ক্যাম্প ন্যু-তে কাল ত্রাস ছড়িয়েছেন এমবাপ্পে।
ক্যাম্প ন্যু-তে কাল ত্রাস ছড়িয়েছেন এমবাপ্পে। ছবি: রয়টার্স

চোখধাঁধানো ফুটবল খেলেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। লিওনেল মেসির রাজ্য ক্যাম্প ন্যুতে এসে ২২ বছর বয়সী ফরাসি স্ট্রাইকার যেন সদর্পে ঘোষণা করে গেলেন, ‘রাজ্যপাট এখন থেকে আমার দখলে!’ দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে ছারখার করে দিয়েছেন বার্সাকে, চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকা নেইমারের অভাব পিএসজিকে বুঝতেই দেননি! এমবাপ্পের আগুনে পুড়ে খাক বার্সা কাল চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে ৪-১ গোলে।

বার্সা এখন শোকে পাথর। প্যারিসে এখন আনন্দের আবাহন। মাত্রায় প্যারিসের মতো না হোক, বেশ আনন্দ এখন হচ্ছে মাদ্রিদেও। কাল বার্সার লজ্জার হারের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিয়াল সমর্থকদের আনন্দ চোখে পড়ছে বেশ।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের এভাবে ধুঁকতে দেখার পাশাপাশি সে আনন্দের আরেকটা কারণও আছে, কারণটা এমবাপ্পে। ফরাসি স্ট্রাইকারের ভবিষ্যৎ ঠিকানা রিয়াল মাদ্রিদ হতে পারে, কয়েক বছর ধরে চলে আসা এমন গুঞ্জনের সঙ্গে বার্সার বিপক্ষে এমবাপ্পের এভাবে ঝলসে ওঠা মাদ্রিদ সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ারই কথা।

তবে আনন্দে উদ্বেলিত রিয়াল সমর্থকদের বেলুন চুপসে যাওয়ার অনুভূতি হবে রিয়ালেরই সাবেক খেলোয়াড় ও সাবেক ক্রীড়া পরিচালক হোর্হে ভালদানোর কথা শুনলে। ভালদানোর বিশ্লেষণ, বার্সার বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্সের পর এমবাপ্পে রিয়ালে আসার কথা নয় বরং পিএসজিতে চুক্তি নবায়ন করার কথাই ভাববেন আরও বেশি করে। ক্যাম্প ন্যুর পারফরম্যান্স এমবাপ্পেকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে ভালদানোর।

বিজ্ঞাপন
default-image

বার্সার জন্য চ্যাম্পিয়নস লিগে এমন লজ্জা নতুন নয়। হয়তো ‘দেজা ভ্যু’র অনুভূতি হচ্ছে কাতালানদের। ২০১৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর প্রতিবছরই তো চ্যাম্পিয়নস লিগে এমন লজ্জা তাদের বিধিলিপি হয়ে গেছে। আর পিএসজি এখন উচ্ছ্বাসে ভাসছে। যে ক্যাম্প ন্যুতে ২০১৭ সালে ৬-১ গোলে হারের লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল, সেই ক্যাম্প ন্যুতেই কাল পিএসজি বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে।

এর মধ্যে এমবাপ্পের এভাবে ঝলসে ওঠা পিএসজিকে স্বপ্ন দেখাবে, হয়তো দলের আর নিজের এমন পারফরম্যান্সের পর এমবাপ্পে নিজেও পিএসজিতে আরও লম্বা সময় থেকে যাওয়ার ব্যাপারেই আগ্রহী হবেন। ফরাসি ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর চুক্তি ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তাঁকে পেতে রিয়াল মাদ্রিদের আগ্রহের কথা তো অনেক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে, সেটি এখন আর গোপন কিছু নয়। ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলও এমবাপ্পেকে পেতে চায়।

কিন্তু ভালদানোর মনে হচ্ছে, সবাইকে ফিরিয়ে দিয়ে এমবাপ্পে শেষ পর্যন্ত পিএসজিতেই থেকে যাবেন।

গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলা পিএসজি গতকাল বার্সার মাঠে যেমন খেলেছে, সেটি ইউরোপে তাদের মান-মর্যাদা আরও বাড়িয়েছে নিশ্চিত। সেটিই টানতে পারে এমবাপ্পেকে। এরই মধ্যে নেইমার পিএসজির সঙ্গে চার বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করেছেন বলে গুঞ্জন, সেটিও এমবাপ্পেকে পিএসজিতে থাকতে উৎসাহী করে তুলতে পারে।

এদিকে এই মৌসুম শেষে বার্সেলোনায় মেসির চুক্তি শেষ হয়ে গেলে তাঁকে পিএসজি নিয়ে যেতে চায় বলে গুঞ্জন। এত দিন মনে করা হচ্ছিল, আগামী মৌসুমে এমবাপ্পে পিএসজি ছাড়বেন—সেটি প্রায় নিশ্চিত, আর সে জায়গায় পিএসজি মেসিকে নিয়ে আরেকবার মাঠে নেইমার-মেসির রসায়নে জিততে চাইবে চ্যাম্পিয়নস লিগ।

কিন্তু ভালদানোর মনে হচ্ছে, গতকাল বার্সার মাঠে মেসিকে যেভাবে ম্লান করে দিলেন এমবাপ্পে, তারপর পিএসজি এখন আরও দ্বিগুণ উৎসাহে এমবাপ্পের চুক্তি নবায়নের জন্য ঝাঁপাবে। ‘বড় বড় ম্যাচগুলোতে নিজের জাত চেনানোর মতো ব্যক্তিত্ব ওর (এমবাপ্পে) আছে। আমার মনে হয়, এই ম্যাচের পর এমবাপ্পের ভবিষ্যৎ রিয়াল মাদ্রিদ থেকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দূরে সরে গেল। পিএসজি এখন আর এমবাপ্পের বিকল্প হিসেবে মেসিকে নেওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হবে বলে আমার মনে হয় না।’

বিজ্ঞাপন

কাল বার্সা-পিএসজি ম্যাচ মাঠে গড়ানোর আগেও গুঞ্জন ছিল, শেষ ষোলোতে বার্সার হাতে পিএসজি বিদায় নিলে এমবাপ্পে এই মৌসুম শেষে পিএসজি ছাড়বেন। চোট নেইমারকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিলেও কাগজে-কলমে, মাঠের পারফরম্যান্সে, দলীয় সমন্বয়ে পিএসজিই বার্সার চেয়ে এগিয়ে ছিল। মেসির পেনাল্টিতে বার্সা প্রথমে এগিয়ে গেলেও পিএসজি ম্যাচজুড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই বার্সার চেয়ে অনেক এগিয়ে তারা। আর এমবাপ্পে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মেসি-রোনালদোর উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা কতটা যুক্তিসংগত।

ফস্তিনো আসপ্রিয়া ও আন্দ্রেই শেভচেঙ্কোর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা তৃতীয় খেলোয়াড় হয়েছেন এমবাপ্পে, ক্যাম্প ন্যুতে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ফুটবলার। পিএসজির মালিক নাসের আল-খেলাইফিও ম্যাচের পর এমবাপ্পের প্রশংসায় বলেছেন, ‘খেলোয়াড়েরা নিখুঁত একটা ম্যাচ খেলেছে। দারুণ পারফরম্যান্স। কিলিয়ানের কথা বলতে গেলে, ওর হ্যাটট্রিক দেখে আমি খুব খুশি। ওর নাম, ক্লাবের নাম ইতিহাসে জড়িয়ে গেল। আমরা সবাই ওকে নিয়ে গর্বিত।’

এমবাপ্পে অবশ্য এমন ম্যাচের পরও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নে বললেন, ‘একটা ম্যাচের পরই আমার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে যাওয়া বোকামি হবে। এখানে দীর্ঘ মেয়াদে কী হবে, সেটা ভাবাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময়ই বলেছি, আমি এখানে সুখে আছি।’

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন