বার্সার স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যু-র বাইরে লাসলো কুবালার মূর্তি
বার্সার স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যু-র বাইরে লাসলো কুবালার মূর্তি ছবি: টুইটার

চ্যাম্পিয়নস লিগে আজ রাতে বার্সেলোনার প্রতিপক্ষ ফেরেনৎসভারোস। নামটা অপরিচিত লাগছে? লাগতেই পারে। মনে হতে পারে, এ তো আরেকটি ‘ডেভিড-গোলিয়াথ’ লড়াই। সেটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে। একটা সময়ে কিন্তু ফেরেনৎসভারোসের পৃথিবী এমন ছিল না। তখন বার্সার পৃথিবীও ছিল অন্যরকম।

‘সবুজ ইগল’নামে পরিচিত হাঙ্গেরির ক্লাবটি ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঘরোয়া লিগ জিতেছে ৩১ বার। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পুনর্জন্ম ঘটেছে বটে—২৫ বছর পর নাম লিখিয়েছে চ্যাম্পিয়নস লিগ গ্রুপ পর্বে—তবে ফেরেনৎসভারোসকে ইউরোপিয়ান আঙিনায় মাঝরেখার ওপাশে দেখে বার্সার কিন্তু খুশিই হওয়ার কথা। তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ তাই—এমন ভেবে থাকলে একটু ভুল হয়। আর এই ‘একটু’র মোড়ক ভাঙলে বেরিয়ে আসে বার্সা-ফেরেনৎসভারোসের এক মধুর যোগসূত্র।

বিজ্ঞাপন
default-image

বার্সার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে? কে আবার, লিওনেল মেসি! যদি বলা হয়, মেসি আসার আগে কে? ইয়োহান ক্রুইফের পক্ষে বেশি ভোট পড়বে। এবার যদি বলা হয়, ক্রুইফ আসার আগে কে? বিরক্তি চেপে আঁতিপাঁতি করে খুঁজলে বেরিয়ে আসবেন—লাসলো কুবালা। সেই যে, হাঙ্গেরির ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ দলের সদস্য, অনেকের মতেই ইতিহাসে অন্যতম সেরাদের একজন আর ১৯৯৯ সালে বার্সার শতবর্ষ পূর্তিতে পাঠক-জরিপে ক্লাবটির সর্বকালের সেরা—এই তো কুবালা!

১৮ বছর আগে পরপারে পাড়ি জমানো সাবেক স্ট্রাইকার আজ ক্যাম্প ন্যু তে বার্সা-ফেরেনৎসভারোস ম্যাচে প্রধান ঐতিহাসিক যোগসূত্র। হ্যাঁ, প্রধান তবে একমাত্র নয়। আরও আছেন—সান্দর ককসিস ও জোলতান চিবর। পঞ্চাশের দশকে হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলের সেই জাদুকরি দলের অন্যতম সদস্য। আজ বার্সা-ফেরেনৎসভারোস ম্যাচে এ দুজনের প্রসঙ্গও হয়তো উঠবে কোনো প্রবীণ ফুটবলপ্রেমীর কণ্ঠে।

default-image

আগে কুবালার কথা বলা যাক। চোখ ধাঁধানো ড্রিবলার, ঠান্ডা মাথার ফিনিশার ও ফ্রি-কিকে মারাত্মক ছিল তাঁর চোখের মাপ। বার্সা কিংবদন্তি হয়ে ওঠার আগে এই কুবালা ঘষামাজায় হিরের দ্যুতি লাভ করেছিলেন ফেরেনৎসভারোসে। ১৫ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন ক্লাবটিতে। এরপর তো হাঙ্গেরি, সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়া ও স্পেন জাতীয় দলেও খেলেছেন। কিন্তু কুবালার জোড়া পায়ের স্ফুলিঙ্গ প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল সবুজ ইগলদের সাজে। তাঁর ভাগ্য খারাপ ফেরেনৎসভারোসের হয়ে পঞ্চাশটা (৪৯ ম্যাচে ২৭ গোল) ম্যাচও খেলতে পারেননি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামরিক উর্দি পরা এড়াতে চলে যান সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ায়। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো, হাঙ্গেরি স্তালিনের পদতলে এল—কুবালা তখন দেশে ফিরলেও মন টেকেনি। স্তালিনের হাঙ্গেরিতে থাকতে পারেননি। ২১ বছর বয়সী এক সামরিক ট্রাকে রাশিয়ান আর্মির উর্দিতে কুবালা পালালেন। ধরা পড়লে গুলি খেয়ে মরতে হতো। কুবালা দমেননি।

কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে পায়ে হেঁটে দুর্গম গিরি-পর্বত জয় করে তিনি পা রাখলেন অস্ট্রিয়ায়। এরপর ইতালিতে খেললেন কিছুদিন। রোমে গঠন করলেন শরণার্থীদের দল। দলত্যাগ করায় তত দিনে তিনি ফিফায় নিষিদ্ধ। তাতে না দমে কুবালা চলে যান স্পেনে, তহবিল সংগ্রহের ম্যাচ খেলতে। রিয়াল মাদ্রিদ, এস্পানিওল ও স্পেন জাতীয় দলের বিপক্ষে কুবালা চেনালেন নিজের জাত। স্পেনে ভিনদেশি হয়েও বনে গেলেন সবচেয়ে বড় ফুটবল সেলিব্রিটি!

বিজ্ঞাপন
default-image

ছুটে এলেন রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। কুবালাকে চাই তাঁর। হারলেন বার্সার কাছে। কাতালান ক্লাবটি কোন তরিকায় কুবালাকে দলে ভিড়িয়েছিল সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তবে বার্সার দিকচক্রবালে আলোর রেখাপাত ঘটেছিল কুবালার নতুন ধরনের ফ্রি-কিক আর পেনাল্টি নেওয়ার ধরনে। বার্সা সমর্থকেরা এখন মেসিকে যত ভালোবাসেন কুবালাকেও তখন এতটাই মনে ধারণ করতেন তাঁরা।

মূলত বার্সায় কুবালার উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা দেখেই রিয়াল মাদ্রিদ অনুভব করেছিল তাদেরও একজন ‘সুপারস্টার’ প্রয়োজন। আর এই ভাবনা থেকেই ১৯৫৩ সালে আলফ্রেড ডি স্টেফানোকে নিয়ে বার্সা ও রিয়ালের কাড়াকাড়ির পর আর্জেন্টাইন নাম লিখিয়েছিলেন মাদ্রিদের ক্লাবে।

বার্সায় নিজের প্রথম পুরো মৌসুমে (১৯৫১-৫২) ইতিহাস গড়েছিলেন কুবালা। সেটি ছিল ক্লাব ঐতিহাসিক ‘পাঁচ শিরোপা জয়ের বছর।’ স্পোর্টিং গিহনের বিপক্ষে এক ম্যাচেই করেছিলেন ৭ গোল—লা লিগায় যা আজও রেকর্ড। বার্সার পুরোনো মাঠ লা কোর্তেসের গ্যালারি উপচে পড়ত কুবালার খেলা দেখতে। কর্মকর্তারা বুঝতে পারলেন, আরও বড় স্টেডিয়াম লাগবে—এভাবে জন্ম হলো ক্যাম্প ন্যুর।

সে সময়ের বার্সা কোচ জোসেপ সামিতিয়ের সিড লো-র ‘ফিয়ার অ্যান্ড লোদিং ইন লা লিগা’ বইয়ে বলেছেন, ‘কাতালুনিয়ায় ফুটবল সমর্থনের ভিত্তিপ্রস্তর ছিলেন কুবালা। তিনি এবং পরে ডি স্টেফানো মিলে ফুটবলকে বানিয়ে ফেলেন অপেরা।’

default-image

কিন্তু সময় কখনো একরকম যায় না। ঐতিহাসিক পাঁচ শিরোপা জয়ের বছর শেষে কুবালার যক্ষ্মা হলো। আরোগ্যলাভে পর্বতঘেরা প্রত্যন্ত এক গ্রামে চলে যান তিনি। এর মধ্যে বার্সাও মাঠে ছন্দ হারাল। বেশ কয়েক মাস পর অবিশ্বাস্যভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন কুবালা। মাঠেও ফিরলেন, বার্সা জিতল টানা ৮ ম্যাচ, টেবিলে পঞ্চমস্থান থেকে উঠে জিতল টানা দুই শিরোপা। এদিকে হাঙ্গেরিতেও ফেরেনৎসভারোসেরও সুসময় চলছিল। দুজন উঠতি প্রতিভা নিয়ে ১৯৪৯ সালে জিতল হাঙ্গেরিয়ান লিগ। সেই দুজন উঠতি প্রতিভা? সান্দর ককসিস ও জোলতান চিবর।

হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলে তখন বিপ্লব চলছিল। জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল ক্লাবগুলো। জাতীয় দলের কোচ গুস্তাভ সেবেস এই সুবিধাটা নিলেন। ছোট্ট এক ক্লাবের নাম পাল্টে সামরিক দল বানানো হলো—বুদাপেস্তি হোনেভদ। ককসিস চিবোরসহ হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলের সেরা সন্তানদের সেই দলে নেওয়া হলো। বিখ্যাত সেই ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ দলের ছয়জন খেলোয়াড় এসেছিলেন এই দল থেকে, ১৯৫৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের মধ্য দিয়ে যাদের স্বর্ণযুগ শেষ হয়।

এর দুই বছর পর ইউরোপিয়ান কাপে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের মুখোমুখি হয়েছিল হোনেভদ। তখন হাঙ্গেরিতে সামরিক আগ্রাসন চলছিল রাশিয়ান জান্তার। হোনেভদের খেলোয়াড়েরা আর দেশে ফিরতে চাননি। চিবোর চলে যান রোমে, ককসিস জুরিখে। কিন্তু ১৯৫৮ সালে কুবালা তাদের সঙ্গে দেখা করে বার্সায় খেলতে রাজি করালেন। আর ফেরেঙ্ক পুসকাস যোগ দিলেন ডি স্টেফানোর সঙ্গে—রিয়াল মাদ্রিদ।

বিজ্ঞাপন

বার্সায় চারবার লিগজয়ী কুবালার সোনালি দিন তত দিনে ফুরোতে চলেছে। তাঁর জীবনযাত্রা মোটেও পছন্দ করতেন না কোচ হেলেনো হেরেইরা। চিবোর আর ককসিসকে তাঁর মনে ধরল। প্রথমজন উইংয়ে আগুনের হলকা ছোটাতেন, পরেরজন সাক্ষাৎ ‘হেডমাস্টার’—ককসিসের মতো হেড করার আর কারও আছে কি না, তা নিয়ে এখনো তর্ক চলে।

পঞ্চাশ দশকের সেই শেষ নাগাদ রিয়াল মাদ্রিদ যখন ইউরোপে শিরোপা জিতছে, বার্সা তখন লিগে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। সে যাই হোক, হেরেইরার চোখ রাঙানির পরও ককসিস ও চিবোরের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন কুবালা। ১৯৬১ ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালেও উঠেছিলেন তাঁরা—এই পথে প্রথম দল হিসেবে বার্সা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে ফেলেছিল রিয়াল মাদ্রিদকে।

default-image

সেবার ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল ছিল বার্নে। ৭ বছর আগে হাঙ্গেরির বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গের ভেন্যু! চিবোর-ককসিস এই দুঃস্বপ্ন থেকেই ৭ বছর আগের ড্রেসিং রুম ব্যবহার করতে চাননি। তাতে অবশ্য ভাগ্য পাল্টায়নি। বেলা গুটম্যানের বেনফিকার কাছে ফাইনালে ৩-২ গোলে হেরেছিল বার্সা। এরপর ইউরোপসেরার মঞ্চে আরেকটি ফাইনাল খেলতে বার্সার লেগে গেল ২৫ বছর।

সংখ্যার মজাটা দেখুন, এই ২৫ বছর (সর্বশেষ ১৯৯৫) বিরতির পরই চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছে ফেরেনৎসভারোস—সেটিও এই ইউরোপসেরার মঞ্চে এই প্রথমবারের মতো তারা মুখোমুখি হচ্ছে বার্সার। শুধু কী তাই, একই গ্রুপে আছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জুভেন্টাসও! যে জুভেন্টাসকে ১৯৬৫ সালে ইন্টার-সিটিজ ফেয়ারস কাপে হারিয়েছিল ফেরেনৎসভারোস।

default-image

মেসি-রোনালদোর মুখোমুখি হওয়া নিয়ে ফেরেনৎসভারোস কিন্তু মোটেও ভয় পাচ্ছে না। বরং এই চ্যাম্পিয়নস লিগ গ্রুপপর্ব তাদের জন্য উৎসবের উপলক্ষ। ক্লাবটির প্রধান নির্বাহী পল অরোসের ভাষ্য তেমনই, ‘হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলে সবার জন্য এটি উৎসবের উপলক্ষ। বার্সা ও জুভেন্টাসের মুখোমুখি হওয়াটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমরা এমন বড় প্রতিপক্ষই চেয়েছিলাম।’

ওদিকে বার্সা শিবিরে নিশ্চয়ই স্মৃতির ভিডিওটেপ চলছে—কুবালা, ককসিস, চিবোর!

মন্তব্য পড়ুন 0