বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে দিন কয়েক আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলেছে পিএসজি।
বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে দিন কয়েক আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলেছে পিএসজি। ছবি: টুইটার

ইউরোপের ফুটবলে বোমা হয়ে এসেছে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের খবরটা। ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালির ১২টি ক্লাব একসঙ্গে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা উয়েফার বাইরে গিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ইউরোপা লিগের বদলে অন্য একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে।

ইউরোপের কূলীন সব ক্লাব আছে সেখানে! রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ আছে স্পেন থেকে। ইংল্যান্ড থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি, আর্সেনাল ও টটেনহাম। আর ইতালি থেকে বিদ্রোহীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছে জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান ও এসি মিলান।

এমন কিছু হবে তা অনেক আগে থেকেই গুঞ্জনে ছিল। হলোও। কিন্তু গুঞ্জনে এই ক্লাবগুলোর সঙ্গে আরও দুটি বড় নামও জড়িয়ে ছিল। জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ আর ফ্রান্সের পিএসজিও এই বিদ্রোহী লিগে থাকবে বলে অনুমান ছিল। কিন্তু তারা না যাওয়াই বরং যেন উল্টো চমক হয়ে এল। কেন সুপার লিগে যাচ্ছে না ক্লাব দুটি? সে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে স্প্যানিশ দৈনিক মার্কা।

বিজ্ঞাপন

এখানে অবশ্য একটা ব্যাপার হয়তো পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। এই দুটি ক্লাব এখন পর্যন্ত যায়নি, কিন্তু এরপর যে ক্লাব দুটির লিগে যোগ দেওয়ার ঘোষণা আসবে না, সে নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না। তা পরেরটা পরের ব্যাপার। আপাতত বিশ্লেষণ বায়ার্ন-পিএসজির সুপার লিগে না যাওয়া নিয়ে! এর সঙ্গে যোগ করে নেওয়া যায় বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের নামও।

default-image

সুপার লিগ শেষ পর্যন্ত ২০ দল নিয়ে আয়োজিত হবে। সেখানে ‘প্রতিষ্ঠাতা’র ভূমিকায় বর্তমান ১২ দলের পাশাপাশি আরও তিনটি ক্লাব যোগ দেওয়ার কথা। এর বাইরে ‘অতিথি’ ৫টি ক্লাব মিলিয়ে টুর্নামেন্টটা আয়োজিত হবে। সেখানে বায়ার্ন-পিএসজি-ডর্টমুন্ডকে নিয়েই প্রতিষ্ঠাতা ১৫ দলের তালিকা শেষ হবে, এমন ধারণা থাকলেও তা হয়নি এখন পর্যন্ত।

মার্কা লিখেছে, এই তিনটি ক্লাব এখন আরও ‘বিস্তৃত ও কম কূলীন দল নিয়ে আয়োজিত হতে যাওয়া’ চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতেই আগ্রহী। সুপার লিগের হুমকির মুখে চ্যাম্পিয়নস লিগে আরও সংস্কারের ঘোষণা আজ দিয়েছে উয়েফা। বেশি ম্যাচ, বড় দলগুলোর জন্য আরও বেশি অর্থের হাতছানি আছে সেখানে। পিএসজি-বায়ার্ন সেদিকেই আগ্রহী।

পিএসজির সুপার লিগে না যাওয়ার পেছনে অবশ্য এর চেয়েও প্যাঁচানো আরও ঘটনার রেশ আছে। বলতে গেলে পিএসজির মালিক নাসের আল-খেলাইফি পড়ে গেছেন প্যাঁচে। একদিকে সুপার লিগে যাওয়া দলগুলোর সঙ্গে তাঁর বেশ ভালো সম্পর্ক। অন্যদিকে বেশ ভালো সম্পর্ক আছে ফরাসি লিগ আঁর আয়োজক কর্তৃপক্ষ আর ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে। ফরাসি লিগের টিভি স্বত্ত্বেও তাঁর মালিকানা আছে। অন্যদিকে পিএসজির মালিক প্রতিষ্ঠান কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট-এর (কিউএসআই) সঙ্গে ফরাসি সরকারের সম্পর্ক দারুণ। সেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আজ এই সুপার লিগের বিরোধিতা করেছেন। নাসের আল-খেলাইফি এখন যাবেন কোথায়!

default-image

ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যমেও তাই আলোচনা, যে পিএসজি এই সুপার লিগের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাবগুলোর একটি হবে বলে এতদিন ‘ওপেন সিক্রেট’ ছিল ইউরোপের ফুটবলে, সেই পিএসজিই কেন হঠাৎ এভাবে ইউ-টার্ন নিয়েছে?

মার্কা লিখেছে, এখানে মনে রাখা দরকার যে, আল-খেলাইফির মালিকানাধীন সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠান বি-ইন স্পোর্টসের সঙ্গে উয়েফার চুক্তি আছে, যে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সাল পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ সম্প্রচার করবে বি-ইন স্পোর্টস।

মার্কার হিসাবে, পিএসজির এই সুপার লিগে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে জড়িয়ে যাচ্ছে ২০২২ সালে কাতারে হতে যাওয়া বিশ্বকাপের প্রসঙ্গও। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ২০২২ বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম নির্মাণে কর্মরত শ্রমিকদের মৃত্যুর হিসাবের কারণে সমালোচিত কাতার। সেখানে ২০২২ বিশ্বকাপ হওয়া নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। কিন্তু এসবের মধ্যেই ফ্রান্স সরকার কাতারের পাশে সব সময় থেকেছে বলে জানাচ্ছে স্প্যানিশ দৈনিক মার্কা। কাতারের ভাবমূর্তি বিশ্বে আরও ভালো করতে সাহায্য করেছে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি বিশ্বকাপ নিয়ে ফিফার সঙ্গেও কাতারের সম্পর্কের হিসাব আছে। ২০২২ বিশ্বকাপ কাতারের মতো বৈরি আবহাওয়ার দেশে হওয়া নিয়ে বিতর্ক তো শুরু থেকেই আছে, এর সঙ্গে মানবাধিকারের বিতর্ক মিলিয়ে কাতার বিশ্ব ফুটবলে ছিল নাজুক অবস্থানে। কিন্তু ফিফা সব সময়ই কাতারের পাশে থেকেছে। এদিকে কাতারের ভাবমূর্তি বাড়ানোর একটা বড় উপায় ছিল পিএসজি। নেইমার আর কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকাদের কোটি কোটি ইউরো ব্যয়ে পিএসজিতে নিয়ে যাওয়ার পেছনেও কাতারের ভাবমূর্তি বাড়ানোর ব্যাপার জড়িত বলে অনেকের ধারণা। সেই পিএসজি সুপার লিগে গেলে ফিফার সঙ্গে কাতারের সম্পর্কেও টান লাগতে পারে, এমনই ইঙ্গিত মার্কার।

default-image

আল-খেলাইফি আবার উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্য। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দর সেফেরিনের সঙ্গে তাঁর দারুণ সম্পর্ক। কাল থেকে গুঞ্জন চলছে, বিদ্রোহী লিগে যাওয়ার কারণে ইউরোপের ক্লাবগুলোর সংগঠন (ইসিএ) থেকে জুভেন্টাসের সভাপতি আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লিসহ আরও অনেকে পদত্যাগ করছেন।

কিন্তু এ নিয়ে এখন পিএসজি পড়েছে উভয় সংকটে। কারণে সুপার লিগে না যাওয়ার যেখানে এত সুবিধা, সেগুলো পেতে গিয়ে যাওয়ার সুবিধাগুলোও তো হারাতে হচ্ছে পিএসজিকে। প্যারিসের ক্লাবটি জানে, সুপার লিগে না যাওয়া মানে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর কেউ প্যারিসে যাবে না। পিএসজির আয়ও কমবে। পিএসজি নেইমার-এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এ তো গেল পিএসজির ব্যাপার, আর বায়ার্ন কেন যায়নি? তাদের কারণটা ভিন্ন। জার্মানিতে ক্লাবগুলো শুরু থেকেই সুপার লিগের বিরোধিতা করেছে বলে জানাচ্ছে মার্কা। ডর্টমুন্ডের প্রধান নির্বাহী হান্স-ইওয়াখিম ওয়াটজকেও আজ সকালে জানিয়েছেন, তাঁরা সুপার লিগের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। বায়ার্নের সুপার লিগে না যাওয়ার কারণও এমনই বলে ধারণা মার্কার!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন