লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ।
লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। ছবি: টুইটার

কি মাঠে কি বাইরে লিভারপুলের সময়টা মোটেও ভালো কাটছে না। আন্তর্জাতিক বিরতির আগে লিগে একের পর এক ম্যাচে পয়েন্ট খুইয়েছে ইয়ুর্গেন ক্লপের দল, শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগটাই যা এসেছে স্বস্তি হয়ে।

৩০ বছরের লিগ শিরোপার খরা ঘুচিয়ে গত মৌসুমে শিরোপা জিতলেও এই মৌসুমে ছন্নছাড়া লিভারপুল এখন লিগের পয়েন্ট তালিকায় আছে সাত নম্বরে। এর মধ্যে মাঠের বাইরে থেকেও এসেছে দুঃসংবাদ। করোনার কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাবের তালিকায় ওপরের দিকেই এসেছে লিভারপুলের নাম। প্রায় ১৪১ মিলিয়ন বা ১৪ কোটি ১০ লাখ ইউরোর ক্ষতি গুনেছে সালাহ, মানে ফন ডাইকদের ক্লাব।

চারদিকে এত দুঃসংবাদের মধ্যে কদিন আগে একটা সুসংবাদ মিলেছে লিভারপুলের, যা আবার বার্সেলোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের জন্য আসতে পারে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ হয়ে। নতুন করে প্রায় ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ইউরো বিনিয়োগ হয়েছে লিভারপুলে, বাংলাদেশের মুদ্রায় অঙ্কটা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মতো।

বিজ্ঞাপন

লিভারপুলে বিনিয়োগ এলে বার্সা-রিয়ালের কী, এমন প্রশ্ন যদি মনে এসে থাকে, সে ক্ষেত্রে উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে কয়েকটা নাম শুনিয়ে দেওয়া যাক। কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হরলান্ড, হুসাম আউয়ার, জেডন সাঞ্চো, পাওলো দিবালা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জ্যাক গ্রিলিশ...। ইউরোপে বড় বড় অনেক তারকাকে ঘিরেই দলবদলের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে এমবাপ্পে আর হরলান্ডকে ঘিরেই গুঞ্জনের জোর সবচেয়ে বেশি। আগ্রহের মাত্রাও। বার্সা, রিয়াল, লিভারপুল, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, জুভেন্টাস...কোন ক্লাব এ দুজনকে পেতে চায় না?

সেখানে লিভারপুলের হাতে হঠাৎ এভাবে ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা চলে আসা বার্সা-রিয়ালসহ হরলান্ড কিংবা এমবাপ্পেকে পেতে আগ্রহী সব ক্লাবের জন্যই হুমকির।
হঠাৎ লিভারপুলের এত টাকা পাওয়ার কারণ? বলতে গেলে লিভারপুলের এক পাঁড় ভক্তই লিভারপুলের জন্য এগিয়ে এসেছেন। বাস্কেটবলপ্রেমী পাঠকমাত্রই জানেন লিভারপুলের সেই ভক্তের নাম—লেব্রন জেমস। যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল লিগের এই সুপারস্টারের প্রতিষ্ঠান রেডবার্ড ক্যাপিটাল পার্টনারস ৬৩৮ মিলিয়ন বা ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরো দিয়ে লিভারপুলের মূল মালিক ‘ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ’-এর ১০ শতাংশ মালিকানা কিনে নিয়েছে।

‘আমাদের সমর্থকদের উদ্দেশে বলছি, শিরোপা জিতে যাওয়া সব সময়ই আমাদের একটা বড় চালিকা শক্তি ছিল। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এফএসজির এভাবে এগিয়ে চলা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদকে আরও শক্তিশালী করতে আর আমরা যে জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাচ্ছি, তাদের প্রতি আমাদের নিবেদন আরও বাড়াতে সাহায্য করবে। এফএসজির বিবর্তনের পরের ধাপে এই প্রতিভাবান নতুন সঙ্গীদের পাশে পেতে আমরা উন্মুখ’ রেডবার্ড ক্যাপিটাল পার্টনারসের বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া বিবৃতিতে লিখেছেন এফএসজির মূল মালিক জন ডব্লু হেনরি।

default-image

করোনার কারণে আর্থিক ক্ষতি, পাশাপাশি লিভারপুলের স্টেডিয়াম অ্যানফিল্ডের একটা পাশ ‘অ্যানফিল্ড রোড স্ট্যান্ড’–এর সংস্কার মিলিয়ে আর্থিকভাবে বেশ নাজুক পরিস্থিতিতে ছিল লিভারপুল। লেব্রন জেমসের প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ এই দুই দিক থেকেই ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপের (এফএসজি) কাজে আসবে। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই স্পোর্টস লিখেছে, অ্যানফিল্ড রোড স্ট্যান্ডের সংবর্ধনের পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় কেনায়ও এই অর্থ খরচ করা হবে।

লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ এ নিয়ে প্রশ্নে বলেছেন, ‘যতটুকু বুঝতে পারছি, এটার (নতুন বিনিয়োগ) মানে হচ্ছে আমরা এত দিন ধরে যা কিছু অর্জন করেছি, সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে এটা আমাদের সাহায্য করবে। ভালো সংবাদ এটা।’

ক্লপের জন্য তো ভালো সংবাদ হবেই! গত দুই মৌসুমে লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ এনে দিয়েছেন ক্লপ। কিন্তু এত এত শিরোপার বিপরীতে দলে নতুন খেলোয়াড় কেনার দিক থেকে লিভারপুলের কোনো ‘উন্নতি’ চোখে পড়েনি দুই মৌসুমে। এই মৌসুমে দিয়োগো জোতা, থিয়াগো আলকানতারার মতো প্রতিভাবানেরা এসেছেন। তবে তাঁদের জন্য অবশ্য বেশি খরচ করতে হয়নি লিভারপুলকে। গত কয়েক মৌসুমে দলবদলে কুশলী পদক্ষেপের বেশ সুনাম কুড়ানো লিভারপুলের ক্রীড়া পরিচালক মাইকেল এডওয়ার্ডস দলবদলের টাকা পরিশোধের এমন ব্যবস্থা করে রেখেছেন যে এই মৌসুমে সব মিলিয়ে দলবদলের পেছনে লিভারপুলের খরচ হয়েছে ১০-১৫ মিলিয়ন ইউরো!

বিজ্ঞাপন
default-image

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এত করেও দুর্ভাগ্যের কাছে হার মানতে হয়েছে। জোতা-থিয়াগো দুজনই চোটে লম্বা সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। চোটের নিরলস চোটপাট আর গত দুই মৌসুম ধরে সেভাবে খেলোয়াড় না কেনার কারণেই এই মৌসুমে লিভারপুলের এভাবে ভেঙে পড়ার পেছনে সেটিরও দায় আছে।

ভার্জিল ফন ডাইক, জো গোমেজ, জোয়েল মাতিপ—দলের মূল তিন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের তিনজনই প্রায় পুরো মৌসুমের জন্য ছিটকে গেছেন। অধিনায়ক ও মিডফিল্ডার (যিনি রক্ষণের চোটের কারণে সেন্টারব্যাক হিসেবেও খেলতে বাধ্য হয়েছেন বেশ কিছুদিন) জর্ডান হেন্ডারসন, রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ড, মিডফিল্ডার (হেন্ডারসনের পাশাপাশি তাঁকেও রক্ষণে খেলতে হয়েছে) ফাবিনিও, ফরোয়ার্ড সাদিও মানে, মিডফিল্ডার নাবি কেইতা, অ্যান্ডি রবার্টসনকে মাঝেমধ্যে বিশ্রাম দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানোর জন্য এই মৌসুমে আনা লেফটব্যাক কস্তাস সিমিকাস...চোট আর করোনায় বেশ কয়েক ম্যাচে না পাওয়া খেলোয়াড়ের তালিকাটা লম্বাই। এর সঙ্গে জোতা-থিয়াগোর চোট তো ছিলই!

সব মিলিয়ে মাঠে লিভারপুল বেশ হতশ্রী অবস্থায়। লিগে আজ শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আর্সেনালের মুখোমুখি হওয়ার আগে ২৯ ম্যাচে লিভারপুলের প্রাপ্তি ৪৬ পয়েন্ট। এই মুহূর্তে পয়েন্ট তালিকার চারে থাকা চেলসির চেয়ে ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে ক্লপের দল। সেরা চারে থেকে আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নিতে না পারলে বেশ বড় ধাক্কাই খাবে ক্লাবটা। সেটা খেলোয়াড়কে ক্লাবে টানার দিক থেকে যেমন, তেমনি আর্থিকভাবেও।

default-image

আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার আরেকটা রাস্তা অবশ্য আছে লিভারপুলের। এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা! তবে সেটি তো আর হাতের মোয়া নয়, বড় সব চ্যালেঞ্জ সে পথে লিভারপুলের অপেক্ষায়। এরই মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে লিভারপুল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ রেকর্ড ১৩ বারের চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী রিয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচে জিতলেও সেমিফাইনালে সালাহ-মানেদের অপেক্ষায় থাকবে চেলসি ও পোর্তোর মধ্যে জয়ী দল।

আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেললে এমবাপ্পে-হরলান্ডের মতো তারকাদের টানা সহজ হবে, এই হলো সুবিধা। এমন মানের খেলোয়াড়দের দলে টানার ক্ষেত্রে দরকারি অর্থ নিয়ে তো চিন্তা এখন কিছুটা কমেছে লিভারপুলের। ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আসছে না!

বার্সা-রিয়ালের জন্য হুমকি হয়ে আসার মতো খবরই বটে!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন