বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

সেই ম্যাক্সি রদ্রিগেজই গতকাল অবসর নিলেন। সজল চোখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, জীবনের ৪০তম বছরে এসে ফুটবলকে আর নতুন কিছু দেওয়ার নেই তাঁর। সরে যাওয়ার সময় এখন। আজীবন পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে নিঃশব্দে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে যাওয়া ম্যাক্সির বিদায়টাও তাঁর ক্যারিয়ারের মতোই হলো। নীরবে, নিভৃতে।

তবে ফুটবলের নীরব পরিশ্রমী এই মানুষটার মূল্য বুঝতেন তাঁর কোচরা। ২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ হোসে পেকারম্যানের কথাই ধরুন। অনেকের চোখেই একবিংশ শতাব্দীতে আর্জেন্টিনাকে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলিয়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন। সে বিশ্বকাপেও মেসি-রিকেলমেদের পাশে নিয়মিত রদ্রিগেজকে খেলিয়ে গেছেন পেকারম্যান—সেটা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে হোক, আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে কিংবা উইঙ্গার হিসেবে। কোচের ভরসার মূল্য ভালোই চুকিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষে অনন্যসাধারণ সেই গোলের কথা কে ভুলতে পারে!

মেসি-আইমার-রিকেলমে বা সাভিওলার জাদুতে সেদিন কাজ হচ্ছিল না। ম্যাচটা ছিল আড়ালের কারও সামনে আসার দিন। তা না হলে প্রায় রাইটব্যাক পজিশন থেকে অর্ধেক মাঠ দৌড়ে প্রতিপক্ষ ডি-বক্সের ঠিক কোনায় কীভাবে ওই সময়েই পৌঁছে যান ম্যাক্সি? অপর উইং থেকে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক হুয়ান পাবলো সোরিনের বাতাসে ভাসানো পাসের ঠিকানা যে ম্যাক্সির বাঁ পা হয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় পর মেক্সিকোর জাল হবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও বোঝেননি মেক্সিকোর ছয় ফুট উচ্চতার গোলরক্ষক অসওয়ালদো সানচেজ।

default-image

পরাস্ত হওয়ার পর সানচেজকে দেখা গেল আপনমনে বিরক্ত হয়ে কাকে জানি বিষোদ্‌গার করছেন। নিজেদের রক্ষণভাগকে? হয়তো নয়, ওই গোলার মতো বাঁকানো শট আগে থেকে বুঝে আটকানোর সাধ্য বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারটিরও থাকার কথা নয়। হয়তো ম্যাক্সিকেই দুষছিলেন, মেসি-রিকেলমদের ছাপিয়ে জাতীয় তারকা হওয়ার জন্য সানচেজের বিপক্ষের মুহূর্তটাই বেছে নিয়েছিলেন দেখে! কিংবা কে জানে, হয়তো সানচেজ রেগে গিয়েছিলেন খোদ বিধাতার ওপরই—কেন তাঁকে আর কয়েক ইঞ্চি লম্বা বানানো হলো না, তাহলে তো আর বলটা জালে জড়ায় না!

default-image

ম্যাক্সির দাম বুঝেছিলেন রাফায়েল বেনিতেজও। স্টিভেন জেরার্ড, ফার্নান্দো তোরেসরা যেন নিজেদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঠিকভাবে ঘটাতে পারেন, সে কারণে লিভারপুলের এই কোচ উইঙ্গার হিসেবে আতলেতিকো থেকে বিনা মূল্যেই এনেছিলেন ম্যাক্সিকে। সে আরেক কাহিনি। ম্যাক্সি ভাঙা ভাঙা ‘ইয়েস’, ‘নো’ ছাড়া সেভাবে ইংরেজি বলতে পারতেন না। ওদিকে বেনিতেজ সাফ সাফ সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, লিভারপুলের ড্রেসিংরুমে টিকতে হলে একই ভাষায় কথা বলতে হবে, নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের বুনিয়াদ করতে হবে মজবুত।

কিন্তু ইংলিশ ফুটবলের রস আস্বাদন করার আশায় রদ্রিগেজ তখন বিভোর। বেনিতেজকে এক শব্দে জানিয়ে দিলেন, ইংরেজিটা পারেন। পরে ম্যাক্সিকে লিভারপুলের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বেনিতেজ বুঝলেন, ব্যাপারটা তেমন নয়!

default-image

লিভারপুলে সময়টা ঠিক তাঁর পক্ষে ছিল না। আর তাতে ম্যাক্সির দোষ ছিল সামান্যই। আড়াই বছরের লিভারপুল ক্যারিয়ারে কোচ দেখেছেন তিনজন, দেখেছেন মালিকানা বদল। ইংল্যান্ডের বৈরী পরিবেশে মানিয়ে নিতে স্প্যানিশভাষী স্বদেশি বন্ধু হাভিয়ের মাচেরানো আর সাবেক আতলেতিকো সতীর্থ তোরেসের ওপর ভরসা করেছিলেন, যে দুজন ম্যাক্সি আসার এক বছরের মাথায় ক্লাব ছেড়ে চলে যান।

তা–ও লিভারপুলের ঘোর অমানিশায় যে কয়েকজন আশার প্রদীপ হয়ে টিমটিম করে জ্বলছিলেন, ম্যাক্সি ছিলেন তাঁদের একজন। ১৬ দিনের ব্যবধানে প্রিমিয়ার লিগে বার্মিংহাম সিটি আর ফুলহামের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ম্যাক্সি বুঝিয়েছিলেন, কোচের আস্থা থাকলে তিনি মাঠে নিজের সামর্থ্যের শেষ বিন্দুটুকু রেখে আসতে প্রস্তুত।

default-image

এ আস্থা তাঁর ওপর রাখতে পারেননি কেনি ডালগ্লিশ। দলে ব্রিটিশ খেলোয়াড় বাড়ানো ও ক্রসনির্ভর ফুটবল খেলানোর আশায় চার্লি অ্যাডাম, স্টুয়ার্ট ডাউনিং, জর্ডান হেন্ডারসনের মতো একাধিক খেলোয়াড়কে দলে টানেন এই স্কটিশ কোচ। ফলে আবারও আড়ালে চলে যেতে হয় ম্যাক্সিকে। পাড়ি জমান নিজের প্রথম প্রেম—নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে।

মেসি যে ক্লাবে নিজের পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, ম্যাক্সির শুরুটাও সেখানেই। ক্লাবটাকে অন্য যে কারোর চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নিউয়েলসের জার্সি গায়ে তিন দফায় পৌনে ৪০০–এর মতো ম্যাচ খেলেছেন, গোলসংখ্যা ৯৩।

default-image

১৯৯৯ সালের ১৪ নভেম্বর ২৬ নম্বর জার্সি গায়ে ডিফেন্ডার ফাব্রিসিও ফুয়েন্তেসের জায়গায় উনিয়নের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন ১৮ বছর বয়সের এই তরুণ। নেমেই আরেক ডিফেন্ডার হুয়ান পাবলো ভয়ভোদাকে দিয়ে গোল করিয়েছিলেন। ঠিক ২২ বছর পর আরেক নভেম্বরেই নিউয়েলসের জার্সি তৃতীয়বারের মতো উঠিয়ে রাখতে গিয়ে ম্যাক্সি রদ্রিগেজ জানিয়ে দিলেন, ক্যারিয়ারটাকেও উঠিয়ে রাখার সময় হয়েছে। আর শেষটাও হলো কী দুর্দান্ত। সেন্ত্রাল কর্দোবার বিপক্ষে বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেই ফ্রি-কিক থেকে গোল করলেন। ওই গোলেই জিতল নিউয়েলস।

আর তাতেই পর্দা নামল অসাধারণ এক ক্যারিয়ারের।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন