আজ দাপটের সঙ্গে খেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ।
আজ দাপটের সঙ্গে খেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ।ছবি: এএফপি

ধারাভাষ্যকারের হতাশাটা নিরপেক্ষ দর্শকেরও টের পাওয়ার কথা।

‘গোলটা এত সুন্দর, বাতিল হচ্ছে ভেবে মন খারাপ হচ্ছে’—এই ধারাবিবরণীর সঙ্গে দ্বিমত করার লোক খুব কমই হবেন। গোলমুখে শট নিয়েছিলেন ইসকো। সে বল জালে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। গোলবারকে পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কো আসেনসিওর বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শরীর ঘোরানোর সময় ছিল না। সে চেষ্টাও করলেন না। দারুণ এক ব্যাক হিল করলেন। এইবার গোলরক্ষক বোকা বনে গেলেন। দুর্দান্ত এক গোল। কিন্তু ভিএআর দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল অফসাইডে ছিলেন আসেনসিও। বাতিল হলো সে গোল।

প্রথমার্ধে এটা ছিল রিয়ালের দ্বিতীয় বাতিল। এর আগেই বাতিল হয়েছে করিম বেনজেমার গোল। দুজনই তাঁদের দুঃখ ভুলেছেন পরে। দাপুটে ফুটবল দেখিয়ে এইবারকে ২-০ গোলে হারিয়ে লিগে আবার দুইয়ে উঠে এসেছে রিয়াল মাদ্রিদ। জয় নিশ্চিতের সঙ্গে এই সপ্তাহের লিভারপুল ও আগামী সপ্তাহের বার্সেলোনা ম্যাচের প্রস্তুতিটাও সেরে নিয়েছেন জিদান ও তাঁর দলবল।

বিজ্ঞাপন
default-image

গত কিছুদিন রিয়াল মাদ্রিদকে ৩-৫-২ ফরমেশনে খেলানোর চেষ্টা করছেন জিনেদিন জিদান। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি কাজে লাগানোর এই পদ্ধতিতে গত কিছুদিনে ভালো ফলও পেয়েছে রিয়াল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিরতির পর প্রথম ম্যাচে তেমন কিছু দেখা যাবে কি না সন্দেহ ছিল। দুটি কারণে, প্রথমত সপ্তাহের মাঝপথেই চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে লিভারপুলের সঙ্গে ম্যাচ রিয়ালের। দ্বিতীয়ত, দলে নতুন করে আবার চোটের আক্রমণ জিদানের হাতে একাদশ নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।

জিদান তবু তিন রক্ষণের ফরমেশন নিয়েই নেমেছেন। তাতেও দেখিয়েছেন চমক। চোটের কারণে এক মাসের জন্য ছিটকে গেছেন অধিনায়ক সের্হিও রামোস। এমন অবস্থায় রাফায়েল ভারানই দলের মূল রক্ষণ–ভরসা। কিন্তু লিভারপুল ও এরপরই বার্সেলোনার সঙ্গে ম্যাচের কথা চিন্তা করে জিদান তাঁর স্বদেশিকে নামাননি আজ। রামোসের অনুপস্থিতিতে এত দিন দায়িত্ব পালন করা নাচোর সঙ্গী হলেন এই মৌসুমেই রিয়ালের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে লাল খাওয়া ডিফেন্ডার হওয়ার কীর্তি গড়া এদের মিলিতাও। তাঁদের সঙ্গী হওয়ার জন্য লেফট ব্যাক ফারলাঁ মেন্দিকে সেন্টার ডিফেন্ডার বনতে হলো আজ।

মাঝমাঠে টনি ক্রুস চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তাঁকে একাদশে নামানোর সুযোগ ছিল না। জিদান তাই লুকা মদরিচ ও কাসেমিরোর দুই পাশে দুই উইং ব্যাক হিসেবে নামালেন লুকাস ভাসকেজ ও মার্সেলোতড। লেফট ব্যাক হিসেবে দলে জায়গা হারানো মার্সেলো উইং ব্যাক হিসেবে আজ ছিলেন দুর্দান্ত। ৪ মিনিটেই রিয়ালকে গোল উপহার দিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর থ্রু বল জালে পাঠিয়েছিলেন করিম বেনজেমা। কিন্তু সহকারী রেফারি জানান রিয়াল ফরোয়ার্ড অফসাইডে ছিলেন।

default-image

প্রথমার্ধে রিয়ালের খেলার বাকি অংশটুকু পুরোই আসেনসিওময়। মাঠের পজিশনে বেনজেমার পেছনে থাকলেও আক্রমণে এই উইঙ্গারই এগিয়ে ছিলেন। ২২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দুরূহ এক কোণে ফ্রি–কিক পেয়েছিল রিয়াল। এমন এক কোণ থেকে সাধারণত ক্রসই করা হয়। কিন্তু আসেনসিও গোলের চেষ্টা করলেন। তাঁর দারুণ শট গোলরক্ষককে কাবু করলেও ক্রসবারে লেগেছে।

৩৫ মিনিটে তো দারুণ সেই ব্যাকহিল। গোলের উদ্‌যাপন করেও ফেলেছিলেন আসেনসিও। কিন্তু ভাগ্যকে সঙ্গী পাচ্ছিলেন না কোনোভাবেই। ৪০ মিনিটে আর তাঁকে ফেরাতে পারেনি ভাগ্য। মাঝমাঠের একটু সামনে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেন কাসেমিরো। দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন আসেনসিওর দিকে। গায়ের সঙ্গে সেটে থাকা ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলে বক্সের সামনে চলে যান আসেনসিও। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে বক্সে ঢোকার আগেই শট নিয়েছেন আসেনসিও। অবশেষে গোল করে সে গোলের উদ্‌যাপন নিয়ে চিন্তা করতে হলো না রিয়ালকে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আসেনসিওই রিয়ালের হয়ে প্রথম গোলের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। ৫২ মিনিটে তাঁর শট দারুণ এক সেভে বাঁচিয়েছেন দিমিত্রোভিচ।

বিজ্ঞাপন
default-image

একটু পরই লিভারপুল ম্যাচের কথা মাথায় রেখে মদরিচ ও আসেনসিওকে তুলে নেন জিদান। মাঠে নামেন ক্রুস ও রদ্রিগো। তখনই ম্যাচে ফেরার সবচেয়ে ভালো সুযোগ এসেছিল এইবারের সামনে। বেশ দূর থেকে থিবো কোর্তোয়ার কাছে ব্যাক পাস দিয়েছিলেন ভাসকেজ। তীব্র বৃষ্টি বা বাতাসের কারণে বলের গতি বুঝতে ভুল করেন এই গোলকিপার। শেষ মুহূর্তে পা লাগিয়ে কোনোমতে আত্মঘাতী গোল খাওয়া থেকে দলকে রক্ষা করেছেন কোর্তোয়া।

৭০ মিনিটে ইসকো ও মার্সেলোকেও তুলে নেন জিদান। লিভারপুল ম্যাচের আগে ম্যাচ প্র্যাকটিসের সুযোগ করে দিতে মাঠে নামান ভিনিসিয়ুসকে। ৭০ মিনিটে গোল বাতিলের হ্যাটট্রিক হয়ে গেল রিয়ালের। বক্সের বাইরে থেকে গোল করেছিলেন কাসেমিরো। কিন্তু বল তাঁর পায়ে আসার আগে যে আক্রমণ হয়েছিল তাতে অফসাইডে ছিলেন সের্হিও আরিবাস।

default-image

দুই মিনিট পরই অবশ্য সে দুঃখ ভুলেছে রিয়াল। বাঁ প্রান্তে দুর্দান্ত গতিতে ছুটে উঠে গিয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস। বক্সের ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে ক্রস করেছিলেন গোলের সামনে। সেখান থেকে হেডে লিগে নিজের ১৮তম গোল বুঝে নিয়েছেন বেনজেমা। ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতে বেনজেমাকেও তুলে নেন জিদান। বাকি সময়টা গোল রক্ষাতেই মন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রদ্রিগো, মারিয়ানো, আরিবাস ও ভিনিসিয়ুস কোচের কাছে নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। বেশ কয়েকটি ভালো আক্রমণ হলেও গোল করার দক্ষতা দেখাতে পারেননি কেউ। এর মধ্যে যোগ করা সময়ে একটি আক্রমণে ‘পাস দেব না গোল করব’—সে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় গোল করতে পারেননি ভিনিসিয়ুস।

ব্যবধান বাড়াতে না পারার হতাশার চেয়ে জিদান এ ম্যাচ থেকে সম্ভাব্য সবকিছু পাওয়ার দিকেই মন দেবেন। প্রায় নতুন চেহারার এক রক্ষণ নিয়েও গোল না খাওয়া এবং বেনজেমা ছাড়াও অন্য কোনো খেলোয়াড়ের গোল করতে পারা তো জিদানের জন্য সুখবরই বটে।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন