয়েই পড়ে ফরাসিরা।

৬৬ মিনিটে আঁতোয়ান গ্রিজমানের গোলে ফেরে সমতায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও আর জয় পাওয়া হলো না বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের। ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মুখ ব্যাদান করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে এমবাপ্পে-গ্রিজমান-বেনজেমাদের।

বিরতির ঠিক আগে হাঙ্গেরিকে এগিয়ে দেন আত্তিলা ফিওলা।
ছবি: রয়টার্স

আগের ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতেছিল ফ্রান্স। আজকের এ ড্রয়ে ২ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট হলো ৪। দুই ম্যাচ থেকে হাঙ্গেরির পয়েন্ট ১। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১০টায় গ্রুপের অন্য দুই দল পর্তুগাল ও জার্মানি নামবে মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায়।

জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের দল থেকে শুধু একটাই বদল আজ এনেছিলেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম। লেফটব্যাকে হার্নান্দেজের বদলে নামিয়েছেন লুকা দিনিয়েকে। কিন্তু লেফটব্যাকের দিকে আর কে নজর রাখে!

ফ্রান্সের দলের আক্রমণভাগ নিয়েই তো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকে যত আলোচনা, ৪-৩-৩ ছকে গড়া সেই আক্রমণভাগে করিম বেনজেমা, কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আঁতোয়ান গ্রিজমানের রসায়নের ওপরই আজও ভরসা রেখেছিলেন দেশম। কিন্তু লাভ শেষ পর্যন্ত হলো কই! দুই ম্যাচ শেষে এখনো ফ্রান্সের গোল দুটি, এর মধ্যে একটি প্রতিপক্ষের আত্মঘাতে, অন্যটি আজ করলেন গ্রিজমান!

ফ্রান্স সমতায় ফেরে গ্রিজমানের গোলে।
ছবি: রয়টার্স

যদিও সুযোগ কম তৈরি করেননি বেনজেমা-এমবাপ্পেরা! ৩-৩-২-২ ছকে শুরু করলেও রক্ষণে বারবার ৫-৩-২ ছকে নেমে যাচ্ছিল হাঙ্গেরি, এই জমাট রক্ষণের বিপক্ষেই ১৪ মিনিটে ফরাসি ত্রিরত্নের দারুণ সমন্বয়ে তৈরি হলো গোলের সুযোগ। বক্সের সামনে এমবাপ্পের কাছ থেকে পাস ধরে বেনজেমা বক্সের বাইরে থেকেই নিচু শট করলেন, হাঙ্গেরি গোলকিপার গুলাচি তা কোনো রকমে ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু বল পড়ল আবার গ্রিজমানের পায়ে। তাঁর শট ফিরিয়ে দেন হাঙ্গেরির সেন্টারব্যাক উইলি অরবান।

১৭ মিনিটে এমবাপ্পে হারালেন দারুণ সুযোগ। বেনজেমার থ্রু ধরে বাঁ দিক থেকে ক্রস করেন লেফটব্যাক দিনিয়ে, কিন্তু গোলপোস্টের সামনে ফাঁকায় দাঁড়ানো এমবাপ্পে বলটা হেড করে জালে পাঠাতে পারলেন না! ৩১ মিনিটে এমবাপ্পে গড়ে দিলেন সুযোগ, সেটি কাজে লাগানো হলো না বেনজেমার। মাঝমাঠ থেকে পল পগবার দারুণ থ্রু বল আসে এমবাপ্পের কাছে। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হাঙ্গেরিয়ান ডিফেন্ডার অরবানকে পাশ কাটিয়ে এমবাপ্পে ক্রস বাড়ালেন বক্সের মাঝে থাকা বেনজেমার কাছে। কিন্তু বেনজেমার প্রথম স্পর্শের শট চলে গেল বাইরে।

এত এত গোলের সুযোগ হারানোর মূল্যই ফ্রান্স দিল বিরতির ঠিক আগে। রক্ষণে রাইটব্যাক বেঞ্জামিন পাভার আর সেন্টারব্যাক রাফায়েল ভারান সে গোলের জন্য দায়ী, তবে তাতে হাঙ্গেরির গোলদাতা আত্তিলা ফিওলার কৃতিত্ব মোটেও খাটো করা যাবে না। পাভার বল ঠিকমতো বিপদমুক্ত করতে পারলেন না, বল গেল হাঙ্গেরির স্ট্রাইকার রোলান্দ সাল্লাইয়ের কাছে। তিনি বল বাড়ালেন আক্রমণসঙ্গী ফিওলার দিকে। পাভারকে এড়িয়ে, ভারানকে কাটিয়ে ফিওলা হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলেন ফ্রান্স গোলপোস্টের কাছে, সেখান থেকে তাঁর মাটি কামড়ানো শট আর ঠেকানোর সাধ্য হলো না ফরাসি গোলকিপার উগো লরিসের।

ইউরোতে এবার একটা স্টেডিয়ামেই গ্যালারি শতভাগ পূর্ণ, সেটি হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের এই স্টেডিয়াম। সেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নিজেদের দলকে এভাবে এগিয়ে যেতে দেখা, এগিয়ে থেকে বিরতিতে যেতে দেখা লাল-রঙা গ্যালারির তখন কী অবস্থা, সেটি বুঝে নিতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয় না!

কিন্তু ফ্রান্স ওদিকে মরণকামড় বসানোর অপেক্ষায়। আক্রমণভাগে তারকার ‘অভাব’ পড়েছে বলেই কি না, ফ্রান্স কোচ দেশম দ্বিতীয়ার্ধে মিডফিল্ডার আদ্রিয়েন রাবিওর বদলে মাঠে নামিয়ে দিলেন গতিশীল উইঙ্গার ওসমান দেম্বেলেকে। হাঙ্গেরির বুঝি তখন কাঁপাকাঁপি অবস্থা। বাঁ দিকে এমবাপ্পের গতি আর চাতুর্য সামলাবে, নাকি ডানদিকে দেম্বেলের? সেটিও যদি কোনোরকমে সামলানো যায়, তো সামনে বেনজেমা আর তাঁর পেছনে প্লেমেকারের ভূমিকায় নামা গ্রিজমান বক্সে অপেক্ষায়!

ম্যাচ শেষে হাঙ্গেরির উচ্ছ্বাস।
ছবি: রয়টার্স

ঠেকাতে পারল না হাঙ্গেরি। ৫৯ মিনিটে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দেম্বেলের শট কোনোরকমে পোস্টে লেগে ফিরল, কিন্তু সাত মিনিট পর ভাগ্যও সঙ্গ দিল না হাঙ্গেরিয়ানদের। ডানদিকে দুই ডিফেন্ডারকে এড়িয়ে এমবাপ্পে নিচু ক্রস পাঠালেন বক্সে, হাঙ্গেরিয়ান এক ডিফেন্ডার বলে পা লাগিয়েছিলেন বটে। কিন্তু বল চলে গেল বক্সের মাঝে, যেখানে ওঁৎ পেতে অপেক্ষায় গ্রিজমান! সেখান থেকে গোল করতে ‘গ্রিজি’র ভুল হলো না।

সমতায় তো ফেরা গেছে, ফ্রান্স তখন জয়ের নেশায় ছুটছে। হাঙ্গেরি সর্বস্ব দিয়ে তাদের রুখছে। এর মধ্যেও এমবাপ্পে দুবার গোলের কাছাকাছি গেলেন। ৬৯ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে গ্রিজমানের ক্রসে এমবাপ্পের শট লাগল পাশের নেটে। বেনজেমার বদলি নামা অলিভিয়ের জিরুর পাস ধরে এমবাপ্পের শট ৮২ মিনিটে ফিরিয়ে দেন হাঙ্গেরিয়ান গোলকিপার। কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না ফ্রান্সের!

যোগ করা সময় এল। তার পঞ্চম মিনিটে শেষ বাঁশি যখন বাজার অপেক্ষায়, দিনিয়ের ক্রসে মাথা ছুঁইয়েছিলেন ভারান। কিন্তু বলটা চলে গেল পোস্টের কিছুটা দূর দিয়ে। তার সঙ্গে সঙ্গেই রেফারির বাঁশি। ফরাসিরা তখন আনতমস্তক। হতাশা তাদের চোখেমুখে।

কিন্তু হাঙ্গেরির কে তখন সেদিকে দেখে! পুসকাস অ্যারেনায় তখন লালরঙা উচ্ছ্বাস।