ব্রাজিলের আক্রমণের দুর্বলতা টের পাওয়া গেছে আজ।
ব্রাজিলের আক্রমণের দুর্বলতা টের পাওয়া গেছে আজ। ছবি: এএফপি

বছরখানেক আগের কথা। নিজেদের মাটি বাহিয়ার ফন্তে নোভায় কোপা আমেরিকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে নেমেছিল ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে। রাফায়েল দুদামেলের দল সেবার তিতের দলকে আটকে দিল গোলশূন্য ড্রয়ে। বোঝা গেল, ভেনেজুয়েলা শুধু শুধু কারোর সহজ পয়েন্ট পাওয়ার উপলক্ষ হিসেবে খেলতে আসেনি কোপায়। বেশ হোমওয়ার্ক করেই নেমেছে তাঁরা। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে দলটা প্রশংসাও কুড়িয়েছিল সেবার।

এক বছর পর আবারও মুখোমুখি ব্রাজিল ভেনেজুয়েলা। আবারও ম্যাচের ভেন্যু ব্রাজিলের মাঠ, সাও পাওলো। ডাগআউটে অবশ্য দুদামেল নেই আর, আছেন জোসে পেসেইরো। গত ম্যাচের মতো ভেনেজুয়েলা ব্রাজিলকে আটকাতে পারেনি এবার, হেরে বসেছে ১-০ গোলে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার মতো ‘পুঁচকে’ দল, যারা কখনো বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি, এমন দলের বিপক্ষে দুই ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র এক গোল—ব্রাজিলের জন্য গর্ব করার বিষয় না মোটেও। কিন্তু ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল দলের সঙ্গে ব্রাজিলের গোল করতে সমস্যা হচ্ছে কেন? এমন কী পরিকল্পনা নিয়ে নামছে ভেনেজুয়েলা যে পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়ে সেলেসাওরা গোলবন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারছে না তাদের?

বিজ্ঞাপন
default-image

ভেনেজুয়েলা ব্রাজিলের খেলায় এমন এক দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে, যে দুর্বলতা নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে ব্রাজিলকে আটকানো যায়। এটা শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, যেকোনো দল যদি ব্রাজিলের বিপক্ষে এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কৌশলের প্রয়োগ করে, ব্রাজিল আটকে যেতে পারে। ব্রাজিলের কোচ হিসেবে তিতে বেশ কয়েক বছর ধরেই আছেন। তিতের অধীনে ব্রাজিল দেখিয়েছে, প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণ করতে চায় আর সে সুবাদে রক্ষণ একটু আলগা হয়ে যায়, তখনই দুর্দান্ত খেলতে পারে ব্রাজিল। কার্যকরী প্রতি–আক্রমণনির্ভর খেলা দেখানোয় এই ব্রাজিলের জুড়ি নেই। কিন্তু প্রতিপক্ষের যদি একদমই আক্রমণ করার ইচ্ছা না থাকে? যদি নিজেদের অর্ধেই চুপটি করে বসে থেকে নেইমার-কুতিনিও-ফিরমিনোদের আক্রমণ আটকানোতেই খুশি থাকে? তখনই ঝামেলায় পড়ে যায় ব্রাজিল। এটা বেশ কয়েকবারই দেখা গিয়েছে। সব শেষ দেখা গেল আজ সকালে।

আজকে ভেনেজুয়েলার ছকটাই দেখুন। কাগজে–কলমে মনে হবে, কী আক্রমণাত্মকই না খেলতে নেমেছে তাঁরা, ৪-৩-৩ ছকে। আসলে কিন্তু তা নয়। কাগজে-কলমে ৪-৩-৩ ছকটা মাঠে ৪-৫-১ হয়ে গিয়েছিল। একসময় ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল ইউনাইটেডে খেলা দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার সলোমন রনদন ছাড়া মোটামুটি সবাই-ই নিজেদের অর্ধে থাকতেই বেশি পছন্দ করেছেন। আর ভেনেজুয়েলার ‘বজ্র আঁটুনি’ ভাঙতে গত বছরের মতো এই বছরও হাঁসফাঁস করতে হয়েছে তিতের দলকে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, জমাট রক্ষণ ভাঙার কোনো উপায়ই কী নেই? বিশ্ব ফুটবলের সফলতম দল, যারা ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের পূজারি, যারা বছরের পর বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবেই প্রতিভাবান ফুটবলার দিয়ে আসছে বিশ্বকে—জমাট রক্ষণ ভাঙার উপায় সবচেয়ে বেশি তো তাদেরই জানার কথা। তাহলে পারছে না কেন ব্রাজিল?

উত্তর জানতে হলে আগে জানতে হবে, কী করলে এমন জমাট রক্ষণ ভাঙে। সাধারণত ব্যক্তিগত নৈপুণ্য কিংবা দলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছোট ছোট পাসের ত্রিভুজাকার বা চতুর্ভুজাকার ক্ষেত্র রচনা করতে হবে, কারণ, পজিশন নির্দিষ্ট থাকা যাবে না। তাহলেই খেই হারিয়ে ফেলবে ৪-৫-১ ছকের জমাট বাঁধা রক্ষণ। ভেনেজুয়েলার ভাগ্য ভালো, এই দুই ম্যাচের কোনোটাতেই নেইমার ছিলেন না। থাকলে যে ব্রাজিল এমনটা করতে পারত না, সেটা বলা যাচ্ছে না মোটেও।

default-image
বিজ্ঞাপন

আজ সকালে অবশ্য শুধু নেইমার নন, কুতিনিও-ও ছিলেন না। বল পায়ে কারিকুরি দেখানোর দিক দিয়ে এই দুজনই ব্রাজিল দলে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। তাই বলে এভারতন সোয়ারেস, এভারতন রিবেইরো, রিচার্লসন, ভিনিসিয়ুসরা যে কারিকুরি দেখাতে পারেন না, তা নয়। তবে সেগুলো নেইমার বা কুতিনিওর মতো অত কার্যকরী হয় না, নেইমার না থাকলে তাঁদের মধ্যে রসায়নটা ঠিক জমে না, যার মাধ্যমে ত্রিভুজাকার পাসগুলো জোড়া লাগানো যায়, আক্রমণ করা যায়। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের ফর্মহীনতারও দায় আছে। গ্যাব্রিয়েল জেসুস, ফিরমিনো—কেউই তেমন ফর্মে নেই। অথচ দুজনকেই শুরু থেকে খেলানো হয়েছে। তিতে দল নির্বাচনেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। জেসুসের মতো একজন স্ট্রাইকারকে উইং থেকে রক্ষণ ভাঙতে বলাটা এর আগে কখনই ফল এনে দেয়নি, আজকেও সেটা দেখা গেছে। একই সঙ্গে ফিরমিনো ও জেসুসকে না খেলিয়ে অন্তত একজনের জায়গায় এভারতন সোয়ারেস, পেদ্রো কিংবা ভিনিসিয়ুসের মতো উইঙ্গার খেলালে হয়তো আরও কয়েকটা গোল পেতে পারত ব্রাজিল।

উইং থেকে তো বটেই, অন্তত প্রথমার্ধে মাঝমাঠ থেকেও তেমন সৃষ্টিশীলতা পায়নি সেলেসাওরা। আর্থার মেলো, লুকাস পাকেতা কিংবা ব্রুনো গিমারেসের মতো কাউকে প্রথম থেকে না খেলানোর মাশুল দিয়েছে ব্রাজিল। প্রত্যাশামাফিক খেলতে পারেননি দগলাস লুইজ। দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর জায়গায় পাকেতা নেমে বরং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ বেশ ভালোভাবেই সামলেছেন।

শেষমেশ ফিরমিনোর গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লেও ব্রাজিলের খেলা নিয়ে প্রশ্ন আছেই। যে প্রশ্নগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে বুধবার সকালের আগে। কারণ, সেদিনের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে কিন্তু ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল নয়!

মন্তব্য পড়ুন 0