বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্কাই স্পোর্টস তা-ই করেছে। আল-আরাবির হয়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে নিয়ে বিশ্লেষণ করার কাজটা যাঁর, সেই ‘ম্যাচ বিশ্লেষক’ বিয়ার্কি মার ওলফাসনের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছে কোচ হিসেবে জাভির দক্ষতার বিবরণ। সেখান থেকে বার্সেলোনার সমর্থকেরা হয়তো বুঝে নিতে পারবেন, লিওনেল মেসিকে পিএসজির কাছে হারিয়ে ফেলা এই বার্সেলোনা, নিজেদের সত্ত্বা হারিয়ে খোঁজা বার্সেলোনাকে জাভি কতটা পথে ফেরাতে পারবেন!

বিয়ার্কি মার ওলফাসন কাতারের লিগে (কাতার স্টার্স লিগ) আল-আরাবির হয়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন অনেকদিন ধরে। গত ডিসেম্বরে কাতারের ঘরোয়া কাপ ‘আমির অব কাতার কাপ’-এর ফাইনালে আল-আরাবিকেই ন্যুনতম ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল জাভির আল-সাদ। সে ম্যাচের আগেও জাভির দলকে নিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন ওলফাসন।

‘তিনি (জাভি) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আল-সাদের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করেছি, কাঁটাছেড়া করেছি। তিনি শুরুর দিকে যেরকম খেলাতেন, আর এখন যেরকম খেলাচ্ছেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটা দেখা দারুণ একটা ব্যাপার ছিল। মানুষ হয়তো বুঝতে পারছে না, তিনি আল-সাদে কী দারুণ কাজ করেছেন’ - স্কাই স্পোর্টসে বলেছেন ওলফাসন।

default-image

জাভির আল-সাদের কিছু গোল আর গতিশীল পাসিং ফুটবলের কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অনেক আগেই। সে থেকে সবার ধারণা, যে পেপ গার্দিওলার অধীনে বার্সেলোনার মাঝমাঠে জাভির দাপট, মিডফিল্ডার হিসেবে জাভির অসাধারণ দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে, সেই গার্দিওলার ধরণের ‘টিকি-টাকা’ই খেলান জাভি।

কিন্তু শুধু বার্সেলোনার ঢংয়ের কোচ হিসেবে জাভিকে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ফেলতে রাজি নন ওলফাসন, ‘আমার মনে হয় শুধু বার্সেলোনা আর ওই টিকি-টাকা দিয়ে জাভিকে বিচার করতে যাওয়া অতি-সাধারণীকরণ হয়ে যাবে। কারণ তিনি যেটা করছেন, সেটা অনেক সৃষ্টিশীল। তাঁর দলকে খেলানোর ধরনও দেখার জন্য দারুণ।’

২০১৫ সালে বার্সেলোনা থেকে খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নেওয়ার পর আল-সাদে যোগ দেন জাভি। সেখানে চার বছর খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন, এরপর বুটজোড়া তুলে রাখার পর আল-সাদের কোচের দায়িত্ব নেন। জাভি খেলোয়াড় থাকার সময় থেকেই আল-সাদের খেলার ধরন বদলাতে শুরু করে। ওলফাসনের বিশ্লেষন, ‘এটা বলব না ওরা (জাভি আসার আগের আল-সাদ) নিজেদের অর্ধে নেমে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলত। তবে আল-সাদে আগে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর অনেক নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আল-সাদের যে দিকটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটা হলো ওদের দল হয়ে খেলা।’

default-image

আল-সাদে জাভি শিরোপা জিতেছেন, তাঁর দলের গতিময় পাসিং ফুটবলও মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি জাভির কোচিং নিয়ে সমালোচনা ছিল এই যে, ধনী ক্লাব হওয়ায় আল-সাদ জাভিকে দামি অনেক খেলোয়াড় এনে দিয়েছে, অন্য দলের খেলোয়াড়দের তুলনায় যাঁরা অনেক এগিয়ে। তাঁদের নিয়েই জাভি দাপট দেখিয়েছেন। কিন্তু ওলফাসনের কথা, ‘আল-সাদে তাঁর অধীনে সেরা খেলোয়াড়েরাই ছিল। কিন্তু খেলার সব দিকেই তিনি দল হয়ে খেলার চেতনা ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন, একটা দল হিসেবে খেলাতে পেরেছেন। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সেরাটা বের করে আনতে জানেন তিনি, প্রত্যেকের সেরা গুনগুলোকে দলের কাজে লাগাতে জানেন। তাঁর এই দিকটা আমার খুব পছন্দ।’

গত মৌসুমে ১৩ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে লিগ জিতেছে জাভির আল-সাদ, জিতেছে ঘরোয়া দুই কাপের দুটিই। লিগ জেতার পথে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে, খেয়েছে সবচেয়ে কম গোল। তার চেয়েও চোখধাঁধানো ব্যাপার, লিগজুড়ে অপরাজিত ছিল আল-সাদ! ওলফাসন বলছেন, ‘আল-সাদ আগে শক্তিশালী দল ছিল, সেখান থেকে (জাভির অধীনে) অবিশ্বাস্যরকম শক্তিশালী হয়ে গেল। এখানে শুধু বল দখলে রাখাই মূল কথা নয়। চূড়ান্ত দাপট বলতে যা বোঝায়, তাঁর দল সেটাই দেখিয়েছে। ম্যাচের প্রত্যেকটা পর্যায়ে দাপট দেখিয়েছে। যখন বলের দখল ওদের থাকে না, তখন সবাই মিলে তীব্র গতিতে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর দলে শুধু বল দখলে রাখাই সব নয়, প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলাই আসল কথা!’

default-image

জাভির দলের খেলার ধরনকে বহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন ওলফাসন, ‘তাঁর দলের খেলার ধরন হচ্ছে দ্রুত বয়ে চলা নদীর মতো। পানি বয়ে যেতে থাকবে, আপনি তাতে পাথর ফেলে আটকাতে চাইলে পানি অন্য পথ খুঁজে নেবে। তাঁর দলের আক্রমণের কৌশল এমনই। ওরা ১-০ গোলে জয়ে খুশি হয়ে বসে থাকে না। প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়।’

আল-সাদে জাভি গত মৌসুম থেকে মাঝমাঠে পেয়েছেন এক সময়ে স্পেন দলে তাঁর সতীর্থ এবং আর্সেনাল-ভিয়ারিয়ালের সাবেক প্লেমেকার সান্তি কাসোরলাকে। এখনো আল-সাদে মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ দারুণভাবে সামলাচ্ছেন কাসোরলা। ওলফাসনের চোখে কাসোরলাই কাতারের সেরা খেলোয়াড়। তবে এর পাশাপাশি আল-সাদের দলে আরও অনেক তারকা ফুটবলার আছেন। ইংলিশ ক্লাব সোয়ানসি সিটি থেকে আন্দ্রে আইয়ুও যোগ দিয়েছিলেন জাভির আল-সাদে।

ওলফাসন বলছিলেন, ‘কাতারের লিগে একটা দল পাঁচজন বিদেশি খেলোয়াড় খেলাতে পারবে, বাকি সবাই স্থানীয়। কিন্তু বোঝার জন্যে বলি, জাভির দলে কাতারের জাতীয় দলের ১২ জন খেলোয়াড় আছে। সে হিসেবে তাঁর কাছে স্থানীয়দের মধ্যে সেরা এবং লিগের সেরা বিদেশি খেলোয়াড়েরাও আছেন।’ কিন্তু এর বিপদটাও বোঝালেন ওলফাসন, ‘দলে অনেক বড় তারকা, লিগের সেরা তারকারাই থাকলে, তখন খেলোয়াড়দের সামলানোর দক্ষতাই জরুরি হয়ে ওঠে। জাভি সবাইকে অনুপ্রাণিত রাখতে পেরেছেন, সবার মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছেন। এটা তিনি পারবেন কি না, এ নিয়ে আমার সংশয় ছিল।’

default-image

এত তারকা খেলোয়াড়ের কারণেই জাভির আল-সাদ খেলোয়াড়দের মানের বিচারে কাতারের অন্য দলের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। সে কারণেই কি জাভির সাফল্যকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না? হয়তো। তবে এর সঙ্গে বার্সেলোনারও তো মিল আছে। মেসি বার্সা ছেড়ে গেলেও, বার্সা আর্থিক দুরবস্থা থাকলেও বার্সার বর্তমান দল স্প্যানিশ লিগে অন্য অনেক দলের চেয়ে প্রতিভা ও দক্ষতায় এগিয়ে। কিন্তু বার্সার সাবেক কোচ রোনাল্ড কোমান সেটির সুবিধা নিতে পারেননি। জাভি পারবেন?

ওলফাসনের বিশ্লেষণ, ‘জাভির দলের বিপক্ষে খেললে আপনি জানবেন কী হতে পারে ম্যাচে। ওরা কীভাবে আক্রমণ করবে, মাঠের বাঁদিকে কী হবে, ডানদিকে কী হবে, ওরা আক্রমণ গড়ার পথে কীভাবে কী করবে, সেটা হয়তো জেনে যাবেন। আমি জাভির দলের খেলার প্রতিটি ধাপ ব্যাখ্যা করতে পারব। খেলার মূলনীতিটা এত পরিষ্কার! তিনি জানেন দলের প্রতিটি পজিশনে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে তিনি কী চান!’

জাভির দলের শক্তির জায়গাটাও ব্যাখ্যা করেছেন ওলফাসন, ‘ওর দল বল হারালে সেটা আবার দ্রুত কেড়ে নিতে চায়। সে কারণে ওই কয়েকটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। ওই ‘‘প্রেসিং’’টা আপনাকে এড়িয়ে যেতেই হবে। আবার আপনার দল বল হারালেও আপনাকে নিয়ন্ত্রণ ঠিক রাখতে হবে। কারণ বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেই জাভি সবচেয়ে গোছানো। ম্যাচটা যদি এলোমেলো হয়, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তাহলে দশবারের মধ্যে নয়বারই তাঁর দল জিতবে।’

default-image

জাভির সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য সতর্কতাবাণী হতে পারে ওলফাসনের পরের কথাগুলো, ‘আল-সাদের বিপক্ষে আক্রমণে ওঠার সময় আপনি কখনোই বেশি খেলোয়াড়কে প্রতিপক্ষ বক্সে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারতেন না। কারণ তাঁর দল জানে, এসব ক্ষেত্রে কীভাবে পাল্টা আক্রমণের মোক্ষম অস্ত্র খুঁজে নিতে হয়। আপনি বেশি খেলোয়াড় আক্রমণে নিলে, ধরুন আপনি ওদের একটা প্রান্তকে অকার্যকর করতে চাইলেন, ওরা অন্য প্রান্ত দিয়ে আপনাকে ভোগাবে। আর সবকিছুই এত দ্রুতগতিতে হয়, এত নিখুঁতভাবে হয়!’

আল-সাদে এই তিন বছরে জাভির কৌশলেও বদল এসেছে বলে জানালেন ওলফাসন, ‘তিনি প্রথম যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সব সময় ৪-৩-৩ ছকে খেলাতেন। কিন্তু তিনি নিজেই এ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল, ৩-৪-৩ ছকে খেলালে তিনি দলের আক্রমণের সময়গুলোতে খেলোয়াড়দের দক্ষতাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে দলের মূল খেলোয়াড়দের আরও সামনে রাখা যাবে।’

জাভির কোচিংয়ের সবকিছু মিলিয়েই ওলফাসনের মনে হচ্ছে, বার্সেলোনায় ভালোই করবেন জাভি। ‘তিনি খুব ভালোভাবেই বার্সেলোনার জন্য প্রস্তুত। ক্লাবটার ভেতর-বাইরের সবকিছু তিনি জানেন, খেলোয়াড়দেরও ভালোভাবেই চেনেন। তিনি সেখানে কী করেন, সেটা দেখতে আমার আর তর সইছে না’ - বলছেন ওলফাসন।

বার্সেলোনায় রোনাল্ড কোমান আর কিছু করুন না করুন, তরুণ অনেক খেলোয়াড়কে উঠিয়ে এনেছেন - সেটা নিজ ইচ্ছায়ই হোক, বা প্রয়োজনে। কিন্তু আনসু ফাতি, পেদ্রি, গাভি, নিকো গঞ্জালেস, রিকি পুচদের মতো তরুণ প্রতিভাবানদের নিয়ে জাভি কী করতে পারেন, সেটা নিয়ে বার্সেলোনার সমর্থকদের প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত! ওলফাসনও বলছেন, ‘তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে কাকে তিনি বেশি খেলান, সেটি দেখার মতো ব্যাপার হবে। কারণ প্রতিটি পজিশনের জন্য একজনের খেলোয়াড়ের কী কী দক্ষতা থাকা দরকার, সেটা তাঁর মাথায় আছে। হ্যাঁ, বার্সেলোনায় স্কোয়াডটা অনেক বড়, ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের অনেক খেলোয়াড় আছে। তিনি এই খেলোয়াড়দের কীভাবে কাজে লাগান, তাঁর কৌশলের সেরাটা দেখাতে তিনি কোন ধাঁচের খেলোয়াড়কে সামনে নিয়ে আসেন, সেটা দেখার মতো ব্যাপার। তাঁর নিজের কৌশলও কীভাবে উন্নত হয়, সেটাও দেখতে হবে।’

জাভি নিজের কৌশল নিয়ে যে বসে থাকেন না, সেটিও জানিয়ে দিলেন ওলফাসন, ‘তাঁর এই দিকটাও খুব ভালো লাগে। এমন নয় যে তিনি শুধু একটা ধারণা নিয়ে বসে থাকেন এবং সেখানেই থেমে থাকেন। সব সময়ই উন্নতির জায়গা খোঁজেন তিনি। নিজেকে আরও ভালো করতে চান, যেটা আমার চোখে একজন ভালো কোচের বৈশিষ্ট্য।’
গত তিন বছরে চারবার কোচ বদলানো বার্সেলোনার যে এখন একজন ‘ভালো কোচ’ই দরকার!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন