প্রিয় ম্যারাডোনাকে এভাবে স্মরণ করলেন তেভেজ।
প্রিয় ম্যারাডোনাকে এভাবে স্মরণ করলেন তেভেজ। ছবি: রয়টার্স

ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা জানাতে গত সপ্তাহে অনন্য উদযাপন করেছিলেন লিওনেল মেসি। সেদিন ওসাসুনার বিপক্ষে ৪-০ গোলে জেতার পথে গোলের পর বার্সেলোনার জার্সি খুলে দেখিয়েছিলেন ভেতরে পরা নিওয়েলসের জার্সিটা। যে জার্সি পরে তাঁর প্রিয় ক্লাবে খেলতেন ম্যারাডোনা। এবার মেসির দেখানো পথেই হাঁটলেন কার্লোস তেভেজ। বোকা জুনিয়র্সের হয়ে গোল করে উদযাপন করেছেন একসময়ে ম্যারাডোনার দেওয়া জার্সি পরেই।

পরশু ম্যাচটি ছিল কোপা লিবার্তোদোরেসের শেষ ষোলোর লড়াই। সেখানে প্রথম লেগে ব্রাজিলের ইন্টারন্যাসিওনালকে একমাত্র গোলে হারিয়েছে বোকা জুনিয়র্স। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ওই গোল করেন তেভেজ।

আর্জেন্টিনার সাবেক ফরোয়ার্ড সতীর্থ এদুয়ার্দো সালভিওর ক্রস থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে আট গজ দূর থেকে করেন গোলটি। এরপরই বোকার জার্সি খুলে ফেলেন। কিন্তু তেভেজের গায়ে চাপানো ছিল আরও একটি জার্সি। যেটা বোকার পুরোনো এক জার্সি, এই জার্সি আবার ম্যারাডোনার কাছ থেকেই চেয়ে নিয়েছিলেন তেভেজ। ১৯৮১ সালে বোকার হয়ে খেলার সময় এই জার্সি পরেছিলেন ম্যারাডোনা। এটা পেতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছিলেন তেভেজ, ম্যারাডোনাকে বলতে গেলে এই জার্সির জন্য ‘জ্বালিয়েই মেরেছিলেন’।

বিজ্ঞাপন
default-image

ম্যাচের পর তেভেজ প্রিয় ম্যারাডোনাকে স্মরণ করে বলেন, ‘এটা ডিয়েগোর প্রতি আমার ছোট্ট একটা শ্রদ্ধাঞ্জলি। ১৯৮১ সালের এই জার্সি তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে এই সুখ উপহার দিতে পেরে খুবই আনন্দিত। নিশ্চিতভাবেই ওপর থেকে এটা দেখছেন।’

ম্যারাডোনার মৃত্যুতে এখনো শোক চলছে আর্জেন্টিনায়। কিন্তু এরই মধ্যে খেলতে হচ্ছে তেভেজদের। বিষয়টা মোটেও মানতে পারছেন না তেভেজ, ‘এটা খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা একটা কঠিন সপ্তাহ, যেখানে আমাদের আর্জেন্টিনার লিগ খেলতে হচ্ছে। আর্জেন্টাইন সমাজের জন্য এটা মোটেও ভালো সময় না। আমরা একজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে হারিয়েছি এবং এভাবে খেলাটা সহজ নয়। কিন্তু তারপরও আমরা ভালো করেছি।’

এই জয়ে একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছে গেল বোকা জুনিয়র্স। এর মানে আগামী সপ্তাহে ফিরতি লেগের ম্যাচে ড্র করলেই শেষ আটে পৌঁছে যাবে তারা। তেভেজ বলছিলেন, ‘আমাদের পথচলা এখনো শেষ হয়নি। আমরা জানি একটা বড় ধাপ পার হয়েছি, কিন্তু এখনো অনেক দূর আমাদের যেতে হবে।’

default-image

ম্যাচে জেতার চেয়ে ম্যারাডোনার জার্সি নিয়েই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তেভেজ। যে জার্সি ম্যারাডোনা দিয়েছিলেন, সেটাতে লেখা ছিল, ‘এটা তোমাকে ভালো খেলতে উৎসাহ দেবে। আমি জানতাম আমি একটা গোল করতে যাচ্ছি। আশা করি, আমরা তাঁকে কোপা লিবার্তোদোরেস উপহার দিতে পারব।’

এই জার্সি পরে বোকা জুনিয়র্সে ম্যারাডোনা খেলতেন ১৯৮১ সালে। ওই মৌসুমে রিভারকে এক ক্লাসিক ম্যাচে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল বোকা। এই জার্সি পরে যেন ম্যারাডোনার অস্তিত্বকে ছুঁতে পেরেছেন তেভেজ। আবেগময় কণ্ঠে বলছিলেন, ‘এই জার্সি পরার পর কেমন লাগে, সেটা বোঝানো খুব কঠিন। আমি এটা বলে বোঝাতে পারব না। এটা পরলে আমাকে ভালো খেলতেই হবে। কখনো খারাপ খেলতে পারব না। আমি এটা ম্যারাডোনার পরিবারকে উৎসর্গ করতে চেয়েছি। কারণ, আমি ওদের দুঃখ টের পাচ্ছি এবং মাঠে খুব সামান্য কিছুই করেছি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

এই জার্সি কেন পরেন, সেটা জানিয়েছেন তেভেজ, ‘এটা এমন কিছু, যা পরলে মনে হয় যে অন্য রকম একটা শক্তি পাচ্ছি আমি।’ এই জার্সি পেতে কতটা জ্বালাতন করেছেন ম্যারাডোনাকে, সেটাও বললেন, ‘এটা পেতে আমি তাঁকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতাম। আজ আমি এটা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ব্যবহার করছি। এমনভাবে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে, সেটা আমি কখনোই ভাবিনি। আজ আমার যেমনটা লাগছে, এমনটা এর আগে কখনোই লাগেনি।’

জার্সিটা পরার পরই যেন তেভেজ জেনে গিয়েছিলেন গোল করবেন এই ম্যাচে, ‘আমি জানতাম যে আমি আজ গোল করতে যাচ্ছি।’ এর আগে আরও একটা জার্সি ম্যারাডোনার কাছ থেকে পেয়েছিলেন তেভেজ। ১৯৯৫ সালে যেবার ম্যারাডোনা বোকায় ফিরলেন, সেবার কোলোনের বিপক্ষে ম্যাচে ওই জার্সি পরেছিলেন। তবে এবার এই জার্সি পরার অনুভূতি ছিল অসাধারণ, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ১৯৮১ সালের যে জার্সি তিনি দিয়েছিলেন, সেটাই আজ পরব। কারণ, যখন এটা পরি, তখন আমার শরীরের ভেতরে কী যেন হয়ে যায়। আমি সেটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। এই জার্সি, এই গল্প, সবকিছু...। আমি শান্ত থাকতে চেয়েছি, কারণ, আমি জানতাম আজ গোল করতে যাচ্ছি।’

default-image

প্রত্যেক আর্জেন্টাইনের মতোই তেভেজের কাছেও ম্যারাডোনা অনন্য, ‘ডিয়েগো আমাদের কাছে ঈশ্বর ছিলেন। আমি জানতাম আমি গোল করতে যাচ্ছি। এটা তিনি দেখবেন। কারণ, তিনি অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন। এই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল। আমি আশা করি, আমরা সেই আনন্দও (কোপা লিবার্তোদোরেস জয়) ডিয়েগোকে দিতে পারব, সাধারণ মানুষকে দিতে পারব। আজ আমরা খুব ভালো খেলেছি।’

জার্সি খুলে অবশ্য হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে তেভেজকে। কিন্তু এতে কিচ্ছু আসে–যায় না তেভেজের, ‘শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এটা করেছি। এরপর রেফারি আমাকে বলল, এটা তাঁকে করতেই হবে। তিনি তাঁর কাজ করেছেন এবং এটা সঠিকই ছিল। কিন্তু আমি নিশ্চিত ডিয়েগো ওপর থেকে আমাদের সবকিছু দেখেছেন এবং এসব দেখে হয়তো একটু হলেও হেসেছেন।’

মন্তব্য করুন