চেলসি সমর্থকদের প্রতিবাদ সুপার লিগের বিরুদ্ধে
চেলসি সমর্থকদের প্রতিবাদ সুপার লিগের বিরুদ্ধে রয়টার্স
কীভাবে শুরু ফুটবল বিশ্ব টালমাটাল করে দেওয়া ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামে উচ্চাভিলাষী এক পরিকল্পনার, কীভাবে শুরুর আগেই পতন? নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পেছনের পুরো গল্প

৪৮ ঘণ্টা ধরে ফুটবল সত্যি সত্যি খাদের কিনারাতেই ছিল। সমর্থকেরা পথে নেমেছেন, খেলোয়াড়েরা ক্লাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহ করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলার ক্ষমতার করিডরে এত বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল যে সেটা ভূমিকম্প হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে—ম্যানচেস্টার থেকে ম্যানিলা, বার্সেলোনা থেকে বেইজিং এবং লিভারপুল থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত।
এই আন্তর্জাতিক রূপটাই আসলে ইউরোপিয়ান ফুটবলকে গত ৩০ বছরে একটা বৈশ্বিক মোহে পরিণত করেছে। পশ্চিম ইউরোপের অভিজাত ক্লাবগুলো আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকাসহ সারা বিশ্ব থেকে যাওয়া তারকা ফুটবলার নিয়ে গড়া। ফলে এই ক্লাবগুলো শুধু ইংল্যান্ড, ইতালি বা স্পেনের ফুটবলপ্রেমীদের মনেই জায়গা করে নেয়নি; তাদের সমর্থক ছড়ানো চীন, ভারত কিংবা অস্ট্রেলিয়াতেও। বিশ্বের বড় বড় সম্প্রচার সংস্থাগুলো তাই এই ক্লাবগুলোর খেলার প্রচারস্বত্বের জন্য কোটি কোটি ডলার দিতেও দ্বিধা করে না।

default-image


আবার একই সঙ্গে এটাও সত্যি, ক্রীড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যের নাম ফুটবল হলেও সমর্থকদের হৃদয়ে খেলাটার জন্য যে টান, সেটার সঙ্গে কোথাও না কোথাও একটা আঞ্চলিকতার যোগসূত্র আছে। ছোট ছোট শহরে গড়ে ওঠা ক্লাবগুলো শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলে আসা বিভিন্ন ঘরোয়া লিগে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। এই ছোট ক্লাবগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে আরও কিছু প্রতিযোগিতায় খেলে, যেখানে মাঠের লড়াইয়ে তারা কখনো কখনো বড় ক্লাবগুলোর সঙ্গে সমানে সমানেই লড়ে, সেই তুলনায় আর্থিক ভাগ পায় অনেক কম, যৎসামান্যই বলা চলে!
যুগের পর যুগ ধরে এই বৈষম্যমূলক নীতিই ইউরোপের ফুটবলে একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত রোববার রাতে সেটাও ভেঙে দিয়ে এক নতুন জোটের জন্ম হলো। আমেরিকান বিনিয়োগ, রাশিয়ার ধনকুবের, ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ী ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবার মিলে সিদ্ধান্ত নিল ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামে একটা নতুন টুর্নামেন্ট তৈরি করে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলার সিংহভাগ আয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার।
কীভাবে এই জোট হয়েছিল এবং তারপর দর্শনীয়ভাবে তা ভেঙেও গেল, সেটা এক রোমাঞ্চকর গল্প। সেই গল্পে অহং, হতাশা, ষড়যন্ত্র ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে; আছে গোপন বৈঠক, ব্যক্তিগত মধ্যাহ্নভোজ, আন্তর্জাতিক অর্থ ও ব্যক্তিত্বের লড়াইও। এই জোট মাত্র দুটি ভয়াবহ ও পাগলাটে দিনই স্থায়ী ছিল। তবে ফুটবল–বিশ্বকে কাঁপানোর জন্য এটুকু সময়ই যথেষ্ট ছিল।

বিজ্ঞাপন

ষড়যন্ত্র
গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) স্পেনের লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাস ও বার্সেলোনার নতুন সভাপতি হুয়ান লাপোর্তা একটা মধ্যাহ্নভোজে বসেছিলেন। এর মাত্র কয়েক দিন আগে লাপোর্তা দ্বিতীয় মেয়াদে বার্সা সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। তেবাস বেশ অকপট মানুষ, প্রায় প্রকাশ্যে লাপোর্তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন, সবার আগে লাপোর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানানো কয়েকজনের মধ্যে থেকে সম্পর্কটা আরও জোরদার করবেন।
কিন্তু ব্যাপারটা সে রকম হলো না। লাপোর্তা কথায় কথায় বলে দিলেন, বার্সেলোনা ইউরোপের প্রভাবশালী ১২টি ক্লাবকে নিয়ে গড়া একটা নতুন জোটে যোগ দিতে যাচ্ছে। লাপোর্তার কথা থেকেই তেবাস বুঝে গেলেন, এই জোট হলে ইউরোপের ফুটবলে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি অবকাঠামো নড়বড়ে হয়ে যাবে এবং এগুলোর সঙ্গে জড়িত কোটি কোটি ডলার অর্থনীতিও।
এই উদ্বেগ নতুন কিছু ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের ফুটবলের প্রভাবশালী ক্লাবগুলো এটাই চেয়ে আসছে। কারণ, বড় ক্লাবগুলোরই সমর্থক বেশি, তাদের মাধ্যমেই আয়টা বেশি হয়। এই ক্লাবগুলো তাই সেই আয়ের বেশির ভাগ অংশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে। কয়েক বছর পরপরই তারা একজোট হয়ে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করে এবং যথারীতি সেই উদ্যোগ ভেস্তেও যায়।
কিন্তু লাপোর্তার কথা শুনে তেবাসের মনে হলো, এবারের হুমকিটা বেশ গুরুতর। লাপোর্তাই তাঁকে জানিয়ে দিলেন, এরই মধ্যে আধা ডজন ক্লাব এই জোটে যোগ দেওয়া নিশ্চিত করেছে, সপ্তাহ শেষ হতে হতে আরও কয়েকটি ক্লাব যোগ দেবে।

default-image


তেবাসের টনক নড়ল। তিনি দেরি না করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর হর্তাকর্তাদের সঙ্গে কথা বললেন। তাতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগের কর্তাদেরও এই সতর্কবার্তা জানিয়ে দিলেন। তারপর জানালেন আলেক্সান্দোর সেফেরিনকে, ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার সভাপতি। এই জোট হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা উয়েফারই হওয়ার কথা।
৫৩ বছর বয়সী স্লোভেনিয়ান আইনজীবী সেফেরিন দেখতে ছিপছিপে গড়নের, কথা বলেন সোজাসাপ্টা। তিনি খবরটা শুনে একটু বিস্মিতই হলেন। কারণ, এর মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজনৈতিক মিত্র, ইতালির ব্যবসায়ী ও জুভেন্টাসের সভাপতি আন্দ্রেয়া আনেয়েল্লি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, বড় ক্লাবগুলোর এ রকম একটা জোট গঠনের পরিকল্পনা আসলে স্রেফ গুজব। আনেয়েল্লি একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর সংস্থা ইসিএর প্রধানও। এ রকম কিছু হলে তাঁরই সবচেয়ে ভালো জানার কথা। বন্ধুর কথাতেই আস্থা রেখেছিলেন সেফেরিন।
এর চেয়েও বড় কথা, এর আগের দিনই আনেয়েল্লি এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ইসিএ উয়েফার প্রস্তাবিত চ্যাম্পিয়নস লিগ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। যে প্রস্তাবগুলো সোমবার উয়েফার বৈঠকে পাসও হওয়ার কথা।

default-image


সেই দিনটা ছিল শনিবার। গুঞ্জন তখন বেশ ডালপালা মেলেছে। সেফেরিন ভাবলেন, বন্ধুর কাছ থেকে আরেকবার নিশ্চিত হওয়া যাক। গ্যারেজ থেকে অডি গাড়িটা বের করলেন এবং স্লোভেনিয়ার লুবইয়ানায় তাঁর বাড়ি থেকে থেকে আট ঘণ্টার ড্রাইভে সুইজারল্যান্ডের নিয়নে উয়েফার সদর দপ্তরে নিজের অফিসের পথে রওনা দিলেন। গাড়িতে উঠেই তাঁর প্রথম কাজটা ছিল, বন্ধু আনেয়েল্লিকে একটা ফোন করা। কিন্তু আনেয়েল্লি বন্ধুর ফোন ধরলেন না।
শুধু বন্ধু নন, সেফেরিন আনেয়েল্লির কনিষ্ঠ কন্যার ধর্মপিতাও। সম্পর্কটা পারিবারিক। দেরি না করে সেফেরিন তাই বন্ধুপত্নীকে একটা খুদে বার্তা পাঠালেন, ‘যেভাবেই হোক আনেয়েল্লিকে ফোন দিয়ে বলো, জরুরি ভিত্তিতে আমাকে ফোন করতে।’ গাড়িতে ওঠার প্রায় তিন ঘণ্টা পর সেফেরিন অবশেষে বন্ধুর ফোন পেলেন। আনেয়েল্লি তাঁকে আবার নিশ্চিত করলেন, ‘ধুর, এ রকম কিছু হচ্ছে না।’
সেফেরিন বন্ধুকে প্রস্তাব দিলেন, ‘তাহলে আমরা একটা যৌথ বিবৃতি দিই, বলি যে এগুলো স্রেফ গুঞ্জন। তাহলে এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি হবে না।’ আনেয়েল্লি রাজি হলেন। গাড়িতে বসেই সেফেরিন একটা বিবৃতির খসড়া করলেন, বন্ধুকে পাঠালেন। এক ঘণ্টা পর আনেয়েল্লি ফোন করে কিছুটা সময় চাইলেন খসড়া বিবৃতিটা আরেকটু ঘষামাজা করার জন্য। আরও এক ঘণ্টা পার হলো। এর মধ্যে সেফেরিন-আনেয়েল্লি ফোনে খসড়া বিবৃতি ঘষামাজা করা নিয়ে আরও কয়েকবার কথা বললেন। ‘আমাকে আর আধা ঘণ্টা সময় দাও, আমি চূড়ান্ত বিবৃতিটা তোমাকে পাঠাচ্ছি’, এ কথা বলে আনেয়েল্লি ফোন রাখলেন।
তারপর নিজের ফোনটা সুইচ অফ করে দিলেন।

বিদ্রোহ

নিয়নে পৌঁছেই সেফেরিন আরও দুই জায়গা থেকে ফোন পেলেন। যাঁরা তাঁকে সতর্ক করে দিলেন, প্রভাবশালী ক্লাবগুলোর নতুন জোট করার ব্যাপারটা স্রেফ গুঞ্জন নয়, এটা ঘটতে যাচ্ছে। স্পেন ও ইংল্যান্ডের দুটি শীর্ষ ক্লাবে থাকা সূত্র আনেয়েল্লিকে নিশ্চিত করল, তাদের একটা বিদ্রোহী লিগে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। তারা যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে একই সঙ্গে উয়েফার সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়। সেফেরিন ভদ্রভাবেই জানিয়ে দিলেন, যদি এ রকম কিছু করে ক্লাবগুলো, উয়েফা সর্বস্ব দিয়ে প্রতিরোধ করবে এবং ব্যবস্থা নেবে।

তবে এ হুমকি যে যথেষ্ট নয়, সেফেরিন নিজেও জানতেন। তিনি কাজে নেমে পড়লেন। ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনে (ইসিএ) নিজের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে খবরটা দিলেন। তাঁরা বুঝলেন, আনেয়েল্লি এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এড উডওয়ার্ড এত দিন সবাইকে বিভ্রান্ত করেছেন। তাঁরা একমত হলেন, এই ক্লাবগুলো যদি এ রকম একটা জোট করে আলাদা লিগ গঠন করে এবং এরপর যদি ওরা যার যার ঘরোয়া লিগে থাকেও, সেটা ইউরোপের ফুটবলের জন্য ভালো কিছু হবে না। ঘরোয়া লিগের সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আয়, পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে ইউরোপের ফুটবলকাঠামোতে। যেটা মনে করিয়ে দিয়েই পরে সেফেরিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এমনকি মাফিয়া সংগঠনগুলোর একটা নীতি থাকে, এদের তা–ও নেই।’

default-image

রোববার মধ্যাহ্নভোজের আগেই খবর নিশ্চিত হয়ে গেল, ১২ দল মিলে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামে নতুন জোট করেছে। যোগ দিয়েছে স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল ও টটেনহাম। ইতালি থেকে জুভেন্টাস, এসি মিলান ও ইন্টার মিলান। রাগে-ক্ষোভে সেফেরিন এদের নাম দিলেন ‘নোংরা ১২’।

এ উদ্যোগে ১২ ক্লাবের সব কটি সমান অংশীদার ছিল না। ম্যানচেস্টার সিটি ও চেলসিই যেমন প্রস্তাব পেয়েছে একেবারে শেষ মুহূর্তে। তাদের বলা হয়েছিল, এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে। বলা হয়েছিল, ‘ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে, উঠতে হলে এখনই উঠতে হবে তোমাদের।’ সিটিই আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, চেলসি কিছু সময় নিয়েছিল।

প্রস্তাব গিয়েছিল জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্সের পিএসজির কাছে। তারা অবশ্য শুরুতেই না করে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, উয়েফা ও বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লিগে কর্তারা আসলে এই দুই ক্লাবের কাছ থেকে সুপার লিগ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জেনেছেন, যা তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছে।

ততক্ষণে সারা পৃথিবী জেনে গেছে, কী হতে যাচ্ছে ফুটবল–বিশ্বে। ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ, যাকে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি মুখপাত্রের ভূমিকা নিলেন। ফুটবল–বিশ্বে তিনি প্রভাবশালী প্রশাসকদের একজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্যি, সুপার লিগের পরিকল্পনাকারীরা এটা বুঝতে পারেননি, পেরেজের পক্ষে ইংলিশ সমর্থক, সংবাদমাধ্যমকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়।

এ কাজ যাঁরা করতে পারতেন, তাঁরা কেউ সামনেই এলেন না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কো-চেয়ারম্যান জোয়েল গ্লেজার, চেলসির মালিক রোমান আব্রামোভিচ, আর্সেনালের স্টান ক্রোয়েঙ্কে তো সংবাদমাধ্যমের সামনেই এলেন না। সিটির মালিক আবুধাবির রাজপরিবারের শেখ মনসুর তো কখনো সংবাদমাধ্যমে কথাই বলেন না। কথা বলতে রাজি হননি লিভারপুলের বড় অংশীদার জন হেনরিও।

বিদ্রোহী লিগের যোগাযোগের কৌশলও ব্যর্থ হয়েছে। এর মূল দায়িত্বে ছিলেন কেটি পেরিয়র নামে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের রাজনৈতিক শুভাকাঙ্ক্ষীদের একজন। তিনি পুরো সময় চেষ্টা করে গেছেন রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের, কিন্তু এর জন্য যে আগে ফুটবলের সমর্থক, কোচ, খেলোয়াড়দের গণসমর্থন লাগবে, সেটার গুরুত্ব দেননি। ফলে যেটা হয়েছে, শুরু থেকে সুপার লিগের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়দের অনেকে। বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ইংলিশ ক্লাবগুলোর প্রভাবশালী কোচরা। খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্য যে কারও কথার চেয়ে সমর্থকদের কাছে ক্লাবের কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও কোচদের কথার মূল্য অনেক বেশি। শুরুতেই তাই সুপার লিগের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন সমর্থকেরা।

বিজ্ঞাপন

কদর্য লড়াই

পরদিন সকালের মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল, ১২ ক্লাবের এই জোটের কোনো সমর্থক নেই!

কিন্তু এই লিগ হলে কী কী ভালো হতে পারে, ফুটবলের ও ফুটবল ক্লাবগুলোর কী লাভ হতে পারে, সেটা ব্যাখ্যা করার বদলে সুপার লিগ কর্তৃপক্ষ যেটা করল, শুরুতেই উয়েফা, ফিফাকে একটা আইনি চিঠি পাঠাল, যাতে তাদের এই লিগ করা থেকে আটকানো না হয়।

সেফেরিন ফোন দিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। ঘণ্টার বেশি সময় কথা বললেন। ইনফান্তিনো তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, চিন্তার কিছু নেই।

সেফেরিনের পরের ফোনটা ছিল অলিভার ডউডেন নামে ব্রিটিশ এক রাজনীতিবিদকে। ইংল্যান্ডের ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক আইন তৈরি করে যে কমিটি, ডউডেন সেটার প্রধান। সেখান থেকে জবাব এল, ব্রিটেনের বিদ্যমান আইনে যদি সুপার লিগে যোগ দেওয়া ঠেকানো না যায়, দরকার হলে নতুন আইন করা হবে।

default-image

কিছুক্ষণ পর একই কথার প্রতিধ্বনি করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও। বিপক্ষে অবস্থান নিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, টুইটারে উদ্বেগ জানালেন ইংলিশ এফএর চেয়ারম্যান ও ব্রিটিশ রাজপুত্র উইলিয়ামও। প্রিমিয়ার লিগের ৬টি দলকে বাদ দিয়ে বাকি ১৪ দল বৈঠকে বসল। সেফেরিন সংবাদমাধ্যমে বলে দিলেন, ‘সাপ যে তাঁর এত কাছেই রয়েছে, তিনি বুঝতে পারেননি।’ কারও বুঝতে বাকি রইল না যে এই সাপ হচ্ছেন তাঁর বন্ধু আনেয়েল্লি। ইউরোপের ফুটবল প্রশাসনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে বড় খলনায়ক হয়ে গেলেন আনেয়েল্লি ও পেরেজ।

ইংলিশ ক্লাবগুলোর দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছিল। চেলসি ও লিভারপুলের সমর্থকেরা ততক্ষণে প্রতিবাদী ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় নেমে গেছেন। ধীরে ধীরে এই প্রতিবাদে যোগ হলেন আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকেরাও। স্কাই টিভির শোতে ঝড় তুললেন সাবেক ইউনাইটেড ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তো শুরু থেকেই সমর্থকদের পাশে ছিল। মোট কথা, পুরো ইউরোপিয়ান ফুটবলে সুপার লিগের হর্তাকর্তারা একঘরে হয়ে গেলেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসলে সমর্থকেরাই দিয়েছেন। নিজের ক্লাব আরও বেশি আয় করবে, অভিজাত টুর্নামেন্টে খেলবে, এই সুখী ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে তাঁরা ভেবেছেন ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থের কথা।

সমর্থকদের পাশে না পেয়ে আসলে শুরুতেই ভিত নড়ে গেছে সুপার লিগের।

এবং ধস

মঙ্গলবার সকালে সুইজারল্যান্ডের মত্রে শহরে উয়েফার একটা অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন সেফেরিন। এর আগেই তাঁর কাছে খুদে বার্তা এল, ‘সুপার লিগ ধসে পড়তে শুরু করেছে।’ ইংল্যান্ডের চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটি সরে যাওয়ার কথা ভাবছে এই প্রকল্প থেকে।

ইংল্যান্ড থেকে খবর পেলেন, সরকার ইংলিশ ক্লাবগুলোকে ঠেকানোর সব রকম উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে। সেফেরিনের স্বস্তি ফিরল কিছুটা। এর মধ্যেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন, কোনো ক্লাব যদি নিজেদের মতো এমন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটার পরিণতি তাদের মেনে নিতে হবে।

সেফেরিন বুঝলেন, সময় এখন তাঁর। বক্তৃতায় তিনি আহ্বান জানালেন, ‘আপনারা ভুল করেছেন। কিন্তু সেই ভুল পথ থেকে সরে আসার সময় শেষ হয়ে যায়নি। কেউ কেউ এটাকে লোভ বলবেন, কেউ বলবেন অবজ্ঞা, অহংকার বা ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা। কিন্তু এটা কোনো ব্যাপার নয়। এখনো সময় আছে আপনাদের মন বদলানোর, ভুল শুধরানোর।’

সমর্থকদের প্রতিবাদ তখনো চলছে। ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচের আগে চেলসি সমর্থকেরা ক্লাবের বাস আটকে দিলেন ক্লাবে ঢোকার মুহূর্তে। ক্লাব কিংবদন্তি পিয়েতর চেক বুঝিয়ে–শুনিয়ে সমর্থকদের শান্ত করলেন। লিভারপুলের খেলোয়াড়দের হয়ে অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়ে দিলেন, তাঁরা এই লিগ চান না। এর পক্ষে নন। এত চাপ আসলে ইংলিশ ক্লাবগুলো নিতে পারছিল না।

পেরেজ-আনেয়েল্লিদের প্রথম ধাক্কা দিল ম্যানচেস্টার সিটি। ছোট একটা বিবৃতি দিয়ে তারা জানিয়ে দিল, ‘তারা আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নেই।’

তারপর বাকি সবকিছু ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো। সিটির পর চেলসি, আর্সেনাল, টটেনহাম সরে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শুধু সুপার লিগ থেকেই সরল না, দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন এড উডওয়ার্ডও। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এল লিভারপুলের সরে যাওয়ার ঘোষণাও।

default-image

আধা ডজন ক্লাব চলে যাওয়ায় সুপার লিগ প্রকল্প এমনিতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করে তারপরও সরে যাওয়ার ঘোষণা দিল ইন্টার মিলান, এসি মিলান ও আতলেতিকো মাদ্রিদ।

শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তাই আবার সুপার লিগ কর্তৃপক্ষ একটা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিল, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।’

সেফেরিন ততক্ষণে স্লোভেনিয়ায় ফিরে গেছেন। মত্রে থেকে আবার আট ঘণ্টার ড্রাইভ। সেদিন রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে থাকতে হলো তাঁকে। টেলিভিশনে, অনলাইনে খবর দেখলেন। এর মধ্যে ইংলিশ ক্লাবগুলোকে প্রত্যাবর্তনের জন্য স্বাগত জানিয়ে একটা বিবৃতিও তৈরি করলেন। মুঠোফোনে জমে থাকা শত শত খুদে বার্তার অনেকগুলোর উত্তর দিলেন।

ল্যাপটপ বন্ধ করে শুয়ে পড়ার আগে সেফেরিনের মনে হলো, একটা ডাবল হুইস্কি হলে মন্দ হয় না!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন