বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় স্কুলের ভূগোল ক্লাসে প্রথম বাংলাদেশের নাম শোনেন স্তোয়ান। এ পর্যন্তই ছিল তাঁর বাংলাদেশ-জ্ঞান। কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশে খেলতে আসা চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক দিন পরে গাড়ি চালানোর সময় রেডিও অনুষ্ঠানে শোনেন ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের গল্প।

মাত্র ছয় বছর বয়সে বহু লড়াইয়ের পর বসনিয়াকে স্বাধীন দেশ হতে দেখেছেন স্তোয়ান। ফলে স্বাধীনতার মাহাত্ম্যটা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন।

ফুটবলের বাইরে বাংলাদেশ সম্পর্কে এতটুকু জেনেই গত বছরের নভেম্বরে স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তাঁর ঢাকায় আসা। আট বছর বয়সী বড় মেয়ের পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে বলে এরই মধ্যে পরিবারকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশে।

default-image

ইউরোপের পাঁচটি দেশের আট ক্লাবের হয়ে খেলেছেন স্তোয়ান। বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে খেলার জন্য এই প্রথম ইউরোপের বাইরে পা রাখা।

৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বলছিলেন, ‘এখানে পাঁচ মাস থেকে বলতে পারি, খুব ভালো আছি। মনেই হয় না দেশের বাইরে আছি। আসার আগে যে শঙ্কা ছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যেই কেটে গেছে। প্রয়োজনে সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশের মানুষ দৌড়ানো শুরু করে দেন।’

বসুন্ধরা ক্লাবের জন্য বাড়তি প্রশংসা বরাদ্দ রাখলেন স্তোয়ান, ‘কয়েক দিন আগে বসনিয়ার পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছি, বাংলাদেশে এসে ইউরোপের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। ইউরোপের ক্লাবগুলোতে যে সুযোগ–সুবিধা পাওয়া যায়, তার সবকিছুই বসুন্ধরায় আছে। নিজেদের ক্লাবের মাঠে খেলা, ভালো অনুশীলন মাঠ, পুনর্বাসনব্যবস্থা, ভালো কোচিং স্টাফ, আবাসন—সবকিছুই ইউরোপিয়ান আদলে।’

স্তোয়ানের বাবা জেলিকো ভ্রানিয়েস যুগোস্লাভিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে ১৫ বছর খেলেছেন। একমাত্র ছোট ভাই ওগনিয়েন ভ্রানিয়েসও বসনিয়া জাতীয় দলে খেলেন দীর্ঘদিন। অল্প সময়ের জন্য হলেও দুই ভাই জাতীয় দলে খেলেন একসঙ্গে। ২০০৯ সালে স্তোয়ানের জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পরের বছরই অভিষেক হয় ওগনিয়েনের।

মাত্র ৩ ম্যাচ খেলে জাতীয় দলে স্তোয়ানের দৌড় থেমে গেলেও ছোট ভাই বসনিয়ার জার্সিতে খেলেছেন ৩৮টি ম্যাচ। স্পেনের স্পোর্টিং গিজন ও রাশিয়ার আন্ডারলেচেটে খেলা সে ভাই বর্তমানে খেলছেন গ্রিসের বিখ্যাত ক্লাব এইকে এথেন্সে।

default-image

ছোট ভাইকে নিয়ে স্তোয়ানের গর্ব, ‘ওকে বসনিয়ার ইতিহাসে অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার বলা হয়ে থাকে। আমরা দুই ভাই একই সঙ্গে জাতীয় দলে খেলেছি। এমন ঘটনা পৃথিবীতে কমই আছে। নেদারল্যান্ডসের ফ্রাঙ্ক দেবুর ও রোনাল্ড দেবুর আর ক্রোয়েশিয়ার নিকো কোভাক ও রবার্ট কোভাকের কথা শুধু শুনেছি আমি।’

ছোট ভাইয়ের মতো আলো ছড়াতে না পারলেও স্তোয়ানের ফুটবল জীবনবৃত্তান্ত বেশ সমৃদ্ধ। যে এফকে বোরাক বানজা লুকা ক্লাবের হয়ে তাঁর ফুটবলার হয়ে ওঠা, সে ক্লাবের হয়ে খেলেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ইউরোপা লিগের বাছাইপর্ব।

ভ্রানিয়েস বলছিলেন, ‘বোরাক বানজা ক্লাবের হয়ে সব মিলিয়ে দুই শতাধিক গোল করেছি, যা ক্লাবের ইতিহাসে আমাকে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা বানিয়েছে।’

দুর্দান্ত অতীত দেখে কিংস তাঁকে দলে ভেড়ালেও বাংলাদেশে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি স্তোয়ান। ঢাকায় প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিপক্ষে কিংসের ৬-০ গোলে জয়ে স্তোয়ানের গোল ২টি। সেটা ছিল স্বাধীনতা কাপে। এরপর আর গোল পাননি ওই টুর্নামেন্টে।

ফেডারেশন কাপে খেলেনি কিংস। প্রিমিয়ার লিগে ছয় ম্যাচ খেলে মাত্র ২টি গোল স্তোয়ানের। এর মধ্যে ফ্রি–কিকে দুর্দান্ত ১টি গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বসনিয়া জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় তিনি।

নিজের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন, ‘সরাসরি বসনিয়া থেকে এসে এখানে খেলা খুব কঠিন। নভেম্বরে যখন বসনিয়া থেকে এখানে এসেছি, তখন বসনিয়ার তাপমাত্রা “মাইনাস টু-থ্রি” আর এখানে ছিল ৩৫-৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মানিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছি। লিগের শুরুতে কুঁচকিতে চোট পাওয়ায় বেশ কিছু ম্যাচ খেলতে পারিনি। এরপরও কিছু হয়েছে, তাতে আমি সন্তুষ্ট।’

default-image

বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামো যে তাঁর মতো ভালো ফুটবলারের জন্য উপযোগী নয়, সেটি বোঝা গেল স্তোয়ানের কথায়।

তাঁর অভিযোগ, ‘টঙ্গী স্টেডিয়ামে (আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়াম) গিয়ে দেখেছি, মাঠ খারাপ, জাল টানানো, বাইরে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, ধুলা উড়ছে। এ রকম অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। এ ছাড়া এ দেশে শরীরনির্ভর খেলা হয় বেশি। এতে ফুটবলের সৌন্দর্যটা আর থাকে না।’

যদিও এসব প্রতিকূলতার গল্প লেখা থাকবে না ইতিহাসের পাতায়। স্তোয়ানকে মনে রাখা হবে তাঁর মাঠের নৈপুণ্য দিয়েই। কিন্তু সেখানেই তিনি ব্যর্থ। প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় পর্বে দলের সঙ্গে তাঁর থাকা হচ্ছে না, একরকম নিশ্চিত। তাঁর জায়গায় নতুন বিদেশি নিয়ে আসতে চায় কিংস।

তবে এএফসি কাপের জন্য স্তোয়ানকে দলে রাখা হবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আজ বা কাল হোক বসনিয়া তো ফিরবেনই, তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে কী বলবেন?

ভ্রানিয়েসের মুখ থেকেই শুনুন উত্তরটা, ‘বাংলাদেশের মানুষ খুব পরিশ্রমী। রাস্তায় বের হলে বোঝা যায়, সারা দিন মানুষ কাজের জন্য ছুটছেন। এখানকার মানুষ উপকার করতে ভালোবাসেন।’

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন