নিজের ক্যারিয়ারের কালো দিকটি এক পডকাস্টে বলেছেন টম ব্রিউয়িট।
নিজের ক্যারিয়ারের কালো দিকটি এক পডকাস্টে বলেছেন টম ব্রিউয়িট। ছবি: টুইটার
ঘটনাটা ২০১৫-১৬ মৌসুমে, ইয়ুর্গেন ক্লপ তখন কিছুদিন হলো লিভারপুলের কোচ হয়ে এসেছেন। জানুয়ারিতে এফএ কাপে এক্সেটারের বিপক্ষে ম্যাচের আগে লিভারপুলের বেশ কজন সেন্টারব্যাক তখন চোটে। লিভারপুলে জন্ম নেওয়া ব্রিউয়িটের তখন মনে হয়েছিল, লিভারপুলের হয়ে তাঁর অভিষেক তখন ‘কপালের লিখন।’

বার্সেলোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ, লিভারপুল কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, এসি মিলান কিংবা জুভেন্টাস...ছোটবেলা থেকেই বড় কোনো ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠে নামার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠে কত ফুটবলার! কারও কারও আবার বড় ক্লাব নয়, হয়তো নিজের এলাকার ক্লাবটার জার্সিতে দারুণ কিছু করাই থাকে স্বপ্ন। কিন্তু সে স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে এভাবে অন্যের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেন কেউ? যেমনটা করেছেন টম ব্রিউয়িট।
লিভারপুলের একাডেমিতে ছিলেন বর্তমানে ২৩ বছর বয়সী ইংলিশ ডিফেন্ডার। লিভারপুলের মূল দলের জার্সিতে খেলার স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে এতটাই লোভে পড়ে গেলেন যে, ‘সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী’ হয়ে দাঁড়ানো একাডেমির আরেক খেলোয়াড়কে জঘন্য ট্যাকল করে চোটে ফেলেছেন, চেষ্টা করেছেন তাঁর স্বপ্নপূরণের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার!

ঘটনাটা ২০১৫-১৬ মৌসুমে, ইয়ুর্গেন ক্লপ তখন কিছুদিন হলো লিভারপুলের কোচ হয়ে এসেছেন। জানুয়ারিতে এফএ কাপে এক্সেটারের বিপক্ষে ম্যাচের আগে লিভারপুলের বেশ কজন সেন্টারব্যাক তখন চোটে। একাডেমি থেকে কোনো সেন্টারব্যাককে যোগ্য মনে হলে ক্লপ তাঁকে মূল দলে খেলাতে পারেন, এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। লিভারপুলে জন্ম নেওয়া ব্রিউয়িটের তখন মনে হয়েছিল, লিভারপুলের হয়ে তাঁর অভিষেক তখন ‘কপালের লিখন।’ সে পথে শুধু তখন তাঁর একটাই বাধা—একাডেমির আরেক ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল ক্লিয়ারি।

বিজ্ঞাপন

‘এটার জন্য (লিভারপুলের হয়ে খেলা) যা করার দরকার হতো, তা-ই করতে রাজি ছিলাম আমি। সে জন্য যদি কাউকে আঘাত করতে হতো, কোনো সম্পর্কের শেষ টেনে দিতে হতো, তা-ই করতাম। আমি শুধু লিভারপুলের হয়ে খেলার জন্য মরিয়া হয়ে ছিলাম, শুধু এটাই মাথায় ঘুরছিল’—ফুটবল জার্নিস পডকাস্টে ঘটনাটা জানানোর সময়ে বলছিলেন ব্রিউয়িট।
বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট এফএ ইয়ুথ কাপে লিভারপুলের অধিনায়ক ছিলেন ব্রিউয়িট। বলছিলেন, ওই ঘটনার পর ক্লিয়ারির সঙ্গে তাঁর মিটমাট হয়ে গেছে, তবে দুজনের সম্পর্কটা আর বন্ধুত্বের নেই। তবে এফএ কাপের সে ম্যাচে ব্রিউয়িটের খেলা হয়নি। হবে কোত্থেকে! ক্লপ যে এরই মধ্যে ওই ম্যাচের জন্য লেফটব্যাক হোসে এনরিকেকে সেন্টারব্যাকে খেলানোর পরিকল্পনা করেছেন, অ্যাস্টন ভিলায় ধারে খেলতে যাওয়া সেন্টারব্যাক থিয়াগো ইলোরিকে ধার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন! হয়তো একাডেমির কাউকে তখনই মূল দলে ডাকার মতো মনে হয়নি ক্লপের। কিন্তু ব্রিউয়িট ওসব জানতেন না। তাঁর মস্তিষ্কের সবটুকু যেন তখন আচ্ছন্ন যেকোনোভাবে লিভারপুলের জার্সি গায়ে চাপানোর লোভে।

default-image

কিন্তু সে জন্য যে সিদ্ধান্তটা নিলেন, এর চেয়ে জঘন্য হয়তো খুব বেশি কিছু হয় না। অনুশীলনে সতীর্থ ক্লিয়ারিকে চোটে ফেলার উপায় খুঁজতে লাগলেন ব্রিউয়িট, ‘সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিলাম। ধরে নিয়েছিলাম আমার আর ওর মধ্যে একজন দলে সুযোগ পাবে, তাই অনুশীলনে ওকে আঘাত করার উপায় খুঁজতে লাগলাম। বড়দিনের আগে আর বড়দিন থেকে নববর্ষের সময়টাতে অনুশীলনে পজেশন গেমে (প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যে বল দখলে রাখার অনুশীলন) কিংবা ম্যাচ অনুশীলনে ওর পাশে পাশে থাকতাম, আর ওকে লাথি মারতাম।’

বিজ্ঞাপন

অবশ্য ক্লিয়ারিকে একেবারে বড় চোটে ফেলার পরিকল্পনা তাঁর ছিল না বলেও জানালেন ব্রিউয়িট, ‘ওকে বাজেভাবে আহত করার চেষ্টা করছিলাম না। শুধু এমনভাবে আঘাত করতে চাইছিলাম যাতে ও রাস্তা থেকে সরে যায়, আমি খেলতে পারি ম্যাচটাতে।’ পরিকল্পনায় সফলও হয়ে যান, ‘এক্সেটার ম্যাচের এক সপ্তাহ আগে অনুশীলনে আমি বল ঠিকঠাকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারিনি, বল পা থেকে একটু দূরে চলে গিয়েছিল, ও (ক্লিয়ারি) এগিয়ে এসেছিল ট্যাকল করে আমার কাছ থেকে বল কেড়ে নিতে। আমিও (ট্যাকল করতে গিয়ে) সেকেন্ডের ভগ্নাংশের একটু বেশি সময় নিলাম, একেবারে বলের ওপর দিয়ে পা নিয়ে গিয়ে ওকে আঘাত করলাম। বাজে ট্যাকল ছিল।’

কিন্তু এ নিয়ে এখনো তেমন আফসোস নেই ব্রিউয়িটের, ‘আমি জানতাম সেটা বাজে ট্যাকল ছিল, ইচ্ছে করেই করেছি, এ নিয়ে আমি খুব একটা গর্বিত নই। তবে খুব একটা লজ্জিতও নই। কারণ আমার মাথায় ছিল, দলে ও নয়তো আমি সুযোগ পাব, আর আমি নিজের সুযোগ পাওয়ার কথা মাথায় রেখে সব করেছি।’ ট্যাকলের পর মাঠেই তর্ক লেগে গিয়েছিল দুজনের, ট্যাকলের শিকার ক্লিয়ারিই রেগেমেগে তেড়ে এসেছিলেন। কিন্তু ব্রিউয়িট আর আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করতে যাননি। যাবেন কেন, তাঁর তো ‘উদ্দেশ্য সাধন’ হয়ে গেছে! তিনি যে সেটি ইচ্ছে করে করেছেন, সেটিও শুধু ব্রিউয়িট নিজেই জানেন। বেচারা ক্লিয়ারির হলো উল্টো, বাজে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণে তাঁকে সেই সেশন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।  
পরে কি হলো? ‘ও দুই সপ্তাহ ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটেছে। সে কারণে আমার মনে হয়েছিল, আমি যা করতে চেয়েছি, তা হয়নি। একটু বেশিই আঘাত করে ফেলেছি। আমি তো ওকে এত আঘাত করতে চাইনি, শুধু ওই ম্যাচটা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম’—বলছিলেন ব্রিউয়িট।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রকৃতি ব্রিউয়িটের এই কুৎসিত পরিকল্পনার বদলা নিল! এক্সেটারের বিপক্ষে ম্যাচের চার দিক আগে আরেক অনুশীলন সেশনে সতীর্থের পিঠের সঙ্গে বেশ জোরে আঘাত লাগে ব্রিউয়িটের চোখের। কনকাশন (মাথায় আঘাতজনিত সমস্যা) ধরা পড়ে। এক্সেটার ম্যাচের জন্য ক্লপের বিবেচনাতেই আর থাকা হয়নি ব্রিউয়িটের। প্রকৃতির বদলা ওখানেই শেষ হয়নি। লিভারপুলের জার্সিতেই কখনো খেলা হয়নি তাঁর। মূল দলে খেলা কী, লিভারপুলের একাডেমি থেকেই পাশ করা হয়নি। ২০১৭ সালে লিভারপুলের একাডেমি থেকে তাঁর ঠিকানা হয় মিডলসব্রোর একাডেমি। এফসি ফিলদের হয়ে ২০১৮ সালে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক, গত মৌসুমে খেলেছেন মোরকাম্বে। গত মৌসুমের শেষে মোরকাম্বও তাঁকে ছেড়ে দেয়, এখন ক্লাবহীন ব্রিউয়িট।

ক্লিয়ারির ক্যারিয়ারও যে খুব আলো ছড়ানো, তা নয়। তবে আয়ারল্যান্ডের প্রথম বিভাগের ক্লাব ডুনডাল্কে খেলছেন, এই মৌসুমে ইউরোপা লিগে আর্সেনালের গ্রুপে পড়েছে দলটা। তবে ব্রিউয়িটের সঙ্গে মিটমাট হয়ে গেলেও ঘটনাটা ভোলেননি ক্লিয়ারি। ব্রিউয়িটের পডকাস্টের পর টুইট করেছেন, ‘প্রবাদটা মনে পড়ল, অন্য কারও প্রদীপ নিভিয়ে দিলে নিজের প্রদীপ বেশি আলো ছড়ায় না। ওই ট্যাকলটার পর যে পা দুভাগে ভাগ হয়নি, ঠিকঠাক বেরিয়ে আসতে পেরেছি, তাতেই নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি।’

মন্তব্য পড়ুন 0