default-image

হতাশার চাদরে মুড়ে শুরু। মাঝখানে দুর্দান্তভাবে ফিরে আসা। কিন্তু শেষটা বিষাদময়। সেটিও একেবারে শেষ মুহূর্তে। এ চারটি বাক্যেই ফুটে উঠছে গোটা সন্ধ্যার চিত্র।
চীনা তাইপের রেফারির শেষ বাঁশি কবরের নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে দিয়েছে দর্শকে ঠাসা বর্ণিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে। লাল-সবুজের ১১ যোদ্ধার অবসন্ন শরীর মাঠে নুয়ে পড়েছে আরও। কে কাকে সান্ত্বনা দেবেন! সবাই বাকরুদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপের ট্রফিটা তুলে দিলেন চ্যাম্পিয়ন মালয়েশিয়া যুব দলের হাতে, মামুনুলদের বুকে ছবিটা যেন তির বিঁধিয়ে দিল। ২ গোলে পিছিয়ে পড়েও বীরের মতো ম্যাচে ফেরা, জয়সূচক গোলটাও আসি আসি করছিল। উল্টো ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা ৩ মিনিটের দ্বিতীয় মিনিটে গোল হজম। স্বপ্নের ফাইনাল শেষ পর্যন্ত এক মিনিটের দুঃখগাথা।
পাঁচ বছর আগে ঠিক এই ৮ ফেব্রুয়ারি আনন্দে উদ্বেলিত ছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। আফগানিস্তানকে উড়িয়ে এসএ গেমসের সোনা জেতে সেদিন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল। আরেকটি ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দলের এই ফাইনাল উচ্ছাসের ঢেউ ছড়িয়েছে চার পাশে। বঙ্গবন্ধু কাপের সোনালি ট্রফি হাতে নেবে প্রাণবন্ত বাংলাদেশ। কত আশা!
হায়, শেষটা এমন বিয়োগান্ত নাটকের পাণ্ডুলিপি লিখে রেখেছে কে ভেবেছিল! আসলে দুর্ভাগ্য তাড়া করেছে শুরুর বাঁশির আগেই। খেলোয়াড় তালিকায় গত ম্যাচের ১১ জনই ছিলেন। কিন্তু হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাসের জায়গায় মোনায়েমকে নিয়ে ড্রেসিংরুম থেকে বেরোল বাংলাদেশ। ওয়ার্মআপের সময় পেশির চোট কেড়ে নিয়েছে শ্রীলঙ্কা ম্যাচের জয়ের নায়ককে। বিনা নোটিসে হঠাৎ একাদশে বদল!
মিনিট সাতেক ম্যাচ গড়াতেই আরেকটি বড় দুঃসংবাদ। চোট নিয়ে এবার মাঠ ছাড়লেন উইঙ্গার জাহিদ হোসেন। জোড়া আঘাতে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের কাছে এই উত্তেজনার বারুদে ঠাসা ফাইনাল বিভীষিকাময়ই মনে হচ্ছিল।
খেলোয়াড়েরা মাথা গরম করলেন, তর্কে জড়ালেন রেফারির সঙ্গে। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে দু-তিনবার ধাক্কাধাক্কিও হলো। এটিও ক্ষয়িষ্ণু ও ক্লান্ত বাংলাদেশ দলের স্বাভাবিক খেলা নষ্ট করেছে।
সেই গতি নেই, সামনে পাস বাড়ানো লোকের অভাব, ব্যাকপাসের ছড়াছড়ি, মিস পাসও। স্বাগতিকদের এমন এলোমেলা অবস্থায় সুযোগ ষোলো আনা কাজে লাগিয়েছে পাল্টা-আক্রমণে ভয়ংকর মালয়েশিয়া।
৩১ মিনিটে নাজিরুল নাইমের বাঁ পায়ের প্রায় ৩০ গজি বাঁকানো ফ্রি কিক ক্রসবারের কোনা দিয়ে বাংলাদেশের জালে, যা দেখে ডেভিড বেকহামের ফ্রি কিকের কথাই মনে পড়ল। জে লিগের দল এফসি রায়োকোতে খেলা মালয়েশিয়া যুব দলের অধিনায়ক নাইমের এই গোলে উৎসবমুখর লাল–সবুজ গ্যালারি স্তব্ধ।

default-image

১০ মিনিট বাদেই আরেকটি গোল স্টেডিয়ামকে প্রাণহীন করে দিল। পাল্টা-আক্রমণে পেছন থেকে হেডে একজনের পা ঘুরে পেলেন কুমারন, দুই ডিফেন্ডার ইয়াসিন ও নাসিরকে সুযোগ না দিয়ে বক্সে ঢুকে তাঁর কোনাকুনি প্লেসিংয়ে ২-০।
ম্যাচ তখনই কার্যত শেষ। কিন্তু বিরতির পর আগের দুই ম্যাচের সেই দুরন্ত টগবগে বাংলাদেশ। উজ্জীবিত সোহেল রানারা ম্যাচের রং পাল্টাতে জীবনপণ লড়াইয়ে নেমেছেন। মাত্র ছয় মিনিটের মধ্যে ভোজবাজির মতো স্কোরলাইন ২-২!
রায়হানের গোলের ঠিকানা লেখা লম্বা থ্রো পথহারা বাংলাদেশের সামনে আলো জ্বেলেছে। ৪৮ মিনিটে ওই থ্রোতে মাথা ছোঁয়ান সেমিফাইনালে মামুনুলের কর্নারে পা লাগিয়ে জয়সূচক গোল এনে দেওয়া সেই ডিফেন্ডার নাসিরউদ্দিন। টিভি রিপ্লেতে মনে হলো, মালয়েশিয়ার গোলরক্ষক গোললাইনের ভেতর থেকে বল ফিরিয়েছেন। গোলটা নাসিরেরই হওয়ার কথা, তবে ফিরতি বলে টোকা দেওয়ায় গোল এমিলিকে দেওয়া হয়েছে।
৫৪ মিনিটে দ্বিতীয় গোল। মামুনুলের জাদুকরি কর্নারে ডিফেন্ডার ইয়াছিনের হেড জালে। অবিশ্বাস্যভাবে চোখের পলকে ম্যাচে ফেরা বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা আবার জীবন্ত। মালয়েশিয়া ততক্ষণে কোণঠাসা। বল পায়ে রেখে একের পর এক আক্রমণে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে বল পজেশনে বাংলাদেশ ছিল ৫২, দ্বিতীয়ার্ধে ৬০। তবু জয়ের আনন্দে মাতাতে কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় গোলটা ধরা দেয়নি।
অতিরিক্ত সময়ের লড়াই দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সবাই, তখনই বজ্রাঘাত। রায়হানকে কৌশলে ধাক্কা মারলেন প্রতিপক্ষ এক খেলোয়াড়, রেফারি ফাউল না দিয়ে দিলেন কর্নার। আবারও ‘ডেড বল’ বিপর্যয়। কর্নার থেকে স্ট্রাইকার ফাইজাতের হেড বাংলাদেশের জালে।
স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যাওয়ায় মাঠে গুমোট কান্না রায়হানদের। খেলোয়াড়দের তবু অভিনন্দন জানিয়ে দর্শকেরাও কাঁদল নীরবে। খারাপ খেলে ২-৩ গোলে হারলে দুঃখ থাকত না। কিন্তু এমন হার যন্ত্রণাবিদ্ধ করবে অনেক দিন। বহুদিন!
বাংলাদেশ দল: সোহেল, ইয়াছিন, ইয়ামিন, নাসির, রায়হান, সোহেল রানা, জামাল, মোনায়েম, মামুনুল, জাহিদ (কোমল), এমিলি।

এক নজরে
চ্যাম্পিয়ন
মালয়েশিয়া
রানার্সআপ
বাংলাদেশ
ম্যান অব দ্য ফাইনাল
মোহাম্মদ ফাইজাত (মালয়েশিয়া)
ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট
জামাল ভূঁইয়া (বাংলাদেশ)

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন