মেসিকে নিয়ে এত প্রশ্ন আগে কখনো ওঠেনি।
মেসিকে নিয়ে এত প্রশ্ন আগে কখনো ওঠেনি।ছবি: এএফপি

বার্সেলোনার জার্সিতে লিওনেল মেসি সর্বশেষ ৪৮টি ফ্রি-কিকে গোল করতে পারেননি। সর্বশেষ ফ্রি-কিকে গোল করেছেন গত জুলাইয়ে ওসাসুনার বিপক্ষে।

লিগে প্রতিপক্ষের মাঠে সর্বশেষ ১৫টি ম্যাচে মাত্র ৩ গোল করেছেন মেসি। এর মধ্যে একটি মায়োর্কার বিপক্ষে, যে গোলে বার্সেলোনা ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল, অন্য দুটি আলাভেসের বিপক্ষে অগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে।

আতলেতিকো মাদ্রিদের মাঠে গতকাল লিগে মেসি গোল বা অ্যাসিস্ট তো পানইনি, বার্সার ১-০ গোলে হারের ম্যাচে বল হারিয়েছেন ২৩ বার। সব মিলিয়ে পাস দিয়েছেন মাত্র ৩৬টি।

মেসি গত কয়েক মাসে আর ‘মেসি’ হয়ে দেখা দিতে পারছেন না। ৩৩ বছর বয়সে এসে কি ধার হারিয়ে ফেলছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড? কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে তো বেশ খেটেখুটেই খেলছেন! তাহলে কি সমস্যাটা বার্সেলোনায়? স্প্যানিশ দৈনিক এএস লিখছে, বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির ব্যক্তিগত ঝামেলার প্রভাবই পড়ছে তাঁর মাঠের পারফরম্যান্সে। যেটি বার্সেলোনার মৌসুম এরই মধ্যে ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ। এমনকি গতকাল আতলেতিকোর মাঠে মেসিকে দেখে হারের আগেই হার মেনে নেওয়া এক খেলোয়াড় মনে হয়েছে বলেও লিখেছে এএস!

বিজ্ঞাপন

নতুন কোচ রোনাল্ড কোমানের অধীনে এই মৌসুমে বার্সা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। কোমানের ৪-২-৩-১ ছকে মেসি-গ্রিজমানরা আলো ছড়াতে পারছেন কদাচিৎ, বার্সার মাঝমাঠও এখনো অচেনা। কোমানের ম্যাচ পরিচালনা, ম্যাচ পড়ার ক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। এখন পর্যন্ত লিগে ৮ ম্যাচের যে ৫টিতে বার্সা আগে গোল খেয়েছে, কোনোটিতেই জিততে পারেনি। দুটি ড্র, তিনটিতে হেরেছে!

কোমানের দল পরিচালনা, রিকি পুচ-কার্লেস আলেনিয়াদের মতো প্রতিভাবান তরুণদের সুযোগ না দেওয়া...এসব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠছে মেসির ফর্ম নিয়েই। গত কয়েক বছরে বার্সার সব সমস্যার একমাত্র উত্তর হয়েছিলেন বলেই হয়তো, এই মৌসুমে মেসির ছন্দহীন থাকা ভোগাচ্ছে বার্সাকে। লিগে ৮ ম্যাচে মাত্র ১১ পয়েন্ট বার্সার, যেখানে শীর্ষে থাকা রিয়াল সোসিয়েদাদের পয়েন্ট ৯ ম্যাচে ২০ (আজ কাদিজের বিপক্ষে জিতলে হবে ১০ ম্যাচে ২৩)! ৮ ম্যাচে ২০ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে আতলেতিকো মাদ্রিদ।

মেসির এই ছন্দহীন থাকা কি বার্সার সঙ্গে ঝামেলার কারণেই? ক্লাব ছাড়তে চেয়ে পারেননি, জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর বোর্ডের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা শেষ দিকে দৃশ্যমান হয়ে পড়েছিল, তাঁর প্রিয় বন্ধু ও মাঠে দারুণ সহযোগী লুইস সুয়ারেজকে একপ্রকার অপমান করেই তাড়িয়ে দিয়েছে বার্সা। গত কয়েক বছরে বার্তোমেউর অধীনে ক্লাবের খেলোয়াড় কেনাবেচার নীতির মূল্য দিয়ে বার্সা যে এখন আর চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার মতো দল নয়, সে তো মেসি গত ফেব্রুয়ারিতেই বলেছিলেন! আগস্টে ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছা জানানোর সময় বলেছিলেন, বার্সার টানা শিরোপা জিতে যাওয়ার মতো কোনো স্পোর্টিং প্রকল্প নেই।

default-image

এর সঙ্গে দলের যেকোনো ঝামেলাতেই তাঁর নাম জড়িয়ে খবর হচ্ছে। যেটির প্রভাব সর্বশেষ বোঝা গেছে দুদিন আগে। গ্রিজমান বার্সায় কেন আলো ছড়াতে পারছেন না—সে ব্যাখ্যায় তাঁর সাবেক প্রতিনিধি ও চাচা দিন কয়েক আগে যা বলেছিলেন, তার ভাবার্থ দাঁড়িয়েছিল, মেসিই চাইছেন না বার্সায় গ্রিজমান ভালো করুন, সে কারণেই গ্রিজমান উজ্জ্বল নন। দুদিন আগে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে বার্সায় ফেরার সময় বিমানবন্দরে এ নিয়ে প্রশ্নে মেসি বলেছিলেন, ‘এই ক্লাবটার সব ঝামেলার কেন্দ্রে নিজেকে অভিযুক্ত হতে দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত!’

সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, বার্সায় মেসি খুশি নন। এমনকি এত দিন যেখানে শোনা যেত, বার্সায় সবটুকু দিলেও আর্জেন্টিনা দলে মেসিকে স্বরূপে দেখা যায় না, সেই মেসিকেই এখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে বরং বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়।
এখন পর্যন্ত বার্সার হয়ে মৌসুমে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ১০ ম্যাচে মেসি গোল করেছেন ৬টি, করিয়েছেন ২টি। অন্য যে কারও জন্য এমন পারফরম্যান্স ভালোই। কিন্তু নামটা মেসি বলেই প্রশ্ন উঠছে। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩ ম্যাচে ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট, লিগে ৭ ম্যাচে (১টিতে বদলি হিসেবে নেমেছেন) গোল ৩টি! ৬ গোলের অবশ্য ৫টিই মেসি করেছেন পেনাল্টি থেকে, একটি গোল শুধু ‘ওপেন প্লে’ বা সরাসরি দলের আক্রমণের পর এসেছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

আতলেতিকোর মাঠে কাল মেসি ছিলেন বিবর্ণ। ম্যাচে তাঁকে দেখে মনে হয়েছে, মেসি যেন সাধারণ কেউ! তা এমন মাঝেমধ্যে হতেই পারে। কিন্তু বার্সা সমর্থকদের জন্য আরও শঙ্কা হয়ে আসবে স্প্যানিশ দৈনিক এএসের প্রতিবেদনের বাক্যটি। যেখানে লেখা, ‘...ম্যাচের শেষে আর্জেন্টাইনকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি কখনোই হার এড়ানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। মাঠ ছেড়েছেন কাঁধ নিচু করে।’
বছরখানেক আগে এই আতলেতিকোর মাঠেই বার্সাকে একা জিতিয়েছিলেন মেসি। সেদিন বার্সার ১-০ গোলে জয়ের পথে দ্বিতীয়ার্ধে চোখধাঁধানো ফুটবল খেলেছিলেন মেসি, দলকে জেতানো গোলটা করেছিলেন তাঁর ট্রেডমার্ক হয়ে যাওয়া ঢংয়েই। বল নিয়ে কয়েকজনকে কাটিয়ে আতলেতিকো বক্সের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন, যাওয়ার পথে সুয়ারেজের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে আতলেতিকোর রক্ষণ হা করে ফেলেন, তারপর বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শটে গোল! সেই মেসিই এক বছর পর বার্সার জার্সিতে অচেনা। একা। বিষণ্ন।

এএসের প্রতিবেদনের শেষ কথাটাও এখন হয়তো বার্সা সমর্থকদের কাছে শঙ্কা হয়ে আসবে। বছরের পর বছর যেখানে আর্জেন্টিনায় নয়, বার্সেলোনাতেই মেসি খুশি বলে প্রচারিত হতো সংবাদমাধ্যমে, সেই মেসিকেই এখন বার্সা ছেড়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বেশি খুশি মনে হয়। বার্সা নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিই এখন যেন মেসির কাছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার উপলক্ষ! এমনটাই অনুমান এখন ইউরোপের সংবাদমাধ্যমে।

অনুমিত ব্যাপারটি সত্যি হয়ে গেলে বার্সার জন্য সেটি হবে অশনিসংকেত।

মন্তব্য পড়ুন 0