মেসি-বার্সার বিচ্ছেদ থেকে ফেরার আর সম্ভাবনা নেই

সংবাদ সম্মেলনে বার্সেলোনা সভাপতি হোয়ান লাপোর্তাছবি: এএফপি

সংবাদ সম্মেলনের শেষে এসে সবকিছু শেষ হওয়ার ঘোষণাটা একেবারে চূড়ান্তভাবে দিয়ে দিলেন হোয়ান লাপোর্তা! প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলন। মোট ২৭টি প্রশ্নের উত্তর দিলেন বার্সেলোনা সভাপতি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুর দিকেও একবার নিশ্চিত করেছিলেন, মেসির সঙ্গে বার্সার আর তবু কারও যদি মিছে আশা থেকে থাকে মনে, সেটি দূর করতেই সংবাদ সম্মেলনকক্ষ ছেড়ে যাওয়ার আগে আরেকবার স্পষ্ট করে কথাগুলো বললেন লাপোর্তা।

এতক্ষণ স্প্যানিশ ভাষায় সংবাদ সম্মেলন হয়েছে, এবার স্পষ্ট ইংরেজিতে লাপোর্তা বলে দিলেন, ‘হোর্হের (লিওনেল মেসির বাবা ও মুখপাত্র হোর্হে মেসি) সঙ্গে আমার সব সময়ই কথা হয়েছে। লিওর সঙ্গে খুদে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। আলোচনা শেষ। সব শেষ।’

ছোট্ট ঘোষণাটাই বুঝিয়ে দিল, নাটকে অবিশ্বাস্য কোনো মোচড়ের পর মেসি আর বার্সেলোনার আবার এক হওয়ার যদি কোনো সম্ভাবনা থেকে থাকে, গতকাল রাতে মেসি-বার্সার বিচ্ছেদ ঘোষণা করা বার্সার বিবৃতির পর থেকেই যে সম্ভাবনা নিয়ে কথা হচ্ছিল, সেটি আর হচ্ছে না।

সংবাদ সম্মেলনে মেসিকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান লাপোর্তা
ছবি: এএফপি

মেসির বার্সেলোনা অধ্যায় কিংবা বার্সেলোনার মেসি অধ্যায়—যেভাবেই দেখুন, সে অধ্যায় শেষ। লাপোর্তাই তা নিশ্চিত করে দিয়েছেন।

বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির আগের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে ৩০ জুন। গতকাল দুই পক্ষের চুক্তি নবায়নের কথা ছিল। কিন্তু গতকাল রাতে উল্টো বার্সা বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিল, স্প্যানিশ লিগের বেঁধে দেওয়া বেতনের সীমার নিয়মের কারণে মেসিকে নিবন্ধন করাতে পারবে না বার্সা, সে কারণে দুই পক্ষের চুক্তি হচ্ছে না। এরপর আজ সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন লাপোর্তা।

সেখানে শুরুতেই বার্সা সমর্থকদের মনের কোণের ছোট্ট আশাও শেষ করে দিলেন লাপোর্তা, ‘আরেকবার বলছি, কোনো মিথ্যে আশা তৈরি করতে চাই না। (মেসির সঙ্গে) চুক্তির আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। এটা সত্যি ওর হাতে অন্য অনেক প্রস্তাব আছে, চুক্তির আলোচনার সময়ে সেসব আমরা শুনতে পেয়েছি। আমাদেরও চুক্তির আলোচনা শেষ করার জন্য একটা চূড়ান্ত দিনক্ষণ ছিল। লা লিগা শিগগিরই শুরু হচ্ছে। আর্থিক সংগতির নীতিও (এফএফপি) একেবারে পরিষ্কার। একজন খেলোয়াড় এসবের মধ্যে ঝুলে থাকতে পারে না।’

চুক্তি না হওয়ায় বার্সার মতো মেসিও যে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন, সেটাও জানালেন বার্সা সভাপতি, ‘হোর্হের সঙ্গে কথা হচ্ছে অনেক দিন ধরে, লিও ইবিজায় থাকার সময়ে ওর সঙ্গে খুদে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। গতকাল আমাদের চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। (সেটি না হওয়ায়) দুই পক্ষই ভীষণ হতাশ, অনেক পরিশ্রম করেছি আমরা এটা নিয়ে। কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কিছু ব্যাপারের কারণে শেষ পর্যন্ত এটা সম্ভব হলো না।’

নিয়ন্ত্রণের বাইরের ব্যাপার বলতে মূলত দুটি। এক, জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর অধীন আগের বোর্ডের অধীনে বার্সেলোনার আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে জুনে লাপোর্তার বোর্ড ভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থা না নিলে বার্সার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও ছিল। আগের বোর্ডের অধীনে বার্সার বেতনের বিল ছিল তাদের আয়ের ১১০ ভাগ! ফলে দেনা বেড়েছে। অন্যদিকে স্প্যানিশ লিগ কর্তৃপক্ষ বেতনের সীমা বেঁধে দিয়েছে, সেটির ব্যাপারে তারা কোনোভাবেই ছাড় দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

এর মধ্যে সেটিকে ফাঁকি দিতে মেসির সঙ্গে অভিনব চুক্তির ব্যবস্থা করেছিল বার্সা। মেসি ৫০ শতাংশ বেতন কম নিয়ে দুই বছর খেলবেন, কিন্তু সেই অর্থটা পাঁচ বছরে বণ্টনের ব্যবস্থা করে চুক্তিটা করবে বার্সা—এমনই ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু লা লিগা সেটিতেও রাজি হয়নি বলে জানালেন লাপোর্তা, ‘দুই বছরের বেতন পাঁচ বছরে দেওয়ার ব্যবস্থাটা যদি এফএফপির নিয়মের মধ্যে মেনে নিত লা লিগা, তাহলে চুক্তিটা হয়ে যেত। সবাই খুশি থাকত। কিন্তু সেটাও মানা হয়নি।’

আরেকভাবেও মেসির চুক্তি হতে পারত, কিন্তু সেটিতে লাপোর্তা রাজি নন। লা লিগার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ সংস্থা সিভিসির একটি চুক্তি হয়েছে দুদিন আগে, যেটি এখনো আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি। চুক্তি অনুযায়ী, লিগের স্বত্বের ১০ শতাংশ ৫০ বছরের জন্য কিনে নেবে সিভিসি, সেটির বিনিময়ে লা লিগাকে ৩০ কোটি ইউরো দেবে তারা। কিন্তু বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ এ চুক্তির সঙ্গে একমত নয়। দুই ক্লাবই কাল বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। এ নিয়ে লিগের সভাপতি হাভিয়ের তেবাসের সঙ্গে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ লেগেছে লাপোর্তার।

আজ সংবাদ সম্মেলনেও লাপোর্তা বলেন, ‘লা লিগা বেতনের সীমা নিয়ে নমনীয় হতে রাজি নয়। তারা শুধু তখনই নমনীয় হতো যদি আমরা ক্লাবের সম্প্রচার স্বত্ব আধা শতকের জন্য বন্ধক দিয়ে দিতে রাজি হতাম!’ লাপোর্তার চোখে সেটিকে ক্লাবের জন্য খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে, ‘বেতনের সীমায় একটু নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা বের করা এবং লিওকে নিবন্ধন করাতে হলে এমন কিছু করতে হতো (সিভিসির চুক্তিতে সই করা), যেটা বার্সার জন্য মোটেও ভালো কিছু হতো না। আমরা ক্লাবের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখতে চাইনি।’

তাতে মেসি আর বার্সার সম্পর্কের শেষ হয়ে গেল আর কী! শেষটা হলোও কীভাবে! বার্সেলোনারই একাডেমিতে কৈশোর থেকে বেড়ে ওঠা, বার্সেলোনাকেই জীবন মানা, বার্সেলোনাতেই সব জেতা, বার্সেলোনাকে সব জেতানো মেসির বার্সা থেকে বিদায় মাঠ থেকে হচ্ছে না। আক্ষেপ আছে লাপোর্তারও, ‘লিও মেসির মতো একজন খেলোয়াড় এ রকম কোভিডের পরিস্থিতিতে বিদায় নিচ্ছে, যে সম্মানে বিদায় তাঁর প্রাপ্য সেটি পাচ্ছে না, এটা ভীষণ দুঃখের। দুই বছর পর হলে সবকিছু কত সুন্দর হতো! (মেসির বিদায়ের সময়ে) স্টেডিয়ামভর্তি সমর্থক থাকত তখন।’

তবে এখন না হলেও কোনো একদিন মেসিকে ভক্তদের ভালোবাসায় মাঠ থেকে বিদায় জানাতে চান লাপোর্তা, ‘লিওর যে সম্মান-ভালোবাসা প্রাপ্য, সে সম্মান-ভালোবাসা লিও পাবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমরা বুঝি স্বাস্থ্যগত, আর্থিক, মৌসুম এখনো শুরু হয়নি, সবকিছু তাই কঠিন। কিন্তু আশা করি কোনো একদিন লিও মেসি বার্সা থেকে সে রকম ভালোবাসায় বিদায় পাবে, যেটা ওর প্রাপ্য।’

এমন বিদায় যে মেসিরও কোনোভাবেই চাওয়া ছিল না, সেটিও বারবার জানিয়ে দিলেন লাপোর্তা, ‘ক্লাবে থাকার জন্য সবকিছু করতে মেসির ইচ্ছাটা পরিষ্কার ছিল। সে জন্য ওর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা ভেবেছিলাম পাঁচ বছরের চুক্তি, বিলম্বিত বেতন...এসব এফএফপির মধ্যে এঁটে যাবে। আমরা (লিগের কাছ থেকে) আরেকটু নমনীয় ভাব আশা করেছিলাম। অন্য কোনো দেশে সেটা ঠিকই হতো, কিন্তু এখানে হয়নি।’

বাস্তবতা মেনে নিয়ে তাই লাপোর্তা বলছেন, ‘লিও অপ্রাপ্য কিছু নেই। বার্সার জন্য ওর ভালোবাসা সব সময়ই পরিষ্কার, বার্সা ও এই শহরে থাকতে ওর ইচ্ছা নিয়েও সংশয় নেই। আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছি, আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা ক্লাবের ভালোর জন্যই।’