যেমন হতে পারে দুই দলের একাদশ

পুরো টুর্নামেন্টে ৪-২-৩-১ থেকে শুরু করে ৪-২-৪, ৪-৩-৩; এই তিন ছকেই মূলত খেলেছে ব্রাজিল। ছক যা–ই হোক না কেন, চারজন ডিফেন্ডারের সামনে তিতে দুজন রক্ষণ মনোযোগী মিডফিল্ডার রাখছেন। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের সেন্টারব্যাক এদের মিলিতাওকে খেলানো হলেও নকআউট পর্বের দুই ম্যাচে পিএসজির সাবেক দুই সতীর্থ মার্কিনিওস আর থিয়াগো সিলভার ওপরেই ভরসা রেখেছেন তিতে। ফাইনালেও হয়তো এর ব্যতিক্রম হবে না। দুই ফুলব্যাকের মধ্যে অপেক্ষাকৃতভাবে লেফটব্যাকই ওপরে উঠে আক্রমণে যোগ দিচ্ছেন বেশি, সেটা আতলেতিকোর রেনান লোদি হোক বা জুভেন্টাসের অ্যালেক্স সান্দ্রো। ডানে খেলতে পারেন দানিলো।

তিন মিডফিল্ডারের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের কাসেমিরো আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফ্রেডের জায়গা পাকা। কাসেমিরো পুরোদস্তুর রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার, রক্ষণ পর্যন্ত যেন বল না যেতে পারে, শ্যেনদৃষ্টিতে সেটা নিশ্চিত করাই তাঁর দায়িত্ব। ফ্রেড অবশ্য কাসেমিরোর মতো প্রথাগত রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার না হলেও আক্রমণাত্মক নন। টানা ৯০ মিনিট মাঠের কোনায় কোনায় প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করে তাঁদের ছন্দপতন ঘটানোই মূল লক্ষ্য ফ্রেডের।

এই দুজনের সঙ্গে যে মিডফিল্ডার খেলবেন, তাঁর মূল কাজ সৃষ্টিশীলতার। সামনে থাকা নেইমার কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে আক্রমণ করছেন, সেটা যিনি আগেই পড়ে ফেলতে পারেন। এ কাজে এই কোপায় বেশ ভালো করছেন করেছেন লিওঁর লুকাস পাকেতা। মাঝমাঠে পাকেতার উপস্থিতির ফলে মাঝমাঠের সঙ্গে আক্রমণভাগের একটা নিয়মিত যোগাযোগ থাকে, নেইমারের খেলায় যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

কোয়ার্টারে চিলির বিপক্ষে লাল কার্ড দেখা গ্যাব্রিয়েল জেসুস ফাইনালে নিষিদ্ধ। এখন এই জায়গায় পেরু ম্যাচের মতো এভেরতন সোয়ারেস খেলতে পারেন, সে ক্ষেত্রে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন নেইমার। নাহয় ওপরে অন্য স্ট্রাইকার খেলিয়ে পেছনে রিচার্লিসনের সঙ্গে নেইমারকে খেলানো হতে পারে। সেটা ফিরমিনো হতে পারেন, হতে পারেন গাব্রিয়েল বারবোসা।

ওদিকে তিতের মতো আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ছক নিয়ে অত বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন না। ৪-৩-৩ ছকেই খেলছে আর্জেন্টিনা। তবে এই ছকে নির্দিষ্ট ১১ জন খেলছেন না সব সময়। বলা যায়, এক মেসি (আর সেমিফাইনালের পর গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ) ছাড়া দলে কারোর জায়গাই নিশ্চিত নয়।

রক্ষণ নিশ্ছিদ্র করে প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলার জন্য যেমন কার্যকর ডিফেন্ডার ও রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার থাকার দরকার, তেমন সতীর্থ নেই মেসির। সেন্টারব্যাক ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর কথাই ধরুন, দুর্দান্ত খেলতে খেলতে হাঁটুর চোটে পড়লেন, ফাইনালেও খেলতে পারবেন কি না, ঠিক নেই। ফলে, ঘুরেফিরে নিকোলাস ওতামেন্দির ওপরেই আস্থা রাখবেন স্কালোনি। কিন্তু তাঁর বয়স হয়ে গেছে। ওতামেন্দির সঙ্গী হিসেবে ফিওরেন্তিনার জার্মান পেৎসায়াকে একাদশে নিচ্ছেন স্কালোনি। আধুনিক সেন্টারব্যাক হিসেবে পেৎসায়া কিংবা ওতামেন্দির চেয়ে আয়াক্সের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ঢের ভালো হলেও মূল একাদশে নিয়মিত নন।

রাইটব্যাক পজিশনে খেলছেন হয় মন্তিয়েল, নয় উদিনেসের নাহুয়েল মলিনা। গতিশীল উইঙ্গারদের সামলাতে দুজনকেই সমস্যায় পড়তে হয়। তাঁদের পাশে যদি অন্তত গতিশীল সেন্টারব্যাক থাকেন, এই সমস্যাটা কমে আসে অনেকাংশে। লেফটব্যাক হিসেবে মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য নিকোলাস তালিয়াফিকো আর মার্কোস আকুনিয়া লড়ছেন কোপাজুড়ে। তালিয়াফিকোর ফর্ম আগের মতো নেই, থাকলে এই সংশয় থাকত না স্কালোনির মনে। সেমিতেও আকুনিয়া পুরো ফিট ছিলেন না দেখেই তালিয়াফিকোর ওপর ভরসা রেখেছিলেন স্কালোনি।

ফাইনালে লেফট উইংয়ে কে খেলবেন, সেটার ওপর নির্ভর করবে লেফটব্যাক কে খেলবেন। তালিয়াফিকো সাবধানী খেলোয়াড়, রক্ষণে ভালো হলেও আক্রমণে অতটা নন। ওদিকে আকুনিয়া যন্ত্রের মতো আক্রমণ ও রক্ষণে ওঠানামা করতে পারেন। ফাইনালে যদি নিকোলাস গঞ্জালেসকে খেলানো হয়, তাহলে লেফটব্যাক হিসেবে আকুনিয়াকে নামাতে পারেন স্কালোনি।

এই ম্যাচে মেসিকে ব্রাজিলিয়ানরা কড়া মার্কিংয়ে রাখবেন। তাই তাঁর ওপর থেকে আক্রমণের ভার কমানোর জন্য গঞ্জালেসের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সৃষ্টিশীল পাপু গোমেজকে মাঠে নামাতে পারেন স্কালোনি, যিনি আবার গঞ্জালেসের মতো অতটা নিচে নেমে রক্ষণে সাহায্য করতে চান না। সে ক্ষেত্রে কপাল খুলে যেতে পারে তালিয়াফিকোর। মূল স্ট্রাইকার হিসেবে লাওতারো মার্তিনেজের জায়গা নিশ্চিত।

মাঝমাঠের তিনজনের মধ্যে রদ্রিগো দি পলের জায়গা নিশ্চিত। বাকি দুই জায়গার জন্য লড়াই হবে জোভান্নি লো সেলসো, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও গিদো রদ্রিগেজের মধ্যে। রক্ষণে বাড়তি নিরাপত্তা চাইলে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে গিদো রদ্রিগেজ খেলবেন। পারেদেস অবশ্য রদ্রিগেজের মতো প্রতিপক্ষের আক্রমণ আটকাতে পারেন না, তাঁর যাবতীয় মুনশিয়ানা পেছন থেকে আক্রমণ বানিয়ে দেওয়াতে। ওদিকে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য হয়তো খেলানো হতে পারে সো সেলসোকে।