মেসির অবিশ্বাস্য মূল বিশ্বাস করছেন না অনেক পাঁড় বার্সা–ভক্তই।
মেসির অবিশ্বাস্য মূল বিশ্বাস করছেন না অনেক পাঁড় বার্সা–ভক্তই।ছবি: রয়টার্স

লিওনেল মেসিকে আজীবন ক্লাবে ধরে রাখতে চায় বার্সেলোনা। ২০১৭ সালে তাই তাঁর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করতে গিয়ে অনন্য কিছুর জন্ম দিয়েছে ক্লাবটি। মেসিকে চার বছরের চুক্তিতে ৫৫৫ মিলিয়ন ইউরো বা ৫ হাজার ৭০২ কোটি ৮১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বার্সেলোনা। ফুটবল তো বটেই, খেলাধুলার জগতেই এত বড় অঙ্কের চুক্তি কখনো হয়নি।

চুক্তির অনেক শর্ত পূরণ করা হয়নি মেসির। তাই পুরো অঙ্ক পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তাঁর। আর্থিক দুর্দশার মুখে পড়ে বার্সেলোনাও বেশ কিছু বকেয়া রেখেছে। তবু ফুটবলে শুধু ক্লাব থেকে মেসি যে আয় করেন, সেটা নেইমার বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্যও কল্পনাতীত। চুক্তিটা কাতালান ক্লাবের অনেক ভক্তের কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকছে। ক্লাবের অনেক সদস্যই প্রথমবারের মতো এই বেতন–ভাতার কথা শুনে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

কড়া প্রতিক্রিয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে জানুয়ারিতেই প্রকাশিত আরেকটি খবর। বার্সেলোনার বর্তমানে অন্যদের কাছে ১১৭ কোটি ৩০ লাখ ইউরো দেনা আছে। এ অবস্থায় মেসির বার্সেলোনা থেকে আয়ের অর্থ শুধু সাধারণ ভক্ত নন, ফুটবল–সংশ্লিষ্টদের জন্যও অবিশ্বাস্য ঠেকছে। কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগের মতো কিংবদন্তির নাকি বার্সার দেনার কথা শুনে রীতিমতো দম আটকে গিয়েছিল!

বর্তমানে ফুটবলারদের যে বেতন দেওয়া হয়, এ নিয়ে বরাবরই আপত্তি আছে বায়ার্ন মিউনিখের প্রধান নির্বাহীর। এই জার্মান কিংবদন্তি বাড়তি অর্থ দিয়ে ফুটবলারদের ধরে রাখায় বিশ্বাসী নন। বায়ার্নে সর্বোচ্চ বেতনভোগী ফুটবলার রবার্ট লেভানডফস্কি। গত বছর ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ বিজয়ী ফুটবলার বছরে ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি ইউরো পান। অন্য সবার বেতন এর অনেক কম। শুধু বেশি বেতন চাওয়ায় ডেভিড আলাবার মতো দুর্দান্ত এক ফুটবলারকে ছেড়ে দিচ্ছে বায়ার্ন।

default-image
বিজ্ঞাপন

নেইমার, রোনালদো কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের দলে টানার ব্যাপারে তাই যতবারই গুঞ্জন উঠেছে, বায়ার্নের প্রধান সঙ্গে সঙ্গে সে খবর উড়িয়ে দিয়েছেন। বরাবরই বলে এসেছেন, এই ফুটবলাররা যে বেতন পান, সেটা দেওয়া সম্ভব না বায়ার্নের পক্ষে। এত বেতন অন্য ক্লাব কীভাবে দেয়, সে প্রশ্নও তুলেছেন রুমেনিগে। এর মাঝেই মেসির বেতনের খবরটি চলে এসেছে। এল মুন্দোর প্রকাশিত খবর অনুযায়ী। প্রতি মৌসুমে শুধু বেতন ও ভাতা মিলিয়ে বার্সেলোনা থেকে ১৩৮ মিলিয়ন বা ১৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরো পাচ্ছেন মেসি। অঙ্কটা অবশ্য করপূর্ব। তবু অঙ্কটা মুন্দোর প্রকাশিত খবরের আগে অচিন্তনীয় ছিল।

শুধু মেসির বেতনই যে বার্সেলোনার দেনা বাড়িয়েছে তা নয়, ফিলিপ কুতিনিও, আঁতোয়ান গ্রিজমান, ওসমানে দেম্বেলে, মিরালেম পিয়ানিচ, ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ংয়ের মতো অনেক ফুটবলারকে চড়া মূল্যে ক্লাবে টেনেছে বার্সেলোনা। তাঁদের কেউ মেসির ধারেকাছে বেতন পান না। তবে যে বেতন পান, সেটিও বায়ার্ন মিউনিখের মতো ক্লাবে পাওয়ার কল্পনা করতে পারতেন না। বার্সেলোনার ১০০ কোটি ইউরোর বাজেটের ৭৪ ভাগই যায় ক্লাবের ফুটবলারদের বেতনের পেছনে। ফলে, এমন এক পরিস্থিতি দাড়িয়েছে যে ১১৭ কোটি ইউরো দেনার ৭২ কোটিই স্বল্পমেয়াদি। অর্থাৎ ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই এটা দিয়ে দিতে হবে। চাইলে কথা বলে সময় বাড়িয়ে নেওয়া যাবে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন খেলোয়াড়েরা বেতন পরে নিতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু দেনার দায় তো আর মিটে যাচ্ছে না। করোনার এ সময়টায় আয় যেখানে প্রতিনিয়ত কমছে, সেখানে ১১৭ কোটি ইউরোর বেশি দেনা কীভাবে শোধ করবে বার্সেলোনা?

ক্লাবকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী রাখায় বরাবর মনোযোগ রুমেনিগের। তাই বার্সেলোনার এমন দুর্দশার কথা শুনে চমকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক তাঁর। খবরটি পড়ে তাঁর গলায় নাকি খাবার আটকে যেতে বসেছিল, ‘বার্সেলোনার দেনার খবর যখন পড়ছিলাম, তখন নাশতা করছিলাম। আরেকটুর জন্য দম আটকে যাচ্ছিল। বায়ার্ন মিউনিখ এত দেনার মধ্যে থাকলে আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম না।’ বার্সেলোনাও অবশ্য পারছে না। না হলে কি আপৎকালীন সভাপতি কার্লেস তুসকেতস কদিন আগে বলে বসতেন, মেসিকে ছেড়ে দিলেই ভালো করত তাঁর ক্লাব।

default-image

তুসকেতস এটাও জানিয়েছেন, খেলোয়াড়েরা বেতন কমাতে রাজি না হলে বা আপাতত বেতন স্থগিত করতে রাজি না হলে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বার্সেলোনা। এর আগে করনার সময়ও মেসিরা নিজেদের বেতনের ৭০ ভাগ কমিয়েছিলেন। নতুন বছরেও ক্লাবের জন্য আত্মবিসর্জন করেছেন বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরা। রুমিনেগের ধারণা, খেলোয়াড়েরা বেতন নিলেও বার্সেলোনা দেউনলিয়া হতো, এটা বিশ্বাস হয় না তাঁর, ‘আমার মনে হয় না কিছু ঘটবে। বার্সেলোনার মতো ক্লাব কখনো শেষ হবে না। কাতালুনিয়ার মতো একটি অঞ্চলে ওরা যে গুরুত্ব বহন করে, সে কারণেই এটা হবে না। যা–ই হোক, কোনো ক্লাবের এভাবে দেনাগ্রস্ত হওয়াটা আমাকে দুঃখ দেয়।’

করোনাকালে অনেক ক্লাবই আর্থিক দুর্দশার মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময়টাও বায়ার্ন ছিল অন্য রকম উজ্জ্বল। নিজেরা এই কঠিন সময় সাফল্যের মধ্য দিয়েই শুধু পার করেনি, লিগের অন্য ক্লাবগুলোকেও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছে, যেন তারা দেউলিয়া না হয়। এ কারণেই দম্ভ নিয়েই রুমিনেগে বার্সেলোনার মতো দুর্দশায় পড়া ক্লাবগুলোকে উপদেশ দিতে পারছেন, ‘বায়ার্ন মিউনিখ এসব ক্ষেত্রে সবার আদর্শ এবং তাই থাকব। বার্সেলোনা বা ইতালিতে যা হচ্ছে, সেটি যদি হিসাবে আনেন, যেখানে খেলোয়ারদের এখন বেতনই দেওয়া হচ্ছে না। এখানে আমরা খেলার সাফল্য চাই। অন্যদিকে, আর্থিক সাফল্যও নিশ্চিত করি।’

বার্সেলোনার আর্থিক দুর্দশা অবশ্য বায়ার্নের জন্য একটু চিন্তার কারণ। গত কয়েক বছরে বার্সেলোনা যত দলবদল করেছে, সেগুলোর অধিকাংশেরই পুরো অর্থ দেওয়া হয়নি। কুতিনিওর ক্ষেত্রে লিভারপুল এখনো ৪ কোটি পায়। ডি ইয়ংয়ের জন্য ৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো পায় আয়াক্স। পিয়ানিচের জন্য জুভেন্টাসের পাওনা ৫ কোটি ২০ লাখ ইউরো। এরা তবু ক্লাবে আছেন। এরই মধ্যে ক্লাব ছেড়ে দেওয়া আর্থুর মেলোর দলবদলের ৮০ লাখ ইউরোই এখনো দেওয়া হয়নি বার্সার। এক মৌসুমের জন্য ক্লাবে আসা ম্যালকমের জন্য ১ কোটি ১ লাখ ইউরো বকেরা রয়েছে ক্লাবের। এই গ্রহীতার তালিকায় আছে বায়ার্নও। ২০১৮ সালে দলে এসে আর্তুরো ভিদাল এবার ক্লাব ছেড়ে চলে গেছেন। সেই দলবদলের অর্থ এখনো পুরোটা বুঝে পায়নি বায়ার্ন মিউনিখ!

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন