বার্সেলোনায় ‘সার্জেন্ট কোম্যানে’র ১০ চ্যালেঞ্জ

বার্সেলোনার অলি-গলি ভালোভাবেই চেনা নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের।
বার্সেলোনার অলি-গলি ভালোভাবেই চেনা নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের।ছবি: ইএসপিএন
বিজ্ঞাপন
বার্সেলোনার পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কোম্যানকে আগামী দিনগুলোতে আরও বড় অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বার্সেলোনা ভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক স্পোর্ত সে রকমই কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছে-

যেকোনো ক্লাবেই নতুন কোচ এলে একটা পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। নতুন দর্শন, নতুন পরিকল্পনা, অনুশীলনের নতুন প্রক্রিয়া, স্কোয়াডে রদবদল—সবকিছুর জন্যই তৈরি থাকতে হয় খেলোয়াড়দের। কেউ সহজেই পারেন, কারও জন্য কঠিন হয়ে যায় কিছু ব্যাপার। চ্যালেঞ্জটা কোচের জন্যও খুব একটা সহজ নয়। বিশেষ করে, বড় ক্লাবগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনতে গেলে কোচকেও ভাবতে হয় অনেক কিছু। ঝুঁকি নিতে হয়। আর চাকরি যাওয়ার ভয়? সে তো ফুটবল কোচদের জীবনেরই অংশ।

default-image


বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চ্যালেঞ্জটা এসে পড়েছে রোনাল্ড কোম্যানের কাঁধে। খুব বুঝে শুনেই দায়িত্বটা নিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই। এ রকম একটা ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়া কী বিশাল চাপের সেটা তিনি ভালোই জানেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই লিওনেল মেসি-বার্সেলোনার লড়াইয়ে সেটা কিছুটা টেরও পেয়েছেন।
তবে কোম্যান শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই দারুণ ছিলেন না, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও প্রবল শক্তিশালী। ইয়োহান ক্রুইফের অধীনে বার্সেলোনার বিখ্যাত সেই ড্রিম টিমে খেলেছেন। বেশ বৈচিত্র্যময় খেলোয়াড় ছিলেন, মাঠের বিভিন্ন জায়গায় খেলতে পারতেন। খেলোয়াড় হিসেবে বার্সেলোনার হয়ে টানা চারটি লা লিগা জিতেছেন (১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত), তাঁর গোলেই ১৯৯২ সালে বার্সেলোনা প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরা হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নেদারল্যান্ডস দলে কোম্যান খেলেছেন মার্কো ফন বাস্তেন, রুদ খুলিত, ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড, ডেনিস বার্গক্যাম্পদের সঙ্গে। আবার লুই ফন গালের অধীনে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কাজ করেন বার্সেলোনার সহকারী কোচ হিসেবেও। তার মানে বার্সেলোনার ইতিহাস-ঐতিহ্য, এই ক্লাবের দর্শন থেকে শুরু করে এর সব অলি-গলিই চেনা কোম্যানের। পুনর্গঠনের কথা যদি সত্যিই ভেবে থাকে বার্সেলোনা পরিচালনা পর্ষদ, সেটার জন্য এই মুহূর্তে আসলে কোম্যানের চেয়ে যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
কোম্যানও এরই মধ্যে ক্লাবে তাঁর অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কা লিখেছে, কঠিন ব্যক্তিত্বের জন্য ড্রেসিং রুমে খেলোয়াড়েরা তাঁকে ‘সার্জেন্ট কোম্যান’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। তাঁর কথা, অনুশীলন সাড়ে নয়টা মানে ঠিক সাড়ে নয়টা। এক মিনিট দেরি মেনে নেবেন না। আগের বার্সেলোনায় সাধারণ এই অনুশীলন সেশনগুলো হতো এক ঘণ্টার, সেটা কোম্যান আসার পর দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে। বেড়েছে অনুশীলনের তীব্রতাও।
তবে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কোম্যানকে আগামী দিনগুলোতে আরও বড় অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বার্সেলোনা ভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক স্পোর্ত সে রকমই কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছে—

কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া

যে কোচ দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পরেই লুইস সুয়ারেজ, আর্তুরো ভিদাল, রাকিতিচের মতো খেলোয়াড়দের বলে দিতে পারেন যে, তোমরা আমার পরিকল্পনায় নেই, তাঁর জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এত কঠিন মনে হচ্ছে না আপাতত। কোম্যানের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, তিনি শিখেছেন একেবারে সেরা একজনের কাছ থেকে—ইয়োহান ক্রুইফ। তবে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক রাখার কাজটাও ক্রুইফ ভালোই পারতেন। কোম্যানেরও যদি সেই গুন থেকে থাকে, তাহলে বার্সেলোনার জন্যই ভালো।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফিটনেস সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফেরানো

দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্যান বার্সেলোনার প্রধান যে কয়টি সমস্যা শনাক্ত করেছেন, তার একটি হচ্ছে, খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফিটনেস না থাকা। গত কয়েক বছরে এটা ভালোভাবেই দেখা গেছে। রোমা, লিভারপুল, বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে বার্সেলোনার আলোচিত হারগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে, ওরা শারীরিকভাবে শতভাগ দিতে পারেননি। এ জন্য এরই মধ্যে নতুন ফিটনেস কোচ হিসেবে আলবার্ট রোকাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গেছেন কোম্যানের এক সময়ের সতীর্থ ও বার্সেলোনার সাবেক কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড।

default-image

ডেড বলে দক্ষতা বাড়ানো

সেট পিচের গুরুত্ব এবং সেখান থেকে কীভাবে গোল করতে বা করাতে হয়, এ সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়ার জন্য কোম্যানের চেয়ে ভালো কোচ আর খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কাইজারস্লটার্নের বিপক্ষে ১৯৯১ সালের ইউরোপিয়ান কাপে কোম্যানের ফ্রি কিক থেকে বাকেরোর সেই বিখ্যাত গোল বা ওয়েম্বলিতে সাম্পদোরিয়ার বিপক্ষে কোম্যানের সেই ফ্রি-কিক বার্সেলোনার ইতিহাসের অংশ। কোনো সন্দেহ নেই, বার্সেলোনার কোচ হিসেবে এ দিকটায় খুবই গুরুত্ব দেবেন কোম্যান।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাই প্রেসিং ফুটবল

বার্সেলোনার খেলার একটা বিশেষ দিক ছিল প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা অবস্থায় হাই প্রেসিং। পেপ গার্দিওলার সময়ে এবং লুইস এনরিকের অধীনে প্রথম মৌসুমে এটা খুবই কার্যকর ছিল। কোম্যান শনাক্ত করেছেন যে, এই জায়গায় বার্সেলোনা এখন বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। বল পায়ে না থাকলে কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটা যেন ভুলেই গেছে বার্সেলোনা। অনুশীলনে এরই মধ্যে এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন কোম্যান।

default-image

একাডেমি থেকে খেলোয়াড় বের করা

আগে যেখানেই কোচিং করিয়েছেন, তারুণ্যে আস্থা রেখেছেন কোম্যান। তবে তিনি যেটা করেন না, সেটা হচ্ছে, পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগে কোনো খেলোয়াড়কে মূল দলে নিয়ে আসা। ভ্যালেন্সিয়ায় তিনি এভাবেই সুযোগ দিয়েছেন হুয়ান মাতাকে। বার্সেলোনায় কোম্যান সবার আগে মূল দলে নিয়মিত করতে পারেন একাডেমির দুই খেলোয়াড় আনসু ফাতি ও রিকি পুচকে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঐক্যবদ্ধ ড্রেসিং রুম

ড্রেসিং রুমে অনেক কিছুই ঘটে। তার সব যদি বাইরে আসে, সেটা যে খেলোয়াড়দের মনযোগ খেলা থেকে সরিয়ে দিতে পারে, সেটাও কোম্যানের অজানা নয়। সে কারণেই নতুন বার্সেলোনা কোচের লক্ষ্য থাকবে একটা ঐক্যবদ্ধ ড্রেসিং রুম তৈরি করা, যাতে বিতর্ক কম হয়। যেকোনো ক্লাবেরই সাফল্যের একটা প্রধান সূত্র হচ্ছে, খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও আন্তরিকতা থাকা। কোম্যান সেটা গড়ে তুলতে সব চেষ্টাই করবেন।

পেশাদারি বাড়ানো

এই পর্যায়ের খেলোয়াড়েরা এমনিতেই যথেষ্ট পেশাদার থাকেন। কোম্যান নিজেও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পেশাদারি আচরণ নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক। আবার তিনি এটাও জানেন, তাঁর খেলোয়াড়ি সময় থেকে এখনকার সময়টা অনেক আলাদা। এখন খেলোয়াড়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সক্রিয়। তবে সব জায়গায় যাতে সব সময় ক্লাবকে ভালোভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেটার দিকে চোখ রাখবেন বার্সেলোনা কোচ।

default-image

খেলার ধরন ও গতি

সাম্প্রতিক সময়ে বার্সেলোনাকে যেভাবে খেলতে দেখা গেছে, সেটা হয়তো শুরুতেই আমূল বদলে ফেলবেন না কোম্যান। তবে তিনি চান বার্সেলোনা বল পায়ে আরও দাপটের সঙ্গে খেলুক। ফরোয়ার্ডদের তিনি আরও উন্মুক্ত খেলাতে চান, আক্রমণে জোর বাড়াতে চান। ডি ইয়ং আর বুস্কেটসই হয়তো আগের মধ্যে খেলা গড়ে দেওয়ার কাজটা করবেন, তবে গতি আরও বাড়ানোর দিকে নজর দেবেন কোম্যান। তিনি গতিময় দল চান। সে জন্য খেলোয়াড়দের কিছুটা ঝুঁকি নিতেও দিতে চান কোম্যান।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আত্মবিশ্বাস বাড়ানো

ডি ইয়ং, ডেম্বেলে, কুতিনিয়ো, সেমেদো, গ্রিজমানদের কাছে গত কয়েক বছরে যা প্রত্যাশা ছিল সেটা তারা খুব কমই পূরণ করতে পেরেছেন। কোম্যান চাইছেন, এরা সবাই এবং আনসু ফাতিও যাতে নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে একেকজন একেকটা শক্ত চরিত্র হয়ে ওঠেন। তারা বার্সেলোনায় খেলছেন মানে আগের ক্লাবে ভালো খেলে এসেছেন। নিজেদের তারা যতটা ভালো মনে করেন, তারা যে এর চেয়েও ভালো, সেই বিশ্বাস কোম্যান ছড়িয়ে দিতে চান দলে।

default-image

এবং লিওনেল মেসি

একজন লিওনেল মেসি দলে থাকা মানে কোচের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া। শুরুতে দুজনকে নিয়ে যে গুঞ্জনই থাকুক, স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম বলছে, মেসি বার্সেলোনায় থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কোম্যানের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতা বেশ আন্তরিক ছিল। মেসি জানেন, কোম্যান বার্সেলোনার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ক্লাবে তাঁর ভূমিকা কী। কোম্যানও জানেন, মেসির গুরুত্ব। মেসির কাছে তাঁর চাওয়া একটাই— মাঠে ব্যবধান গড়ে দেওয়া এবং নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করা। আর কোনো কোচের সঙ্গে যদি মেসির সম্পর্কটা হৃদ্যতাপূর্ণ থাকে, তাহলে সেই কোচের অধীনে মাঠেও যে এক অন্যরকম মেসিকে দেখা যায়, সেটার প্রমাণ খুঁজতে একটু পিছিয়ে পেপ গার্দিওলা যুগে ফিরে গেলেই হয়। কোনো সন্দেহ নেই, বার্সেলোনার সাফল্য অনেকটা নির্ভর করছে কোম্যান-মেসির এই রসায়নের ওপর, অন্তত আরও এক বছর তো বটেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন