রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত হ্যাজার্ডের

রিয়াল-ক্যারিয়ারটা এভাবে শুরু হয়েছিল হ্যাজার্ডেরছবি: টুইটার

গতকাল রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ঘুরছে। স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতার পর রিয়াল মাদ্রিদ স্কোয়াডের সবাই মিলে ছবি তুলছেন। সেখানে প্রায় সবার মুখেই হাসি, শুধু এডেন হ্যাজার্ডের মুখই কালো। ফাইনালে না খেলা দানি সেবায়োস, এমনকি ফাইনালের স্কোয়াডে না থাকা ভায়েহোরাও হাসছেন, কিন্তু হ্যাজার্ডের মুখে নেই তার কোনো ছাপ। ইএসপিএন তো আরেক ছবি দিয়ে দাবি করে বসল, বিরক্ত হ্যাজার্ড নাকি গলায় বিজয়ীর মেডেলও পরেননি।

ইএসপিএনের সে টুইট মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ম্যাচের পর ম্যাচ বেঞ্চে বসে থেকে হ্যাজার্ড যে বিরক্ত, সে তথ্য মিথ্যা হয়ে যায়নি। আরএমসি স্পোর্তের বেলজিয়ান দলের প্রতিবেদক দাবি করেছেন, রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন হ্যাজার্ড।

কাল রিয়ালের হয়ে তৃতীয় শিরোপা জিতেছেন হ্যাজার্ড
ছবি: টুইটার

২০১৯ সালে হ্যাজার্ডকে পেতে রিয়াল মাদ্রিদ আসলে কত খরচ করেছে, সেটা এখনো পরিষ্কার জানা যায়নি। দলবদলের সময়ে বলা হয়েছিল, চেলসিকে ১০ কোটি ইউরো দিচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ। চুক্তির মাত্র এক বছর বাকি এমন খেলোয়াড়ের জন্য অঙ্কটা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। যদিও পরে যেসব তথ্য এসেছে, তা অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষে এই দলবদলের জন্য রিয়াল নাকি সব মিলিয়ে ১৫ কোটি ইউরোও খরচ করতে রাজি হয়েছে।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে তবু এই দলবদল নিয়ে আপত্তি তোলেননি রিয়ালের কোনো সমর্থক। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিদায় নেওয়ার পর ২০১৮–১৯ মৌসুমে যে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল রিয়াল, তাতে বড় একজন তারকার দলে যোগ দেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল। আর ২০১৮ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলা হ্যাজার্ড পরের এক বছর সে ফর্ম ধরে রেখেছে তখন নিজের সেরা সময়ে। হ্যাজার্ডকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন ৫০ হাজারের বেশি সমর্থক। রিয়ালের ইতিহাসে শুধু আর একজন খেলোয়াড়কে আমন্ত্রণ জানাতে এর চেয়ে বেশি সমর্থক হাজির হয়েছিলেন, তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

কিন্তু পরের আড়াই বছর রিয়াল মাদ্রিদ ও দলের সমর্থকদের শুধু হতাশই করেছেন। যেই জিনেদিন জিদান ২০১২ সাল থেকে হ্যাজার্ডকে রিয়ালে আনার চেষ্টা করেছেন, তাঁর অধীনও আলো ছড়াতে পারেননি বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড। এর সঙ্গে চোট মিলিয়ে আড়াই বছরে মাত্র ৫৯ ম্যাচে তাঁকে পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচগুলোতে তাঁর গোল মাত্র ৫টি।

হ্যাজার্ড কখনোই গোল করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন না। কিন্তু প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে অন্যদের গোল বানিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর তুলনীয় খুব কমই ছিল। সে কাজও রিয়ালে খুব কম করেছেন—মাত্র ১০ বার। শুধু নিজের প্রথম মৌসুমে মাঝে এক মাস বেনজেমার সঙ্গে তাঁর রসায়ন আশা জাগিয়েছিল রিয়ালের। কিন্তু পিএসজির বিপক্ষে রিয়াল ক্যারিয়ারে নিজের সেরা ম্যাচেই চোট পেয়ে সেই যে ছিটকে গেলেন, এরপর আর ‘বিশ্বসেরাদের কাতারে থাকা হ্যাজার্ডে’র দেখা মেলেনি।

বেনজেমা-হ্যাজার্ডের জুটি নিয়ে অনেক আশা ছিল রিয়ালের
ছবি: টুইটার

এ মৌসুমে অবশেষে বেশ কিছুদিন ধরে হ্যাজার্ডকে সুস্থ পাচ্ছেন নতুন কোচ আনচেলত্তি। কিন্তু এর আগেই যে নিজের কৌশল বদলে ফেলেছেন আনচেলত্তি। মৌসুমের শুরুতে হ্যাজার্ড-বেনজেমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করা এই কোচ বাধ্য হয়েই ভিনিসিয়ুস-বেনজেমা জুটি গড়েছেন। সে জুটি তাঁকে লিগে শীর্ষে তুলে এনেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগেও গ্রুপসেরা করেছে। স্প্যানিশ সুপার কাপে বার্সেলোনার সঙ্গেও গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস-বেনজেমা।

গতকাল ফাইনালে তাই হ্যাজার্ডকে নামাননি আনচেলত্তি। এমনকি জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরও বদলি নামাননি হ্যাজার্ডকে। গতকাল তাই বেলজিয়ান উইঙ্গারের রাগের কারণ ছিল। এরপরই আরএমসি স্পোর্তের সাংবাদিক সাশা তাভোলিয়েরি বলেছেন, হ্যাজার্ড রিয়াল ছাড়তে চান। কবে ছাড়তে চান, সেটা নিশ্চিতভাবে বলেননি এই সাংবাদিক। তবে জানুয়ারির দলবদলের মাঝামাঝি সময়ে এমন খবর ছড়িয়ে দেওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব দলবদল করতে চান হ্যাজার্ড।

ইস্কো ও নাচোর (মাঝে) মতোই আনচেলত্তির পরিকল্পনায় নেই হ্যাজার্ড
ছবি: রয়টার্স

দলের সবচেয়ে বেশি বেতনভোগী দুই খেলোয়াড়ের একজন হ্যাজার্ড। বাকিজন গ্যারেথ বেলও তিন বছর ধরে দলে কোনো অবদান রাখছেন না। চোট আর ফর্মহীনতা তাঁকেও রিয়ালের জন্য বোঝা বানিয়ে দিয়েছে। বেলের সঙ্গী আগামী জুনেই চুক্তি শেষ হয়ে যাবে বলে স্বস্তি খুঁজে নিতে পারছে রিয়াল। কিন্তু হ্যাজার্ডের ক্ষেত্রে সেটাও পাচ্ছ না তারা। রিয়ালের সঙ্গে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হ্যাজার্ড। এ অবস্থায় হ্যাজার্ডের জন্য কোনো দল যেকোনো মূল্যের প্রস্তাব পাঠালেই রাজি হয়ে যাবে রিয়াল—স্প্যানিশ মিডিয়ায় এমন দাবিই উঠেছে।

বছরে বেতন ও অ্যামর্টাইজেশন খরচ বাবদ হ্যাজার্ডের পেছনে রিয়ালের খরচ প্রায় ৫ কোটি ইউরো। আরও আড়াই বছর এ খরচের হাত থেকে বেঁচে যাওয়াকেই বড় লাভ বলে মানছে দলটি। ২০১৯ সালে গ্যারেথ বেলকে বিনা মূল্যে যেতে না দিয়ে যে ভুল করেছিলেন রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ, সেটা এবার আর করতে রাজি নন। কারণ, বেল-হ্যাজার্ডের বেতনের খরচ বাঁচিয়ে নাকি কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হরলান্ডের পেছনে ব্যয় করার ইচ্ছা তাঁর।