সুপার লিগে খেললেই নিষিদ্ধ হবে ক্লাবগুলো।
সুপার লিগে খেললেই নিষিদ্ধ হবে ক্লাবগুলো।ছবি: রয়টার্স

রীতিমতো বিপ্লবই ঘটে গেছে ইউরোপীয় ফুটবলে। ইউরোপের ১২টি ক্লাব জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইউরোপীয় সুপার লিগে খেলবে। তবে কোনো বিদ্রোহ নয়, এই ১২টি ক্লাব সুপার লিগে খেলার ঘোষণা দিলেও তারা জানিয়েছে উয়েফা আর ফিফার সঙ্গে আলোচনা করেই তারা এই নতুন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। তবে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা আর ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ক্লাবগুলো যদি ইউরোপীয় সুপার লিগ আয়োজন করে বা তাতে অংশ নেয়, তাহলে তারা উয়েফার সব ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অধিকার হারাবে। কেবল তা-ই নয়, এই লিগে অংশ নেওয়া কোনো ফুটবলারকে নিজ নিজ দেশের জাতীয় দল থেকেও নিষিদ্ধ করা হবে।

রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল, টটেনহাম, জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান ও এসি মিলান—ইউরোপের এই ১২টি শীর্ষ ক্লাব সুপার লিগ আয়োজন ও তাতে খেলার কথা বলেছে। এই ১২ ক্লাবের সঙ্গে আরও ৩টি ক্লাবের নামও শিগগিরই ঘোষিত হবে। মোট ২০টি ক্লাবকে নিয়ে আগামী আগস্ট থেকে সুপার লিগ শুরু করার লক্ষ্য আয়োজকদের। ক্লাবগুলো বলছে উয়েফা বা ফিফার কোনো আয়োজনের সঙ্গে তাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব নেই নিজ নিজ দেশের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গেও। তারা এ সুপার লিগে খেলার পাশাপাশি চালিয়ে যাবে ঘরোয়া লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলাও।

default-image
বিজ্ঞাপন

এমন একটা পরিস্থিতিতে ফিফা এক বিবৃতিতে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। তবে তারা যে ফুটবলবিশ্বের একতায় বিশ্বাসী, সেটা বিবৃতিতে জানাতে ভোলেনি, ‘ফিফা সব সময়ই ফুটবল বিশ্বের ঐক্যে বিশ্বাসী। এ মুহূর্তে ফিফা আশা করে বিষয়টি নিয়ে (সুপার লিগ) বিতর্কে ব্যস্ত সব পক্ষই নিজেদের শান্ত রেখে ফুটবল বিশ্বের সবার মঙ্গল, ঐক্যের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ আলাপ-আলোচনায় অংশ নেবে। ফিফা এ ব্যাপারে অবশ্যই ফুটবলদুনিয়ার ঐক্যের স্বার্থে যা করার তা-ই করবে।’

উয়েফা অবশ্য ফিফার মতো কোনো রাখঢাক না করেই ইউরোপীয় সুপার লিগের উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এই উদ্যোগ কিছু ক্লাব ও ব্যক্তির স্বার্থেই উদ্ভূত। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা এই সুপার লিগের উদ্যোগকে প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে, ‘উয়েফা তার সব সদস্য নিয়ে এ ব্যাপারে একমত। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই অশুভ উদ্যোগ প্রতিহত করব। এটা এমন একটা উদ্যোগ, যেটি কেবল গুটি কয়েক ক্লাব ও ব্যক্তির স্বার্থে পরিচালিত। এমন একটা সময় ইউরোপীয় ফুটবলের ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যখন আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বেশি করে প্রয়োজন।’

ইউরোপীয় সুপার লিগের উদ্যোগে শামিল ১২ ক্লাবের মধ্যে ৬টিই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের। আছে লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, টটেনহাম, আর্সেনাল, চেলসির মতো শীর্ষ ও জনপ্রিয় ক্লাবগুলো। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন স্বভাবতই ব্যাপারটিকে ভালো চোখে দেখছে না। তাদের ভাষায় সুপার লিগের উদ্যোগ ইংলিশ ফুটবলকে ধ্বংস করারই অপচেষ্টা, ‘এটা একেবারে পরিষ্কার যে ব্যাপারটি ইংলিশ ফুটবল, সেই সঙ্গে গোটা ইউরোপীয় ফুটবলেরই ক্ষতি করার অপচেষ্টা। এটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ধারণা, যেটি যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলারই মৌলিক ব্যাপার, তার বিরোধী।’

default-image

ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এর বিরোধিতা করছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগও, ‘এ মুহূর্তে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের ফুটবলপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখছেন, তাঁদের প্রিয় দল ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার শীর্ষে আরোহণ করবে। তারা ইউরোপের সেরা ক্লাবের মুখোমুখি হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই সুপার লিগের ধারণা সেই স্বপ্নকে শেষ করে দেবে।’

ইউরোপীয় সুপার লিগের সরাসরি বিরোধিতা করছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও। তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সুপার লিগের পরিকল্পনা গোটা ফুটবলের জন্যই অত্যন্ত ক্ষতিকর, ‘ইউরোপীয় সুপার লিগের পরিকল্পনা ফুটবলকে ধ্বংস করে দেবে। এটা সব দেশের ঘরোয়া লিগকে শেষ করবে। এর জন্য ক্লাবগুলোকে তাদের ভক্ত–সমর্থকদের কাছে জবাব দিতে হবে।’

ইতালীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গ্যাব্রিয়েলে গ্রাভিনা বলেছেন, এ মুহূর্তে যদি চ্যাম্পিয়নস লিগের সংস্কারের ব্যাপারে উয়েফা উদ্যোগ হয়, সেটিতে ইতালিয়ান ফুটবল আছে। কিন্তু ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নস লিগের বিরোধিতা সব সময়ই করে যাবেন তারা।

জার্মানির কোনো ক্লাব এই সুপার লিগের উদ্যোগে এখনো নাম না লেখালেও জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পরিকল্পনাটির ঘোর বিরোধী। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, কেবল কয়েকটি ক্লাবের আর্থিক স্বার্থের কাছে ইউরোপীয় ফুটবল জিম্মি হতে পারে না, ‘জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মনে করে একমাত্র “পারফরম্যান্সই” কোনো প্রতিযোগিতায় উত্থান ও পতনের নির্ণায়ক। নির্দিষ্ট কিছু ক্লাবের আর্থিক স্বার্থ ফুটবলের ঐক্য ও সংহতিকে বিনষ্ট করতে পারবে না।’

default-image
বিজ্ঞাপন

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ অবশ্য সন্তুষ্ট যে ফ্রান্সের কোনো ক্লাব এই ইউরোপীয় সুপার লিগের উদ্যোগের সঙ্গে একমত হয়নি। তাঁর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ইউরোপীয় সুপার লিগ উদ্যোগে ফ্রান্সের কোনো ক্লাবের জড়িয়ে না পড়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানাচ্ছে। এই সুপার লিগ ফুটবলের ঐক্য ও সংহতির প্রতি হুমকি।’

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট স্পোর্টস গ্রুপ এই সুপার লিগ উদ্যোগে অন্য বিপদ দেখছে। তারা মনে করে, এটি বাস্তবায়িত হলে ফুটবলদুনিয়ায় ধনী ক্লাবগুলোকে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত করবে, ‘এই সুপার লিগ বাস্তবায়িত হলে ইউরোপের মহাধনী ক্লাবগুলো ইউরোপের সাধারণ ফুটবল কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেদের সুবিধাভোগী শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলবে। এটাতে কেবল ব্যবসা করা ছাড়া আর কোনো ব্যাপার নেই।’

ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ নামের একটি সংগঠনের মতে, ‘এই সুপার লিগ উদ্যোগ “অনৈতিক”, “অবৈধ” ও “দায়িত্বজ্ঞানহীন”একটা ব্যাপার। এটাতে ফুটবলের চিরায়ত প্রতিযোগিতামূলক সৌন্দর্যের কিছুই নেই।’

ইউরোপের ফুটবল–সমর্থকেরা আরও মনে করেন, আরও নির্দিষ্ট করে বললে এই ইউরোপীয় সুপার লিগ পুরোপুরিই লোভ ও লালসাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত। এর কেবল ধনী হওয়া ছাড়া আর কোনো ব্যাপার নেই। এই লিগ বাস্তবায়িত হলে নিজ দেশের ঘরোয়া লিগে ভালো পারফর্ম করার কোনো দায়ই থাকবে না অংশগ্রহণকারী দলগুলোর।

ইংলিশ ক্লাব টটেনহাম ইউরোপীয় সুপার লিগ-উদ্যোগের অন্যতম অংশ। ১২ ক্লাবের একটি তারা। তবে তাদের সমর্থকদের সংগঠন টটেনহাম সাপোর্টার্স ট্রাস্ট বিরোধিতা করছে এই সুপার লিগ-পরিকল্পনার। তারা বলছে, ‘এটি লোভ-লালসা ও ব্যক্তিস্বার্থে পরিকল্পিত একটি উদ্যোগ। এ ব্যাপারটি ফুটবল খেলার মৌল বিষয়কে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা এ উদ্যোগের বিরোধিতা করছি।’

সাবেক ইংলিশ তারকা গ্যারি লিনেকারও মনে করেন, ইউরোপীয় সুপার লিগের এ উদ্যোগ পুরোপুরি লোভ-লালসানির্ভর একটা ব্যাপার।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন