বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

খেলোয়াড়ি জীবনে দুর্দান্ত স্ট্রাইকার ছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। সভাপতি হিসেবে পাশ মার্ক দেওয়া না গেলেও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর দক্ষতা খেলোয়াড়ি জীবনে গোল করার মতোই। ২০১৬ সালে তৃতীয় মেয়াদে বাফুফে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ওটাই তাঁর শেষ নির্বাচন। অথচ গত বছর ‘সালাউদ্দিন হটাও’ তুমুল আন্দোলনের মধ্যেই আবারও নির্বাচন করেছেন তিনি, নির্বাচিত হয়েছেন সভাপতিও।

নির্বাচনে তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক ফুটবলার ও বাফুফের সাবেক সহসভাপতি বাদল রায়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েও অবশ্য ৪০ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। সহসভাপতি পদে থেকেও বাফুফের অনিয়মের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া বাদল রায় তো এখন দূর আকাশের তারাই হয়ে গেছেন।

যে মেয়েদের সাফল্য সালাউদ্দিনের তুরুপের তাস, সেটির সাফল্যের আড়ালেই পড়ে আছে রুগ্‌ণ চিত্র। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে সাফল্য এলেও মেয়েদের জাতীয় দল যে ভুগছে সাফল্যের খরায়! গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় নারী ফুটবল দল আড়াই বছর পর মাঠে নেমেছিল। এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে ৩ ম্যাচে ১৫ গোল খেয়ে বাংলাদেশের ফেরাটা হয়েছে হতাশার। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সেটাই আসলে আসল ছবি।

default-image

নির্বাচনের আগে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে সালাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত পরিষদ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জাতীয় দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপের নিয়মিত আয়োজন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও এসএ গেমসের শিরোপা পুনরুদ্ধার এবং ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির পরিকল্পনা।

এ ছাড়া ঘরোয়া ফুটবলের সুনির্দিষ্ট পঞ্জিকা, নির্ধারিত সময়ে দলবদল, জেলা ফুটবল লিগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়োজন করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। ইশতেহারটি তিন মাস গবেষণা করে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি। এ রকম প্রতিশ্রুতি অবশ্য তিনি আগেও দিয়েছেন, যার বেশির ভাগই পূরণ হয়নি।

জাতীয় দল নিয়ে বাফুফের ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা’টা যে কত এলোমেলো, সেটি বোঝা যায় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই তিন মাসে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তিনজনের দায়িত্ব পালনের ঘটনায়। জেমি ডেকে ‘ওএসডি’ করে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দায়িত্ব দেওয়া হয় বসুন্ধরা কিংসের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোনকে। সাফের পর শ্রীলঙ্কার টুর্নামেন্টে আবার দায়িত্ব দেওয়া হয় আবাহনী লিমিটেডের পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমোসকে।

default-image

বাফুফে সভাপতি হিসেবে কাজী সালাউদ্দিনের ১৩ বছরে জাতীয় দলের কোচ বদল হয়েছে ২০ বার। পরিকল্পনাহীনভাবে কোচ নিয়োগ ও বদলের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে। ফিফা র‍্যাঙ্কিং একটি দেশের ফুটবল আয়না। সাম্প্রতিক কালে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান মানেই ১৮০-এর (বর্তমান ১৮৬) নিচে ঘোরাঘুরি।

default-image

২০২১ সালে এসে জাতীয় দল সর্বাধিক ম্যাচ খেলেছে, এই কৃতিত্ব অবশ্য বাফুফে সভাপতিকে দেওয়াই যায়। ২০১৫ সালে জাতীয় দলের ১৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড ছাপিয়ে এ বছর বাংলাদেশ ম্যাচ খেলেছে ১৬টি (ফিফা প্রথম ও দ্বিতীয় স্তর মিলিয়ে)। বিদেশের মাটিতে ১৬ ম্যাচে ৫ ড্র আর ৮ হারের বিপরীতে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৩টি। সেগুলোও কিরগিজস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ (ফিফা দ্বিতীয় স্তর), শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের বিপক্ষে।

ইশতেহারে সাফের শিরোপা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা ছিল। বাফুফের ভাগ্য ভালো, এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে পাঁচ দল নিয়ে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে। আগের চার আসরের মতো তাই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়নি বাংলাদেশকে। পাঁচ দলের মধ্যে চতুর্থ হয়েছে ২০০৩ সালের সাফজয়ীরা।

default-image

কাজী সালাউদ্দিন আগেই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ২০২২ বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ দল। কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব বাংলাদেশ শেষ করেছে গ্রুপের তলানিতে থেকে। ৮ ম্যাচে ৬ হার আর ২ ড্র নিয়ে (২ পয়েন্ট) ‘ই’ গ্রুপে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শেষে। জুনে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের বাকি তিন ম্যাচের আগে জামাল ভূঁইয়াদের কোনো প্রস্তুতি ম্যাচেরও ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি বাফুফে।

তবু ৩৯ দলের বাছাইপর্বে ৩৫তম হয়ে সরাসরি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। এ জন্য বাফুফে ধন্যবাদ দিতেই পারে উত্তর কোরিয়াকে। করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইপর্ব থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সুযোগটা চলে আসে বাংলাদেশের সামনে।

নভেম্বরে জাতীয় দল সর্বশেষ খেলেছে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে চার জাতি টুর্নামেন্টে। এই টুর্নামেন্ট একদিক দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশের নিচে আসলে এখন আর কোনো দলই নেই! র‍্যাঙ্কিংয়ে ২০৪-এ থাকা শ্রীলঙ্কার কাছে হারের আগে ১৯৯-এ থাকা সেশেলসের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ। তাতে পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়ে যায় যে এই টুর্নামেন্টে মালদ্বীপের বিপক্ষে ১৮ বছর পর পাওয়া বাংলাদেশের জয়টিকেও অনেকে বলছেন ‘অঘটন’।

default-image

তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় উঠে আসছে না বলেই জাতীয় দল আজ বেহাল। গত আগস্টে কমলাপুর স্টেডিয়ামে কিছু ছেলেকে রেখে অনুশীলনের ব্যবস্থা করে নাম দেওয়া হয়েছে বাফুফে ‘এলিট একাডেমি’। একাডেমি মানেই সেখানে খেলোয়াড়দের আবাসন ও অনুশীলনের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কিন্তু কমলাপুরে মাঠ ও কোনোরকমে থাকার ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নেই। নামমাত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেই ‘এলিট একাডেমি’র প্রচার প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

default-image

২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর বাফুফে ভবনে ঘটা করে বর্ষপঞ্জি ঘোষণা করেছিলেন বাফুফে সভাপতি। বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১০-১২ বছরের বালকদের নিয়ে এ বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কখনো আলোচনাতেই আসেনি। মাঠে গড়ায়নি খেলোয়াড় উঠে আসার সিঁড়ি হিসেবে পরিচিত পাইওনিয়ার, দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ। খেলোয়াড় ঘাটতি পূরণের জন্য ২০২১ সালে দুবার তৃতীয় বিভাগ হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে একবার। খেলোয়াড় তৈরির পরিকল্পনা না থাকার খেসারত দিয়েছে যুব দলও। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ তিন ম্যাচে কোনো গোল না করলেও খেয়েছে ১০টি।

সর্বশেষ নির্বাচনের পর বেশির ভাগ সাব–কমিটিতে পুরোনো মুখ রেখে দিলেও জেলা ফুটবলের দায়িত্ব নিজের হাতে নেন কাজী সালাউদ্দিন। জেলাগুলো লিগ করতে ব্যর্থ হলে বাফুফে নিজের উদ্যোগে লিগ আয়োজন করবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২১ সালে কটি জেলায় লিগ হয়েছে, সেই তথ্যও জানাতে পারেনি বাফুফে।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন