চমকে দিয়ে ইউরোপ জয়

ভাগ্যাহত এক ইংরেজ কিংবা চার পেনাল্টি ঠেকানো বীর

বিজ্ঞাপন
default-image

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বড় ট্রফি চ্যাম্পিয়নস লিগ। তবে বড় ট্রফি বলে যে সব সময় বড় ক্লাবগুলোই এটা জিতেছে, তা কিন্তু নয়। বেশ কয়েকবার ‘পুঁচকে’ অনেক ক্লাবই সবাইকে চমকে দিয়ে হয়ে গেছে ইউরোপসেরা।

করোনা বিরতি শেষে কয়েক দিন পরেই আবার মাঠে গড়াবে চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউট পর্বের বাকি খেলাগুলো। বায়ার্ন মিউনিখ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কিংবা পিএসজির মতো বড় ক্লাব তো বটেই, ইউরোপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত টিকে আছে আতালান্তা, নাপোলি, অলিম্পিক লিওঁ ও লাইপজিগের মতো সাদা চোখে হিসেবের বাইরে থাকা ক্লাবগুলোও।

তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাস বলছে, এখানে কোনো ক্লাবকেই হিসেবের বাইরে রাখার উপায় নেই, বিশেষ করে নকআউট পর্বে তো নয়ই। বিভিন্ন সময় সবাইকে চমকে দিয়ে ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে যাওয়া কিছু ক্লাবের গল্প নিয়ে এই ধারাবাহিক। আজ দ্বিতীয় পর্ব

১৯৮১-৮২ ইউরোপিয়ান কাপ 

চ্যাম্পিয়ন : অ্যাস্টন ভিলা

ইংলিশ ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন কোন কোন কোচ?

প্রশ্নের উত্তরে মানুষ এক নিঃশ্বাসে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, বব পেইসলি, জো ফাগান, রবার্তো দি মাত্তেও, ইয়ুর্গেন ক্লপ, রাফায়েল বেনিতেজের নাম নিলেও শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ টনি বারটনের নাম ভুলে যাবেন। কেউ কেউ হয়তো টনি বারটনের জায়গায় রন সন্ডার্সের নামও নিতে পারেন। উত্তর ভুল হলেও, তাদের ঠিক দোষ দেওয়া যায় না। সন্ডার্সের গড়ে তোলা ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই তো অ্যাস্টন ভিলাকে ইউরোপসেরা করেছিলেন বারটন।

‘এখন খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রেস করে খেলানোর জন্য মানুষ ইয়ুর্গেন ক্লপ বা পেপ গার্দিওলাকে কৃতিত্ব দেয়, আমাদের ম্যানেজার বহু আগেই সেটা করে দেখিয়েছিলেন,’—অ্যাস্টন ভিলার কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিমি রিমারের এই এক কথার মধ্যেই কোচ রন সন্ডার্স সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

শুধু রক্ষণ নয়, ফুলব্যাকদের নিয়মিত সামনে গিয়ে ক্রস করতে হবে—এই ধারা জনপ্রিয় করার পেছনে হেলেনিও হেরেরা থেকে শুরু করে ফার্গুসন, জাগালো, বেকেনবাওয়ার, মিশেলস, স্কলারি, গার্দিওলা, ক্লপ—কত কোচেরই তো ভূমিকা আছে। ওদিকে আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মানেই যে শুধু আক্রমণ হয়, খেলতে হবে দলবদ্ধ হয়ে, ভূমিকা রাখতে হবে রক্ষণকাজেও, এই দর্শন জনপ্রিয় করার পেছনে সবাই হোসে মরিনহো ও ডিয়েগো সিমিওনের নাম নেন। আবার যুবদল থেকে খেলোয়াড় তুলে এনে গড়ে তোলার কারিগর মানা হয় ওয়েঙ্গার-ফার্গুসনকে।

এই প্রতিটি দর্শনেই সন্ডার্স নিজের ছাপ রেখেছিলেন ফুটবলে, কিন্তু ক’জনাই বা মনে রেখেছে সেটা? কেউ মনে রাখুক বা না রাখুন, মনে রেখেছে বার্মিংহামের এই ক্লাবটা। ফলাফল? লিগের পাশাপাশি ইউরোপসেরার তকমা!

default-image

নাটকীয়ভাবে ক্লাবের দায়িত্ব ছেড়ে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্মিংহাম সিটির কোচ হয়েছিলেন। কেন হয়েছিলেন? কেউ জানেন না। কেউ বলেন, সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকা সাবেক চেয়ারম্যান ডগ এলিসের প্রত্যাবর্তনের পর সন্ডার্স ক্লাবে থাকার অর্থ খুঁজে পাননি। আবার কেউ বলেন, চুক্তি বিষয়ক জটিলতার কথা।

শেষমেশ সন্ডার্সের অপ্রাপ্তিই হয়ে যায় সহকারী বারটনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যে কারণে একটা দলকে তিল তিল করে গড়ে তোলার পরেও ইউরোপসেরা ম্যানেজারের তকমা পাননি সন্ডার্স, পেয়েছেন বারটন। ক্লাবের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ম্যানেজার হয়েও ব্রায়ান ক্লফ বা স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের মতো ক্লাবের মাঠে স্বনামে স্ট্যান্ড, বব পেইসলির মতো স্বনামে গেট, বা ব্রায়ান রবসনের মতো মূর্তি জোটেনি সন্ডার্সের কপালে।

সন্ডার্স চলে যাওয়ার পর বারটন রাতারাতি কিছুই বদলাননি। খেলোয়াড়েরা যেভাবে খেলতেন, সেভাবেই খেলিয়ে গেছেন টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত। আর তাতেই ধরা দিয়েছে সাফল্য। ১-০ গোলে ফাইনালে পল ব্রাইটনার, কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগের বায়ার্নকে নিস্তব্ধ করে ইউরোপসেরা হয়েছে অ্যাস্টন ভিলা। প্রায় ৩৮ বছর পরেও যে গল্প এখনো রূপকথার মতো শোনায়!

অ্যাস্টন ভিলার সেই দলের খেলোয়াড়েরা সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে মেরেকেটে ৩৩টা ম্যাচ খেলেছিলেন। রাইটব্যাক কেনি সোয়েইন, সেন্টারব্যাক কেন ম্যাকনট, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার অধিনায়ক ডেনিস মর্টিমের, লেফটব্যাক গ্যারি উইলিয়ামস, স্ট্রাইকার গ্যারি শ’রা তো জীবনে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর সুযোগই পাননি। আজ কোনো দল ইউরোপসেরা হলে দলটার প্রায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ই নিজ নিজ জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ হন। অ্যাস্টন ভিলার ক্ষেত্রে অবস্থাটা তেমন ছিল না। এমনকি ১৯৮২ বিশ্বকাপে দল থেকে কেবলমাত্র স্ট্রাইকার পল উইদে সুযোগ পেয়েছিলেন, যে উইদের গোলেই এসেছিল ইউরোপিয়ান কাপ।

আক্ষরিক অর্থেই যেন ‘পুঁচকে’ ছিল ওই অ্যাস্টন ভিলা!

default-image

১৯৮৫-৮৬ ইউরোপিয়ান কাপ
চ্যাম্পিয়ন: স্টুয়া বুখারেস্ট

পেনাল্টি শুটআউটে একটা শট আটকাতে পারলেই অনেক সময় গোলরক্ষকেরা নায়ক হয়ে যান। দুটো হলে তো বটেই। তিনটা শট হলে দর্শকদের মুখ হাঁ হয়ে যেতে বাধ্য।

কিন্তু চারটা? চার-চারটা শট আটকে দলকে ইউরোপিয়ান কাপ জেতানোর নজির আছে কোন গোলরক্ষকের?

মাথা চুলকেও নাম বের করতে পারবেন না। কারণ বিশ্ব ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষকদের কারওরই এই কীর্তি নেই। ইকার ক্যাসিয়াস, জিয়ানলুইজি বুফন, লেভ ইয়াসিন, দিনো জফ, ক্লদিও তাফারেল, রেনে হিগুইতা, দিদা, অলিভার কান কিংবা হালের ম্যানুয়েল নয়্যার, অ্যালিসন বেকার, ইয়ান ওবলাক, মার্ক আন্দ্রে টের স্টেগেন, থিবো কোর্তোয়া, হুগো লিওরিস—কেউ নন।

এই কীর্তিটা এমন এক গোলরক্ষকের, বিশ্ব ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষকদের তালিকায় যার নাম কেউই রাখবেন না।

তাঁর নাম হেলমুট দুকাদাম। সাধারণ আর দশটা গোলরক্ষকের কাতার থেকে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে যিনি নিয়েছিলেন মেরেকেটে পনেরো মিনিটের মতো। ওই পনেরো মিনিটেই বার্সেলোনার স্বপ্নভঙ্গ করেছিলেন চার-চারটা পেনাল্টি আটকে।

একটু পেছনে ফেরা যাক। লোকে বলে, গিওর্গি হ্যাগির সেই বিখ্যাত দলটার আমলেই নব্বইয়ের দশকে রোমানিয়া কাটিয়েছে স্বর্ণসময়। কিন্তু আসলেই কী তাই? স্টুয়া বুখারেস্টের সেই বিখ্যাত দলের অন্যতম প্রধান স্ট্রাইকার ভিক্টর পিতুর্সা মানেন না সেটা। তাঁর মতে আশির দশকের রোমানিয়াই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী, যখন পিতুর্সারা খেলে গেছেন বুখারেস্টে, পাঁচবার লিগ জয়ের পাশাপাশি জিতেছিলেন চারটি কাপ। ঘরোয়া লিগের সেসব সাফল্য দেশের এক নায়ক নেতা ও তাঁর ছেলের সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, ইউরোপীয় সাফল্যে সে কালির ছোপ নেই।

default-image

ডেনমার্কের ভেলিয়ে বোল্ডক্লাব, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট হোনভেদ, ফিনল্যান্ডের কুইসি ও বেলজিয়ামের আন্ডারলেখটকে টপকে ফাইনালে ওঠা বুখারেস্ট মুখোমুখি হয়েছিল বার্সেলোনার। ইংলিশ কোচ টেরি ভেনাবলসের অধীনে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলা ও ক্লাবে বার্নড শুস্টার, আলেক্সাঙ্কো, পেদ্রাজা, স্টিভ আর্চিবল্ডের মতো তারকাদের উপস্থিতিতে অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বার্সা তাদের ইতিহাসের প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ জিতবেই জিতবে। বুখারেস্টের চেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ টপকে ফাইনালে ওঠা বার্সার শক্তিমত্তা নিয়েও সন্দেহ ছিল না কারওর। তারপর ফাইনাল হয়েছিল স্পেনের ক্লাব সেভিয়ার মাঠে। সেখানেও গোটা ম্যাচজুড়ে ঘরোয়া দর্শকদের মতোই সমর্থন পেয়েছিল বার্সা।

কিন্তু বুখারেস্টের যে একজন দুকাদাম ছিলেন!

একে একে র‍্যামন আলেক্সাঙ্কো, পেদ্রাজা, মার্কোস আলোনসো, পিচি আলোনসোর শট রুখে দেন এই গোলরক্ষক। সেই পিচি আলোনসো, সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে সুইডিশ ক্লাব গোথেনবার্গের বিপক্ষে যার হ্যাটট্রিকের কারণে বার্সা পেয়েছিল ফাইনালের টিকিট। শট আটকেছিলেন বার্সার গোলরক্ষক উরুতিও। অন্য যেকোনো ম্যাচে দুটি শট আটকালে হয়তো ম্যাচের নায়কও বনে যেতেন তিনি।

কিন্তু ম্যাচটা যে ‘অন্য’ কোনো ম্যাচ ছিল না! ম্যাচটা ছিল দুকাদামের। যে এক ম্যাচেই নিজের নাম রোমানিয়ার ইতিহাসের পাতায় খোদাই করে রেখেছেন এই গোলরক্ষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন