২০২১ সালে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন লিওনেল মেসি।
২০২১ সালে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন লিওনেল মেসি।ছবি: রয়টার্স

সে ম্যাচটাতে বার্সেলোনার জিতলে তো কথাই ছিল না, ড্র করলেও হতো। এমনকি হারলেও ব্যবধানটা দুই গোলের বেশি না হলেই ঝামেলা হতো না। গত ডিসেম্বরে যখন চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জুভেন্টাসের মুখোমুখি হয়েছিল লিওনেল মেসির বার্সা, গ্রুপ শীর্ষে থেকে শেষ ষোলোতে যেতে এ-ই ছিল মেসির বার্সার সামনে সমীকরণ।

কিন্তু সমীকরণটা মেলাতে পারেনি বার্সা। নিজেদের মাঠ ক্যাম্প ন্যু-তে জুভেন্টাসের কাছে হেরে যায় ৩-০ গোলে। পেনাল্টি থেকে রোনালদো জোড়া গোল করেন, মেসি ছিলেন সেদিন অনুজ্জ্বল। যেন দর্শক হয়ে রোনালদোর উল্লাস দেখেছেন।

রোনালদোর সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাওয়া তো বটেই, সেই হারটা মেসির বার্সার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্নে আরেক বড় বাধার মুখোমুখি করে দিয়েছে। গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় শেষ ১৬-তে বড় দলের মুখোমুখি হতেই হতো বার্সাকে, ড্র কাতালানদের দাঁড় করিয়ে দিল নেইমার-এমবাপ্পের পিএসজির সামনে!

কিন্তু দুই মাস আগে-পরের দুই ম্যাচের মধ্যে বার্সা আর মেসি কি একই আছেন? স্প্যানিশ দৈনিক ‘মার্কা’র বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন বলছে, উত্তরটা  ‘না’।

বার্সা যে ছন্দে ফিরেছে, মেসি যে স্বরূপে ফিরেছেন, সেটি মার্কার না বললেও চলে। সেটি বুঝতে ফুটবলের ‘আইনস্টাইন’ও হতে হয় না। সে জন্য সাদাচোখই যথেষ্ট।  

জুভেন্টাসের মুখোমুখি যখন হয়েছিল বার্সা, রোনাল্ড কোমানের অধীনে চার-পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তখনো ডাচ কোচের কৌশলটা রপ্ত করতে পারেননি খেলোয়াড়েরা। কিংবা এভাবে বলা যেতে পারে, খেলোয়াড়দের না বুঝেই কৌশল চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন কোমান। ফলটা মাঠে বার্সার পারফরম্যান্স আর লিগের পয়েন্ট তালিকাই বলে দিচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন
default-image

এভাবে বোঝানো যায়, রোনালদোর জুভের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটিতে বার্সা নামার সময় যদি স্প্যানিশ লিগের এই মৌসুমের শেষ টেনে দেওয়া হতো, পয়েন্ট তালিকার হিসাবে বার্সা চ্যাম্পিয়নস লিগে তো নয়ই, ইউরোপা লিগেও খেলার সুযোগ পেত না। সেভিয়া, রিয়াল মাদ্রিদ আর আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে পয়েন্ট হারিয়েছে বার্সা। সেগুলোকে যদি ‘বড় দলের বিপক্ষে পয়েন্ট হারাতেই পারে’ ধরে নেন, সে ক্ষেত্রে সে সময় পর্যন্ত কাদিজ, হেতাফে, আলাভেসের মতো ‘পুঁচকে’ দলগুলোর বিপক্ষে বার্সার হারগুলো মুখ বাঁকিয়ে হাসবে!

বার্সা-ভক্তদের এর চেয়েও বেশি হতাশা ঘিরে ধরেছিল হয়তো মেসির ফর্ম দেখে। গ্রীষ্মে বার্সা ছাড়তে চেয়েও চুক্তির জটিলতায় পারেননি আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। ক্লাবের সে সময়কার সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে ভালো নয়, সেটি অনেকটা প্রকাশ্যই হয়ে পড়েছিল। বার্তোমেউ পদত্যাগ করার পর বার্সার আপৎকালীন দায়িত্বে আসা কার্লেস তুসকেতসও এসেই বলেন, বার্সার উচিত ছিল মেসিকে আগস্টে বিক্রি করে দেওয়া। স্প্যানিশ ফুটবলে অনেকেই তুসকেতসকে বার্তোমেউর পক্ষের লোক হিসেবেই দেখেন। সে ক্ষেত্রে তুসকেতসের সঙ্গেও মেসির সম্পর্ক কেমন হবে, তা বুঝে নেওয়াই যায়। মেসি নিজেও ডিসেম্বরে লা সেক্সতা টিভির সাংবাদিক জর্দি ইভোলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গ্রীষ্মে ওই দল ছাড়তে চাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা আর বার্তোমেউর নাটক মৌসুমের শুরুতে তাঁর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে।

বার্সার চিরাচরিত ৪-৩-৩ ছেড়ে কোমানের ৪-২-৩-১ ছকে খেলানোর কৌশলও অবশ্য বার্সা ও মেসির এই ভোগার একটা বড় কারণ ছিল। কাগজে-কলমে কোমানের ছক বার্সার জন্য ভালো হবে মনে হলেও দুই উইংয়ে খেলার মতো গতিশীল উইঙ্গার তখন বার্সার ছিল না।

কেমন প্রভাব? কিছু সংখ্যা বোঝাবে সেটি। জুভেন্টাসের বিপক্ষে ডিসেম্বরের ম্যাচের আগে মৌসুমে ১৪ ম্যাচে ৭ গোল করেছিলেন মেসি। সংখ্যাটা মোটেও খারাপ ফর্ম বোঝায় না। কিন্তু যখন শুনবেন এই ৭ গোলের ৫টিই মেসি করেছিলেন পেনাল্টি থেকে, আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের ধুঁকতে থাকার চিত্রটা বোঝা যাবে।

বার্সার চিরাচরিত ৪-৩-৩ ছেড়ে কোমানের ৪-২-৩-১ ছকে খেলানোর কৌশলও অবশ্য বার্সা ও মেসির এই ভোগার একটা বড় কারণ ছিল। কাগজে-কলমে কোমানের ছক বার্সার জন্য ভালো হবে মনে হলেও দুই উইংয়ে খেলার মতো গতিশীল উইঙ্গার তখন বার্সার ছিল না। ওসমান দেম্বেলে চোটে ছিলেন, তরুণ আনসু ফাতি মৌসুমের শুরুতে আলো ছড়ালেও পরে চোটে পড়েন, কোমানকে তাই তখন আঁতোয়ান গ্রিজমান আর মার্টিন ব্রাথওয়েইটকে খেলাতে হচ্ছিল দুই উইংয়ে। গ্রিজমানও তখন ছন্দে ছিলেন না। মেসির সঙ্গে গ্রিজমানের রসায়নও তখন জমেনি। সব মিলিয়েই বার্সা তখন ছিল ছন্নছাড়া।

কিন্তু বড়দিন আর নববর্ষের ছুটি কাটিয়ে জানুয়ারি আসতেই যেন গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে বার্সা। ডিসেম্বরে লা সেক্সতায় ওই সাক্ষাৎকারে মেসি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যত যা-ই হোক, জুনে বার্সার সঙ্গে তাঁর চুক্তি শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো ক্লাবের সঙ্গে তিনি দলবদলের আলোচনায় জড়াবেন না। পাশাপাশি জুন পর্যন্ত বার্সার হয়ে সব শিরোপা জিততে আগের মতোই ঝাঁপাবেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

ঝাঁপিয়েছেন বটে মেসি। কোমানও এর মধ্যে কৌশল বদলে ৪-৩-৩ ছকে ফিরেছেন। চোট কাটিয়ে দেম্বেলে ফেরায় বার্সার উইং গতি পেয়েছে। গ্রিজমানের খেলার জায়গা বদল হওয়ায় গ্রিজমানও আলো ছড়াচ্ছেন। মেসি-গ্রিজমানের রসায়ন জমছে বেশ। সব মিলিয়ে বার্সা ছন্দে আছে। লিগে সর্বশেষ ৩৬ পয়েন্টের মধ্যে ৩২টিই পেয়েছে। সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে সর্বশেষ ১৮ ম্যাচে বার্সার ১৪ জয়, ২ ড্র। বাকি দুই ম্যাচে হার অবশ্য বার্সাকে ভোগাচ্ছে। একটি স্প্যানিশ সুপারকোপার ফাইনালে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে, অন্যটি গত সপ্তাহে কোপা দেল রে-র সেমিফাইনালের প্রথম লেগে সেভিয়ার বিপক্ষে। প্রথম হারে একটা শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে, দ্বিতীয় হারটিতে আরেক শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা।

তবু গত কয়েক ম্যাচে মাঠে বার্সার ফুটবলে প্রাণ ফিরেছে, এটিই হয়তো বার্সা সমর্থকদের পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে আশাবাদী করবে। তার চেয়ে বেশি আশাবাদী করবে এটি, মেসি এখন মাঠে হাসতে পারছেন। গোলও করছেন। সর্বশেষ ১৪ ম্যাচে ১২ গোল আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের। তা-ও কী ধরনের গোল? পেনাল্টি তো তিনিই নেন, তবে এখন গোলের জন্য শুধু পেনাল্টির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে না মেসিকে। লিগে বিলবাওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে গোল করেছেন, সর্বশেষ ম্যাচে আলাভেসের বিপক্ষে বক্সের বাইরে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে তাঁর বাঁ পায়ের দারুণ বাঁকানো শটও মুগ্ধ করেছে। বেতিসের বিপক্ষে বদলি নেমে খেলাই বদলে দিয়েছেন, গোল করে খেলা গড়ে দিয়ে হারের মুখ থেকে বার্সাকে জিতিয়েছেন।

চোটে নেইমার নেই—পিএসজির জন্য এটি দুঃসংবাদ। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড আর মেসির বন্ধুত্বের কারণে হয়তো দুজনে এই ম্যাচটা নিয়ে অনেক মজাও করেছেন নিজেদের মধ্যে, নেইমারের চোট মেসি আর নেইমার দুজনকেই এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করল বটে। তবে বার্সার দিক থেকে নেইমারের না থাকাটা সুবিধাজনক। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়ে মেসির চেনা রূপে ফেরা তো আছেই!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন