মেসি নিজেও বিশ্বাস করেন চুক্তিপত্র ফাঁসের সঙ্গে বার্তোমেউ জড়িত থাকতে পারেন।
মেসি নিজেও বিশ্বাস করেন চুক্তিপত্র ফাঁসের সঙ্গে বার্তোমেউ জড়িত থাকতে পারেন। ছবি : রয়টার্স

জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না লিওনেল মেসির। সেই জের ধরে মেসি প্রথমে বার্সেলোনা ছাড়তে চেয়েছিলেন। পরে মেসি থেকে গেলেও বার্তোমেউয়ের গদি অক্ষত থাকেনি। গত বছরের অক্টোবরে বার্সা সভাপতির পদ ছাড়তে হয় বার্তোমেউকে। কিন্তু বার্তোমেউ চলে গেলে কী হবে, মেসিকে নিয়ে আবারও এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বার্সার সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধে।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম 'এল মুন্দো' বার্সায় মেসির সর্বশেষ চুক্তির খুঁটিনাটি সব ফাঁস করেছে। এ নিয়ে সরগরম স্প্যানিশ ফুটবল। সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে বার্সা মামলার হুমকি দিয়েছে। পাশাপাশি এই প্রশ্নও উঠেছে জোরেশোরে, কে, কীভাবে ফাঁস করল এই চুক্তিপত্র? ২০১৭ সালে নবায়ন করা মেসির সর্বশেষ এই চুক্তিপত্রের তথ্য কোনোভাবে সংবাদমাধ্যমের হাতে পড়ার কথা নয়। কারণ চুক্তি গোপনীয়। খেলোয়াড় ক্লাবে কত বেতন পান, তা কখনোই কাউকে জানানো হয় না। বড়জোর সম্ভাব্য একটা অঙ্ক জানা যেতে পারে। কিন্তু সব রকম আয় ও সুযোগ-সুবিধাসহ বেতনের অঙ্ক মিলিয়ে দেওয়াটা অসম্ভব। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন কে বা কারা?

বিজ্ঞাপন

কাতালান টিভি চ্যানেল 'টিভি৩'-এর 'গোল আ গোল' অনুষ্ঠানে বার্তোমেউয়ের বিরুদ্ধে চুক্তি ফাঁসের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বার্সার সাবেক সভাপতিকে চুক্তি ফাঁসের সম্ভাব্য নাটের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বার্তোমেউকে টিভি চ্যানেলটির তরফ থেকে অনলাইনে যোগদানের অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি এতে আগ্রহবোধ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান অনুষ্ঠানটির পরিচালক জাভি ভালসকে। এই বার্তায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন বার্তোমেউ।

default-image

বার্সার সাবেক সভাপতির এ দাবি প্রকাশ করেছে টিভি চ্যানেলটি। স্পেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তা প্রকাশ হয়েছে, ‘আমি (মেসির) চুক্তিপত্র ফাঁস করেছি, কথাটা শুনে খারাপ লাগছে। এটা পুরোপুরি মিথ্যা। পেশাদার চুক্তিপত্র ফাঁস করাটা ভীষণ গুরুতর ও অবৈধ কাজ। টিভিতে কাউকে অভিযুক্ত করা সহজ। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে মজা করছি না, এটার নিষ্পত্তি ঘটবে আদালতে। আর একটা কথা, খেলা এবং বাণিজ্যিক নানা দিক মিলিয়ে মেসি যে পারিশ্রমিক নেয়, সে তার যোগ্য। (করোনা) মহামারি শুরু না হলে বার্সা সহজেই তা দিতে পারত।’

টিভি চ্যানেলটির অনুষ্ঠানে এটাও দাবি করা হয়, মেসি নিজেও বিশ্বাস করেন চুক্তিপত্র ফাঁসের সঙ্গে বার্তোমেউ জড়িত থাকতে পারেন। এদিকে কাল রাতে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে বার্সার ২-১ গোলে জয়ের পর ক্লাবটির কোচ রোনাল্ড কোমানের কথায়ও আঁচ পাওয়া গেছে, ক্লাবের ভেতরকার কেউ এ কাজের সঙ্গে জড়িত, ‘যে-ই মেসির চুক্তিপত্র ফাঁস করুক, বার্সায় তার ভবিষ্যৎ থাকতে পারে না।’

এমনিতে সাধারণ হিসাব-নিকাশেও বার্সার প্রতিই আঙুল তুলতে হয়। মেসি ও তাঁর আইনজীবীর কাছ থেকে এই খেলাধুলার ইতিহাসে সবচেয়ে দামি এই চুক্তিপত্র ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মর্যাদাহানির ঝুঁকি তাঁরা নেবেন না। বাকি রইল লা লিগা কর্তপক্ষ ও বার্সা। যেহেতু খেলোয়াড়দের চুক্তির কপি এ চার পক্ষের কাছে থাকার কথা। লা লিগার কর্তৃপক্ষকেও সম্ভাব্য অভিযুক্ত থেকে বাদ দিতে হচ্ছে। কারণ, লা লিগার মতো পেশাদার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এমন অপেশাদার ও অবৈধ কাজ বেমানান। আর কোনো স্বার্থও তো নেই তাদের।

বিজ্ঞাপন

বার্সার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা ওঠে অন্য একদিক থেকে। এল মুন্দো চার বছরে মেসির ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার (৫৫ কোটি ৫০ লাখ ইউরো) চুক্তিপত্র ফাঁসের পর ক্লাবটি কিন্তু তা মিথ্যা বলে দাবি করেনি। বরং তাদের প্রতিক্রিয়ায় মেসির বেতনের অঙ্কগুলো একরকম প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে যায়। এদিকে কিছুদিন আগেই জানা গেছে, প্রায় ১২০ মিলিয়ন ইউরো দেনায় ডুবতে বসেছে বার্সা। এ সময় মেসির জন্য বার্সার মৌসুমপ্রতি প্রায় ১৪ মিলিয়ন খরচের অঙ্কটা আর্জেন্টাইন তারকার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে, অন্তত সমর্থকদের কাছে। চলতি মৌসুম শেষেই মেসির সঙ্গে বার্সার এই বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ফুরাবে। বেতনের এই অঙ্ক ফাঁস হওয়ায় ক্যাম্প ন্যু-তে মেসির ভাবমূর্তি নষ্ট হলে তিনি চলেও যেতে পারেন। তাতে একটি পক্ষ অন্তত মনস্তাত্ত্বিকভাবে তো লাভবান হবেই।

এর আগে কয়েক বছর ধরে মেসির ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ ও তাঁর বোর্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অ্যাকাউন্ট সৃষ্টি করে মেসির বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয়েছিল। বার্সেলোনা সমর্থকদের কাছে মেসিকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সে চেষ্টা ধরা পড়ে যায়। মেসির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল বার্তোমেউর। পরে তো তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে বার্সেলোনা–সমর্থকদের দাবির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বার্তোমেউ।

বার্তোমেউ যাওয়ার পর বার্সার আপৎকালীন সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন কার্লেস তুসকেতস। বার্তোমেউ থাকতে তিনি ক্লাবের আর্থিক দিক সামলাতেন। এর আগে তুসকেতস বলেছেন, মেসিকে যেতে না দিয়ে ভুল করেছে বার্সা। দেনার দায়ে ডুবতে বসা ক্লাবের জন্য মেসির বেতন যে বোঝা, সেটাও বুঝিয়েছেন তুসকেতস। অর্থাৎ বার্সায় মেসির ক্যারিয়ারের শেষ পাতাগুলো ওল্টানো কি শুরু করে দিয়েছেন বার্তোমেউয়েরই আস্থাভাজন তুসকেতস?

সময়ই এ প্রশ্নের জবাব দেবে। তার আগে ইঙ্গিত বুঝতে কিংবা ধরতে তো সমস্যা নেই? বার্সা কর্মকর্তারা দুদিন পরপরই ক্লাবের দেনার কথা বলছেন মুখ ফুটে। এর মধ্যে মেসির এই বিশাল অঙ্কের চুক্তির খবর ফাঁস হওয়াটা কিসের ইঙ্গিত দেয়? সরাসরি যেহেতু বলা যাচ্ছে না, তাই কলকাঠি নেড়ে আকারে-ইঙ্গিতে মেসিকে চলে যেতে বলা? ব্যাপারটি তেমন হলে সন্দেহের তির সবার আগে বিঁধবে বার্তোমেউর দলবলের ওপর। বার্তোমেউয়ের সময় আবার তাঁর আস্থাভাজন পরিচালকদের একজন ছিলেন তুসকেতস।

দুইয়ে–দুইয়ে চার কী তাহলে মিলেই যাচ্ছে?

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন