চমকে দিয়ে ইউরোপ জয়

বেলগ্রেডের চমক এবং 'স্পেশাল ওয়ান' মরিনহোর উত্থান

বিজ্ঞাপন
default-image
>ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বড় ট্রফি চ্যাম্পিয়নস লিগ। তবে বড় ট্রফি বলে যে সব সময় বড় ক্লাবগুলোই এটা জিতেছে, তা কিন্তু নয়। বেশ কয়েকবার ‘পুঁচকে’ অনেক ক্লাবই সবাইকে চমকে দিয়ে হয়ে গেছে ইউরোপসেরা

করোনা বিরতি শেষে কয়েক দিন পরেই আবার মাঠে গড়াবে চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউট পর্বের বাকি খেলাগুলো। বায়ার্ন মিউনিখ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কিংবা পিএসজির মতো বড় ক্লাব তো বটেই, ইউরোপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত টিকে আছে আতালান্তা, নাপোলি, অলিম্পিক লিওঁ ও লাইপজিগের মতো সাদা চোখে হিসেবের বাইরে থাকা ক্লাবগুলোও।

তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাস বলছে, এখানে কোনো ক্লাবকেই হিসেবের বাইরে রাখার উপায় নেই, বিশেষ করে নকআউট পর্বে তো নয়ই। বিভিন্ন সময় সবাইকে চমকে দিয়ে ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে যাওয়া কিছু ক্লাবের গল্প নিয়ে এই ধারাবাহিক। আজ শেষ পর্ব—

১৯৯০-৯১ ইউরোপিয়ান কাপ
চ্যাম্পিয়ন : রেড স্টার বেলগ্রেড

‘আমাদের খবর আছে!’

১৯৯০-৯১ ইউরোপিয়ান কাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি স্কটিশ ক্লাব রেঞ্জার্স ও সার্বিয়ার ক্লাব রেড স্টার বেলগ্রেড। প্রতিপক্ষ কেমন খেলে, তা জানতে সহকারী ওয়াল্টার স্মিথকে খানিক ‘গোয়েন্দাগিরি’ করতে পাঠিয়েছিলেন কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও রেঞ্জার্সের ম্যানেজার গ্রায়েম স্যুনেস। সব দেখে-টেখে এসে ওই তিন শব্দের রায় দিয়েছিলেন স্মিথ।

খুব বেশি ভুল বলেননি স্মিথ। দুই লেগ মিলিয়ে ৪-১ গোলে হেরে ছিটকে পড়ে রেঞ্জার্স। ক্ষুরধার প্রতি আক্রমণ, কার্যকরী প্রেসিং ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবলশৈলীর পসরা সাজিয়ে রেড স্টার চলে যায় পরের রাউন্ডে।

আধুনিক ফুটবল দলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, কখন আক্রমণাত্মক খেলতে হবে, কখনই বা রক্ষণাত্মক খেলতে হবে, সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা। নিজেদের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা সম্পর্কে সবার চেয়ে বেশি সচেতন থাকা। নব্বইয়ের দশকের এই রেড স্টার দলটারও এই গুণ ছিল। একঝাঁক তরুণ তারকা নিয়ে লুবোমির পেত্রোভিচ এই গুণসম্পন্ন দল বানিয়েছিলেন। যে দলটা সবাইকে চমকে জিতে নেয় ইউরোপিয়ান কাপ।

ফাইনালের পথে স্কটল্যান্ডের রেঞ্জার্স ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের গ্রাসহপার, পূর্ব জার্মানির ডায়নামো ড্রেসডেন, পশ্চিম জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হয়েছিল সার্বিয়ার ক্লাবটা। দলে ছিলেন সিনিসা মিহায়লোভিচ, মিওদ্রাগ বেলোদেদিচি, রবার্ট প্রসিনেস্কি, দেয়ান সাভিসেভিচ, দারকো পানচেভের মতো ভবিষ্যৎ তারকারা। জয়ের রেসিপি সব ম্যাচের মোটামুটি এক ছিল। বলের দখল রেখে মনভোলানো ফুটবল খেলো, মাঝমাঠেই কার্যকর প্রেস করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নাও। সুযোগ বুঝে দ্রুতগতির প্রতি আক্রমণে উঠে যাও। মাঝমাঠ থেকে প্রসিনেস্কির খেলা নিয়ন্ত্রণ করার নিখুঁত ক্ষমতার সঙ্গে আক্রমণভাগে সাভিসেভিচ-পানচেভের অব্যর্থ জুটি, আরও ছিল সিনিসা মিহায়লোভিচের গোলার মতো এক বাম পা। ফ্রি-কিক পেলে চিন্তা করতে হতো না রেড স্টারকে। ওপরে সাভিসেভিচ ছিলেন আদর্শ সহকারী স্ট্রাইকার, আর পানচেভের ভূমিকা ছিল নিখুঁতভাবে ‘ফিনিশ’ করার। ‘কোবরা’ ডাকনাম তো এমনি এমনি হয়নি!

এত কিছুর পরেও কোচ পেত্রোভিচ জানতেন, দলটা তরুণ। বড় ম্যাচ খেলার চাপ নিয়মিতভাবে নেওয়ার পরিপক্বতা এখনো আসেনি। প্রায় সবার বয়সই একুশ থেকে তেইশের মধ্যে।

ওদিকে ফাইনালে প্রতিপক্ষ অলিম্পিক মার্শেই। বিংশ শতাব্দীতে রিয়াল মাদ্রিদ যে ‘গ্যালাকটিকোস’ পন্থা অবলম্বন করেছিল, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নামকরা খেলোয়াড় দলে ভেড়ানোর, নব্বইয়ের শুরু দিকে ওই কাজ করেছিল মার্শেইও। ফলে দলটায় জমায়েত হয়েছিলেন ক্রিস ওয়াডল, জ্যাঁ-পিয়েরে পাপিন, জ্যাঁ টিগানা, আবেদি পেলে, দ্রাগান স্টয়কোভিচের মতো তারকারা।

পেত্রোভিচ জানতেন, তারায় ঠাসা মার্শেইয়ের বিপক্ষে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালের মতো আসরে তাঁর ছেলেরা পথ হারাতেই পারেন। তাই রেড স্টার কোচ বেছে নিলেন সাবধানী পথ। ছয় দিন আগেই ম্যাচের ভেন্যু ইতালির বারি তে এসে দলকে হোটেলে তুললেন। তখন করোনাভাইরাস ছিল না, তাও রেড স্টার এক রকম ‘কোয়ারেন্টিন’ এর মধ্যেই থাকল ওই ছয় দিন। স্ত্রী-বান্ধবী, কারওর সঙ্গেই দেখা করা যাবে না। ফোন ব্যবহার করা যাবে না। খেলার দিকেই থাকতে হবে পূর্ণ মনোযোগ। অদৃশ্য এক কারফিউই যেন জারি করলেন কড়া হেডমাস্টারের রূপ ধরা পেত্রোভিচ।

দলকে নিয়ে পরিকল্পনায় বসলেন। ভেবে দেখলেন, কোনোভাবেই প্রতি আক্রমণে যাওয়া যাবে না। কারণ প্রতি আক্রমণে উঠে গেলে নিজেদের ‘আক্রান্ত’ হওয়ার একটা সম্ভাবনাও থেকে যায়। সে ঝুঁকিটুকু নিতে রাজি হলেন না পেত্রোভিচ। মাঝমাঠে পায়ে বল আসলে দরকার হলে প্রতিপক্ষের পায়ে আবারও বল দিয়ে দাও, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতি আক্রমণের শিকার না হতে হয়। এমন ‘নেতিবাচক’ কৌশলে খেলেই মূল ম্যাচের নব্বই মিনিট আর অতিরিক্ত ৩০ মিনিট পার করল রেড স্টার বেলগ্রেড। রেড স্টারের গোলমুখে দশবার শট নিয়েও গোল করতে পারল না মার্শেই। ওদিকে রেড স্টার শট নিয়েছিল মোটে চারটা। 

default-image

শেষমেশ পেনাল্টি শুটআউটে রেড স্টারের অধিনায়ক গোলরক্ষক স্টেফান স্টয়ানোভিচ মার্শেইর রাইট উইংব্যাক ম্যানুয়েল আমোরোসের শট আটকে নায়ক বনে যান। সবাইকে চমকে দিয়ে রেড স্টারও পরে ইউরোপসেরার মুকুট।

২০০৩-০৪ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
চ্যাম্পিয়ন : এফসি পোর্তো

টানা দুই মৌসুম পোর্তোকে নিয়ে লিগ ও একবার উয়েফা কাপ জিতলেও, হোসে মরিনহোর ‘স্পেশাল ওয়ান’ হওয়ার যাত্রাটা গতি পায় এই চ্যাম্পিয়নস লিগে এসে।

সেবার দলে আসলেন মিডফিল্ডার পেদ্রো মেন্দেস, সেল্টা ভিগো থেকে যোগ দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকান স্ট্রাইকার বেনি ম্যাকার্থি। রাইটব্যাকে পাওলো ফেরেইরার সঙ্গে অদল-বদল করে খেলানোর জন্য বোয়াভিস্তা থেকে আনা হলো তরুণ হোসে বসিংওয়াকে। ফ্লুমিনেন্স থেকে ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার কার্লোস আলবার্তোকে আনা হলো। আগের দলটার সঙ্গে মোটামুটি এই একটু-আধটু যোগ বিয়োগ করেই মরিনহো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের জন্য গড়ে তোলা শুরু করলেন পোর্তোকে।

চ্যাম্পিয়নস লিগে পোর্তোর গ্রুপে পড়ল রিয়াল মাদ্রিদ, মার্শেই ও পার্টিজান বেলগ্রেড। পুরো গ্রুপপর্বে শুধুমাত্র রোনালদো-ফিগো-জিদান-কার্লোসদের রিয়াল মাদ্রিদের কাছে একটিমাত্র ম্যাচ হেরেছিল মরিনহোর দল। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সামনে পড়ল পোর্তো। সবাই ভাবল, মরিনহো কেরদানি বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু মরিনহো তো হারার পাত্র নন!

পোর্তোর এস্তাদিও দ্রাগাওতে কুইন্টন ফরচুনের গোলে পিছিয়ে পড়ে পরে বেনি ম্যাকার্থির দুই গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে পোর্তো। ওল্ড ট্রাফোর্ডের দ্বিতীয় লেগে পল স্কোলস গোল করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে এগিয়ে দিলেন, অর্থাৎ পোর্তো আর গোল না করতে পারলে অ্যাওয়ে গোলের নিয়মে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাবে ইউনাইটেড। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই বেনি ম্যাকার্থির ফ্রি কিক থেকে গোল করে পাশার দান পালটে দিলেন কস্টিনহা। ফলাফল-কোয়ার্টারে পোর্তো!

কোয়ার্টার ফাইনালে লিওঁকে হারানোর জন্য আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি পোর্তোকে, দুই লেগ মিলিয়ে ৪-২ গোলের ব্যবধানে জিতে সেমিতে স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো না করুনিয়ার মুখোমুখি হয় তাঁরা। দুই লেগ মিলিয়ে রক্ষণাত্মক ফুটবলের এক অনন্য পসরা সাজিয়ে ১-০ গোলে জিতে ফাইনালে ওঠেন মরিনহো-শিষ্যরা। এবারের প্রতিপক্ষ মোনাকো।

ফাইনালে দিদিয়ের দেশমের মোনাকোতেও কিন্তু তারকা প্লেয়ারের অভাব ছিল না। লেফটব্যাকে ছিলেন প্যাট্রিস এভরা, উইঙ্গার হিসেবে লুডোভিক গিলি ও স্ট্রাইকার হিসেবে ছিলেন স্প্যানিশ তারকা ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস। ছিলেন তরুণ ইম্যানুয়েল আদেবায়োর ও ক্রোয়েশিয়ার দাদা প্রসো। এদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা অলিম্পিক লিওঁর মতো দলকে হারিয়ে পোর্তো ফাইনালে উঠলেও মোনাকো রিয়াল মাদ্রিদ ও চেলসির মতো পরাশক্তিকে হটিয়ে উঠে এসেছিল ফাইনালে।

default-image

মোনাকোর আক্রমণ মূলত গঠিত হতো অধিনায়ক লুডোভিক গিলিকে ঘিরে, দুর্ভাগ্যবশত ইনজুরির জন্য মাত্র ২০ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। ফলে মোনাকোও তাঁদের বহুল চর্চিত ৪-৩-৩ ছক থেকে সরে এসে ৪-৪-২ ছকে খেলা শুরু করে। এবং এখানেই সুযোগটা পেয়ে যান মরিনহো। ৪-৩-২-১ ছকে খেলানো মরিনহো তখন মিডফিল্ডে একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় পেয়ে যান। ফলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের লড়াইয়ে পোর্তোর সঙ্গে পেরে উঠল না মোনাকো। চারজন ডিফেন্ডারের সঙ্গে তিনজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মিলে পোর্তো যেন একরকম রক্ষণাত্মক দেয়াল গঠন করল, যেটা লুডোভিক গিলি বিহীন মোনাকোর ভাঙার সাধ্য ছিল না। আর বাকি তিনজন (ডেকো, দার্লেই ও কার্লোস আলবার্তো কিংবা আলিনিচেভ) মাঝে মাঝেই প্রতি আক্রমণে উঠে যাচ্ছিলেন, পোর্তোর শেষ দুটো গোলও এসেছে দুর্দান্ত দুটো প্রতি-আক্রমণ থেকে।

পোর্তোর অপ্রত্যাশিত সেই ইউরোপ-সাফল্যে সবচেয়ে বড় লাভবান হয়েছিল ফুটবল। পেয়েছিল হোসে মরিনহোর মতো প্রজ্ঞাবান এক কোচকে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন