বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সমুদ্রের নীল জলরাশির টানে এখানে ছুটে আসে হাজারো পর্যটক। বিশ্বের নামীদামি ক্রীড়াবিদ ও সেলিব্রেটিরা মালদ্বীপে আসেন ছুটি কাটাতে। দেদার ডলার খরচের এক আকর্ষণীয় স্থান মালদ্বীপ; যা এখন দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবলের গন্তব্য।

বিমানবন্দর থেকে সমুদ্রপথে আসা যায় শহরে। কয়েক মিনিটের পথ। আবার সড়কপথে আসার ব্যবস্থাও রয়েছে। মিনিট দশেকের দূরত্ব পেরিয়ে সাজানো গোছানো এক শহরেরই দেখা মিলবে। করোনার দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে বাংলাদেশের মতো এখানেও দোকানপাটসহ সবই উন্মুক্ত এখন। সামাজিক দূরত্ব মানার বাধ্যবাধকতা দূর হয়েছে বেশ আগেই। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে আসা ফুটবলার, কোচ, কর্মকর্তা, ক্রীড়া সাংবাদিক—কারও জন্যই কোয়ারেন্টিন নেই। অবশ্য দুই ডোজ টিকা নেওয়া সনদ মালে আসার ২৪ ঘণ্টা আগে অনলাইনে জমা করতে হবে। টিকা দেওয়া থাকলেই কেবল কোয়ারেন্টিনে ছাড়।

তবে সাফের প্রতিটি ম্যাচ ডের আগে খেলোয়াড় কর্মকর্তা, ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। করোনা নেগেটিভ সনদ না থাকলে ম্যাচের দিন মাঠে ঢোকা যাবে না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। সাফে ম্যাচ হবে ৬ দিন—১, ৪, ৭, ১০, ১৩ ও ১৬ অক্টোবর। অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্টে ৬ বার করোনা পরীক্ষা করতে হবে ম্যাচ কাভার করতে আসা ক্রীড়া সাংবাদিকদের। মালে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মিডিয়া ম্যানেজার জানালেন, ম্যাচ দেখতে আসা দর্শকদেরও করোনার দুই ডোজ টিকা নেওয়া থাকতে হবে।

ছোট্ট শহর বলে এত দিন এককভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বড় কোনো ফুটবল উৎসব হয়নি মালেতে। ২০০৮ সালে একবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছিল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথ আয়োজনে। সেবার বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠতে পারলে মালদ্বীপে খেলা পড়ত। কিন্তু বাংলাদেশ বিদায় নিয়েছে গ্রুপ থেকেই। সেই টুর্নামেন্ট শ্রীলঙ্কায় বসে কাভার করে বাংলাদেশি সাংবাদিকেরা অপেক্ষায় ছিলেন মালদ্বীপ আসার। সেই দলে ছিলাম আমিও। কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবল দল তা হতে দেয়নি। সুতরাং শ্রীলঙ্কা থেকেই ফিরতে হয়েছে ঢাকায়। অবশেষে মালদ্বীপে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কাভার করতে এসে মালে দর্শনের সুযোগ হলো।

default-image

বিমানবন্দর থেকে শহরে ঢোকার মুখেই দেখা গেল, সমুদ্রের কোলঘেঁষে একচিলতে জায়গায় কিছু ছেলেমেয়ে ফিটনেস অনুশীলন করছে। দূর থেকে মনে হলো এরা খেলোয়াড়। পাশেই অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক দেখে মুগ্ধ হওয়ার পালা। এত সুন্দর আর সাজানো যে চট করে মনে পড়ল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সেই এবড়োখেবড়ো ট্র্যাকের কথা।

মালে শহরে জায়গা খুব কম। হোটেল-রেস্তোরাঁ, অফিস-আদালত, স্কুল—সব ক্ষেত্রেই জায়গার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে। হোটেল, অফিস-আদালতের সিঁড়িগুলো তুলনামূলক সরু। জনতার বাহন বলতে মূলত মোটরসাইকেল। হাজার হাজার মোটরসাইকেল, স্কুটি রাস্তায়। এটিকে অনায়াসে স্কুটির শহর বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো রাস্তা পিচঢালা নয়। সিরামিক ইট বিছানো। আমাদের ফুটপাতে বিছানো ইটের মতো। বিমানবন্দরের মূল সড়ক বাদ দিলে বাকি জায়গার রাস্তা একই রকম এবং ইট বিছানো।

default-image

শহরে একটিমাত্র স্টেডিয়াম, অনুশীলন মাঠের অভাব। ফলে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনে মালদ্বীপকে এত দিন বিবেচনায় রাখা হতো না। মালদ্বীপ সরকারও আগ বাড়িয়ে আয়োজক হতে চাইত না সাফের। কিন্তু এবার দেশটির সরকার উদ্যোগী হয়েছে। অবশেষে মালেতে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ১৩তম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ১৩তম সাফ। কিন্তু করোনায় গত বছর টুর্নামেন্টটি হয়নি। এ বছর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সংস্কার চলছে। ফলে ঢাকায় হওয়া সম্ভব ছিল না টুর্নামেন্ট। তবে সিলেট স্টেডিয়ামে সাফ আয়োজনের চিন্তাভাবনা করছিল বাফুফে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পিছিয়ে গেল কেন বোঝা কঠিন। পরে আয়োজক স্বত্ব পেতে নেপালকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে মালদ্বীপ।

২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে সাফের আয়োজক হয়েছিল মালেতে। সেবারই প্রথম তারা সাফ জিতে নিয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সাফ ট্রফি জিতে আসে ঢাকা থেকে। এই প্রথম এককভাবে তারা ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপের’ গর্বিত আয়োজক হয়েছে।

default-image

মালে জাতীয় স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় বাংলাদেশ-নেপাল ম্যাচ দিয়ে শুরু ১৭ দিনের টুর্নামেন্টে। এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে লম্বা সময়ের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আজই স্থানীয় সময় রাত ৯টায় নেপালের মুখোমুখি হবে টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মালদ্বীপ।

আফগানিস্তান সাফ থেকে বেরিয়ে গেছে আগেই। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিষিদ্ধ হয়ে আছে দেশটির ফুটবলে সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। কোভিড পরিস্থিতিতে প্রস্তুতির অভাবে ভুটান এবার অংশ নিচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার বাকি পাঁচ দেশ খেলছে এবার এবং এবারই সবচেয়ে কম দল—মাত্র ৫টি। ফলে দুই গ্রুপ না করে লিগ ভিত্তিতে সবাই সবার সঙ্গে খেলছে। এরপর শীর্ষ দুটি দল খেলবে ফাইনালে।

মনে পড়ছে ২০১৫ সালে ভারতের কেরালায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের কথা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনটা হলো দলগুলোর মূল হোটেলে। খেলা ছাপিয়ে সেদিন অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আর আয়োজনে জগাখিচুড়ি অবস্থা বড় হয়ে ওঠে। সেদিনের কথা কখনোই ভোলার নয়।

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করেছিলেন আফগানিস্তানের জার্মান কোচ পিটার সিগ্রাত। তিনি এত রুক্ষভাবে আয়োজকদের আক্রমণ করেন যে স্থানীয় সাংবাদিকেরা পর্যন্ত হতভম্ব। এ অঞ্চলের যেকোনো আয়োজনে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতেই পারে। সবকিছু হয় শেষ মুহূর্তে। কিন্তু কেরালায় এমন অগোছালো আয়োজন মোটেই সহ্য করতে রাজি ছিলেন না আফগান কোচ। বলেছিলেন, ‘আমরা অনুশীলন করতে পারছি না। মাঠে যাওয়ার বাস নেই। হোটেলে চেক ইন করতে ৬ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। কারও সাহায্য চাইলে সবাই দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এভাবে সাফ হতে পারে না।’

ভারতের কোচ কনস্ট্যানটাইন মাইক্রোফোন নেওয়ার পর মনে হয়েছিল আয়োজক হিসেবে তিনি হয়তো ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আরেক কাঠি সরেস। তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, সাফের মতো টুর্নামেন্টে দলগুলো অনুশীলন মাঠ পাবে না, এটা ভাবা যায় না। কেরালায় অনুশীলন মাঠ তখন দুটি। কিন্তু মাঠ শক্ত এবং সাত দলের জন্য অপর্যাপ্ত।

হোটেলে চেক ইন করতে গিয়ে শ্রীলঙ্কা দলের কয়েক ঘণ্টা কাটে লবিতে। নেপাল পড়েছিল আরেক সমস্যায়। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভুটানের আবাসস্থল তাজ হোটেল মনে করে বিমানবন্দর থেকে ড্রাইভার নেপাল দলকে সেদিন নিয়ে যান ২০ মাইল দূরের আরেকটা তাজে! বাংলাদেশের টিম মিটিং ছিল হোটেলে কিন্তু হোটেলে কর্তৃপক্ষ না বুঝেই ৫ হাজার রুপি দাবি করে বসে বাংলাদেশ দলের কাছে। আফগানরা ৪০ জনের বিশাল বহর নিয়ে আসায় বাংলাদেশের মিডিয়া ম্যানেজার রুমই পাননি।

সেই অগোছালো সাফের চেয়ে আজকের সাফের আয়োজন আলাদা। গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে কোনো দলের মুখেই শোনা যায়নি কোনো অভিযোগ। এখন পর্যন্ত সব চলছে ভালোয় ভালোয়। তবে গত আগস্টে মালেতেই বসুন্ধরা কিংসের এএফসি কাপের ম্যাচ কাভার করতে আসা এক সাংবাদিকের মুখে অনুযোগ, আয়োজকদের কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি তখন। দেখা যাক, আগামী কদিন সেটার ব্যতিক্রম হয় কি না।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন