বেনজেমা ও মেসি।
বেনজেমা ও মেসি। ছবি: সংগৃহীত

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্টাসে চলে গেছেন প্রায় ৩ বছর হয়ে গেল। যাওয়ার সময় কি ব্যাগে ভরে লিওনেল মেসির গোলগুলোও নিয়ে গেছেন?

রোনালদো চলে যাওয়ার সঙ্গে মেসির গোলের আপাতদৃষ্টে কোনো সম্পর্ক নেই। রোনালদো জুভেন্টাসে গোলের বান ছুটিয়ে যাচ্ছেন, মেসি বার্সেলোনায় গোল করার পাশাপাশি করানোর দায়িত্বটাও যেন আরও বেশি করে নিচ্ছেন। তাহলে মেসির কোন গোলের কথা বলা হচ্ছে? এল ক্লাসিকোতে গোল!

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সর্বশেষ কবে মেসি গোল পেয়েছেন মনে করে দেখুন তো! অত মাথা চুলকাতে হবে না, সম্পর্কটা রোনালদোর সঙ্গে টেনে নিলেই হবে। রোনালদো চলে যাওয়ার পর থেকে ৬টি এল ক্লাসিকোতে গোলের দেখা নেই মেসির! শুধু গোল করা কেন, করাতেও ব্যর্থ বার্সা অধিনায়ক!

বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় স্প্যানিশ লিগে রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে আবার হচ্ছে এল ক্লাসিকো, মৌসুমে শেষবার মুখোমুখি হচ্ছে বার্সা-রিয়াল। তার আগে মেসির ক্লাসিকো-খরা যদি বার্সার মাথাব্যথা হয়, রিয়ালেরও কি মাথাব্যথা কম নাকি? ওদিকেও যে একজন গোলখরায় ভুগে যাচ্ছেন! করিম বেনজেমা। যেন নয়-ছয় চলছে মেসি-বেনজেমার। মেসি ৬ ম্যাচ ধরে গোল পাচ্ছেন না, বেনজেমা এল ক্লাসিকোয় গোলহীন ৯ ম্যাচ।

বিজ্ঞাপন

মেসি তো বছরের পর বছর ধরেই বার্সার গোলের জোগানদাতা, করে হোক বা করিয়ে। রোনালদোহীন রিয়ালেও বেনজেমা হয়ে উঠেছেন গোলের মূল ভরসা। সে কারণে এল ক্লাসিকোতে দুজনেরই গোলখরা দুই দলের জন্য কপালে বড় ভাঁজ ফেলার মতো একটা কারণ বটে।

ফর্মের হিসাবে অবশ্য দুজনকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে ২৪ গোল বেনজেমার। ১৭ গোল করে স্প্যানিশ লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ফরাসি স্ট্রাইকার আছেন ৪ নম্বরে। আর মেসি? আরও দুর্ধর্ষ ফর্ম ৩৩ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের। মৌসুমের শুরুতে বার্সেলোনা ছাড়তে চাওয়া ও তৎপরবর্তী নাটকীয়তা-হতাশায় ছন্দহীন ছিলেন বটে, কিন্তু সেটিকে পাশে ফেলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতেই ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন মেসি।

default-image

গত সপ্তাহে ভায়াদোলিদের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করতে বা করাতে পারেননি, কিন্তু তার আগে লিগে সর্বশেষ ১৪ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করে বা করিয়ে অবদান রেখেছেন। এর মধ্যে ১২ ম্যাচে গোল করেছেন। সব মিলিয়ে এই ১৪ ম্যাচে ১৮ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও ৮টি করিয়েছেন মেসি!

ফল? নভেম্বরের দিকেও লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে কিছুটা আর গোলে সহায়তাকারীর তালিকায় অনেক পিছিয়ে থাকা মেসি তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে চলেছেন দুই তালিকাতেই।

২৩ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দুইয়ে থাকা জেরার্দ মরেনো (১৯) ও লুইস সুয়ারেজের (১৯) চেয়ে এগিয়ে আছেন অনেকটা, ‘অ্যাসিস্টে’র তালিকায়ও মেসির (৮) ওপরে আছেন শুধু সেলতা ভিগোর স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ইয়াগো আসপাস (১০)। মেসির সমান ৮ গোল করিয়েছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের স্প্যানিশ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্কোস ইয়োরেন্তে।

কিন্তু ক্লাসিকোর হিসাব তো আর দশটা ম্যাচের সঙ্গে মিলবে না! রোনালদো যাওয়ার পর থেকেই ক্লাসিকোতে নামলে মেসির যেন কী হয়ে যায়। বার্সা গত কয়েক মৌসুমে প্রতি ম্যাচে আরও বেশি করে মেসিনির্ভর হয়েছে, সে কারণে মেসিকে আটকে বার্সাকে বিবশ করার পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছে রিয়াল মাদ্রিদ। মেসির গোল না পাওয়ার ফুটবলীয় ব্যাখ্যা তাই চাইলে খুঁজে পাওয়াই যায়। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু এটিই কি একমাত্র ব্যাখ্যা?

২০০৯ থেকে ২০১৮—৯ বছর স্পেনে রিয়ালের জার্সিতে রোনালদো আর বার্সার জার্সিতে মেসির ধুন্ধুমার দ্বৈরথ দেখে তৃপ্ত ফুটবল-রোমান্টিক মন এ ব্যাখ্যায় একটু বেঁকে বসতে চায়। প্রশ্নটার উত্তর তো মিলবে না, তবু প্রশ্ন করে যায়—নাকি রোনালদোকে ‘মিস’ করছেন মেসি?

বিজ্ঞাপন
default-image

একে তো রিয়াল বনাম বার্সা, তার ওপর রোনালদো বনাম মেসি বলে ৯ বছরে এল ক্লাসিকো ছিল পরম প্রার্থিত। রোনালদো যাওয়ার পর সে জৌলুশে ভাটা যে পড়েছে, তা বোঝার জন্য গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণের দরকার পড়ে না। মেসি-রোনালদোর খেলায়ও কি একে অন্যের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার, একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার নিরন্তর ‘হিংসা’র অভাবের প্রভাব পড়ছে?

দুজনই যে মুখোমুখি লড়াইটা অনেক যে মিস করেন, তা বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন অকপটে। জানিয়েছেন, প্রিয় ‘শত্রু’র একই লিগে না থাকা কষ্টদায়ী। মেসির অকপট স্বীকারোক্তি, রোনালদো যাওয়ায় স্প্যানিশ লিগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিয়াল ছেড়ে জুভেন্টাসে যাওয়া রোনালদো তো এককাঠি সরেস, ভবিষ্যতে বার্সা ছেড়ে মেসিকে ইতালিয়ান লিগে যাওয়ার নিমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছেন।

রোনালদো যাওয়ার পর ছয়বার দেখা হয়েছে রিয়াল-বার্সার। আজ সপ্তম ম্যাচ। কে জানে, ম্যাচের আগে নিজের মনোযোগ পুরোপুরি ম্যাচে নিবিষ্ট করার সময়টাতে, কীভাবে কাকে সামলাবেন—সে পরিকল্পনা করার সময়টাতে মেসির পরক্ষণে হয়তো মনে পড়ে যায়, প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বীই তো নেই। হয়তো দীর্ঘশ্বাস ঝরে অগোচরে।

default-image

দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে হয়তো রোনালদোহীন ছয় ক্লাসিকোতে তাঁর পায়ে লেগে থাকা ফুটবলটাও। মেসির পায়ে এখন আর ক্লাসিকোতে যে সৃষ্টিশীলতার সৌরভের বাহন হতে পারছে না ফুটবলটা। পারছে না বছরের পর বছরে তাঁর অন্যতম প্রিয় উপলক্ষের সাক্ষী হতে—ক্লাসিকোতে মেসির পা ছুঁয়ে জালে জড়াতে।

রিয়ালের বিপক্ষে মেসির সর্বশেষ গোল যে সেই ২০১৮ সালে। ২০১৭–১৮ মৌসুমে লিগের ৩৬তম ২-২ গোলে ড্র করেছিল রিয়াল ও বার্সা। মেসির অন্য পাশে সেদিন গোলের উচ্ছ্বাসে মেতেছিলেন রোনালদোও।

আজ অবশ্য আরেক ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষকেও পাবেন না মেসি। রিয়ালের অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার সের্হিও রামোস, চোট খেলতে দিচ্ছে না তাঁকে। তবে মাঠে নামলেই রামোসের রেকর্ডে ভাগ বসানো হয়ে যাবে বার্সা অধিনায়কের। এল ক্লাসিকোতে সবচেয়ে বেশি গোল (২৬), অ্যাসিস্টের (১৪) রেকর্ড তো অনেক আগে থেকেই মেসির একার দখলে, দর্শকসারিতে থাকা রামোসের সামনে আজ মেসি বসে যাবেন সবচেয়ে বেশি এল ক্লাসিকো খেলার (৪৫ ম্যাচ) রেকর্ডের চূড়ায় এত দিন একা থাকা রামোসের পাশে।

বেনজেমার তেমন কোনো রেকর্ডের সম্ভাবনা-টম্ভাবনা নেই। আছে শুধু তাঁর কাছে রিয়ালের প্রত্যাশা পূরণের দায়। ২০১৬ সালের এপ্রিলে—রিয়ালের কোচ হিসেবে জিনেদিন জিদানের প্রথম এল ক্লাসিকোতে—সেই যে গোল করেছিলেন, এরপর ৯ ম্যাচে আর গোল পাননি বেনজেমা। এ সময়ে ৩৩ বছর বয়সী ফরাসি স্ট্রাইকার অবশ্য গোল করিয়েছেন দুটি।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন