এভাবে আর গোল উদ্‌যাপন করা হবে না দুজনের।
এভাবে আর গোল উদ্‌যাপন করা হবে না দুজনের। রয়টার্স ফাইল ছবি

ত্রিফলা ভেঙে গেছে তিন বছর আগেই। নেইমারের আচমকা বিদায়ের পরও বার্সেলোনাকে টেনে নিচ্ছিলেন লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজ। দুধারি তলোয়ারের মতো লা লিগার রক্ষণকে তছনছ করছিলেন দুজন। ক্লাবের সব ফাঁকফোকর আড়াল করে দিচ্ছিলেন এ দুজন। কিন্তু গতকাল বিশ্বস্ত এক বন্ধুকে হারিয়েছেন মেসি। বার্সেলোনা থেকে অশ্রুভেজা চোখে বিদায় নিয়েছেন সুয়ারেজ।

মেসি ত্রিশ পেরিয়ে আগের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠলেও ধার হারিয়ে ফেলেছিলেন সুয়ারেজ। আগের মতো সেই ‘ফার্স্ট টাচ’ দেখা যায় না, অনেক বেশি গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন। এখন আর মাঠে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়তে পারেন না। গত মৌসুমে বড় একটা অংশ সময় তো মাঠের বাইরেই ছিলেন। তাই বার্সেলোনার নতুন কোচ রোনাল্ড কোমান দায়িত্ব নিয়েই ক্লাব থেকে বের হয়ে যাওয়ার দরজা দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁকে। কিন্তু তাঁর বিদায় নিয়ে বার্সার নাটক, তাঁকে অনেকটা জোর করে বের করে দেওয়ার ধরণ চোখে লেগেছে অনেকের। ক্লাবের এক কিংবদন্তির সঙ্গে এমন আচরণ নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন মেসি। বন্ধুর সঙ্গে অন্যায় আচরণ নিয়ে ক্লাবকে রীতিমতো ধুয়ে ফেলেছেন মেসি।

বিজ্ঞাপন

সুয়ারেজ যে আর আগের মতো নেই সেটা খেলা দেখলেই বোঝা যায়, পরিসংখ্যানও সে সাক্ষ্য দেয়। ইউরোপে গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি মৌসুমেই বার্সেলোনার বাদ পড়ার পেছনে তাঁর ব্যর্থতাও কম দায়ী নয়। প্রতিপক্ষের মাঠে গত ৫ বছরে কোনো গোল ছিল না সুয়ারেজের। সমর্থকেরাও অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। কোমানের নতুন বার্সেলোনায় তাই জায়গা হয়নি তাঁর। নতুন গন্তব্য খুঁজে নিয়েছেন সুয়ারেজ। গতকালই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিদায়ের কথা ঘটা করে জানিয়েছে বার্সেলোনা। লিগে প্রবল প্রতিপক্ষ আতলেতিকো মাদ্রিদে যোগ দিচ্ছেন বার্সার হয়ে একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও তিনটি লা লিগা জয়ী ফরোয়ার্ড।

যেভাবে তোমাকে ক্লাব থেকে বের করে দিল ওরা, এটা তোমার প্রাপ্য ছিল না কোনোভাবেই। কিন্তু সত্যিটা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে (ক্লাবে) যা হচ্ছে, তাতে আমি কোনো কিছুতেই আর অবাক হই না
লিওনেল মেসি, সুয়ারেজের চলে যাওয়া প্রসঙ্গে

বন্ধুর বিদায় নিয়ে একটু সময় নিয়েই মুখ খুলেছেন মেসি। আজ ইনস্টাগ্রামে একটা পোস্ট করেছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। সেখানে সুয়ারেজের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত থেকে সাতটি মুহূর্ত বেছে নিয়ে সেগুলো দিয়েছেন পোস্টে। আর আবেগ উগরে দিয়েছেন পোস্টের বিবরণে,

‘আমি বেশ কয়েক দিন ধরেই আভাস পাচ্ছিলাম এমন কিছু হতে যাচ্ছে, তবু আজ যখন লকার রুমে ঢুকলাম ব্যাপারটার গুরুত্ব পুরোপুরি টের পেলাম। তোমার সঙ্গে প্রতিদিন কাটাতে না পারা কী কঠিনই না হবে! সেটা মাঠে যেমন, মাঠের বাইরেও। তোমার অভাব খুব ভালোভাবে টের পাব আমি। কতগুলো বছর, কত শত মাতে (দক্ষিণ আমেরিকান পানীয়), কত লাঞ্চ, ডিনারের স্মৃতি...প্রতিটি দিন একসঙ্গে কাটানো সময়ের অনেক স্মৃতি যা ভোলা যাবে না কখনো।’

বিজ্ঞাপন
default-image

বার্সেলোনার জার্সিতে গত কিছুদিন সময়টা ভালো কাটেনি সুয়ারেজের। গত মৌসুম চোট, ফর্মহীনতা মিলিয়ে বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন উরুগুইয়ান। কিন্তু নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম বাজে এক মৌসুমেও ক্লাবকে ২১ গোল এনে দিয়েছেন। কিন্তু নতুন কোচ এসে সুয়ারেজকে কোনো সুযোগই দেননি। কোনো অনুশীলন সেশন দেখার আগেই বাতিল করে দিয়েছেন। ক্লাব সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউও সুয়ারেজকে যোগ্য সম্মান দেননি। প্রথমে ক্লাবের সঙ্গে সুয়ারেজের চুক্তির বাকি থাকা এক বছরের টাকাপয়সা নিয়ে ঝামেলা করলেন বার্তোমেউ। এর মধ্যেই ক্লাবকে সম্মান দেখিয়ে নিজ থেকেই ক্লাব খুঁজে নিচ্ছিলেন এই ফরোয়ার্ড। কিন্তু জুভেন্টাসে যাওয়ার চেষ্টা ভিসা জটিলতায় আটকে যাওয়ার পর আবারও ঝামেলা বাঁধিয়েছেন ক্লাব সভাপতি।

বার্সেলোনা থেকে বিনা বাধায় সুয়ারেজের ক্লাব ছাড়ার পথে চারটি ক্লাবের নামের পাশে বড় করে ‘না’ লিখে দেওয়া হয়েছিল—রিয়াল মাদ্রিদ, প্যারিস সেন্ট জার্মেই, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটিতে। সেই চার ক্লাবে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি সুয়ারেজ। পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আতলেতিকোকে। কিন্তু এখানেও ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করেন বার্তোমেউ। ‘নিষিদ্ধ’ তালিকায় শেষ মুহূর্তে আতলেতিকোর নামও ঢোকানোর চেষ্টা করেন। পরে সুয়ারেজের আইনজীবীদের ‘সব ফাঁস করে’ দেওয়ার হুমকিতে মতি ফেরে বার্সা সভাপতির।

বিজ্ঞাপন

গতকাল ক্লাব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার পর একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন সুয়ারেজ। সেখানে ক্লাব সভাপতিকে হালকা করে খোঁচাও দিয়েছেন সুয়ারেজ। তাঁকে প্রশ্নটা করা হয়েছিল, বার্সেলোনায় আপনার কোনো অনুতাপ আছে কি না। মজার ছলেই বার্তোমেউকে খোঁচাটা মেরেছেন সুয়ারেজ। মঞ্চে তাঁর ডানদিকে থাকা বার্তোমেউর দিকে মাথা কাত করে হাসিমুখে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, নাকি...’

বার্তোমেউ অবশ্য শুরুতেই শান্তি প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিলেন, ‘বার্সা সব সময়ই তোমার বাড়ি থাকবে। যেদিন তুমি ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নেবে, আশা করি সেদিন আমরা তোমাকে সম্মান জানিয়ে একটা ম্যাচের আয়োজন করতে পারব। তত দিনে এই মহামারিও চলে গেলে সব সমর্থককে নিয়ে তোমাকে বিদায় জানাতে পারব।...মাঠ ও মাঠের বাইরে খুশি হও এটাই চাইব। আমাদের অনেক কিছু দিয়েছ, আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’

বিজ্ঞাপন
default-image

ক্লাব সভাপতির মিঠে কথায় আর যে-ই ভুলুক, মেসি ভোলেননি। কিছুদিন আগেই ক্লাব সভাপতির ওপর রাগ করেই ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রেও তাঁকে দেওয়া কথা রাখেননি বার্তোমেউ। বরং অযথা কাঁদা ছোড়াছুড়িতে পুরো বিষটি নোংরা করে তোলা হয়েছিল। প্রিয় বন্ধুর বিদায়ের সময়টায়ও বার্সেলোনার এই বোর্ড যা করেছে, সেটা মানতে পারেননি মেসি। ইনস্টাগ্রামের পোস্টে লিখেছেন,

‘তোমাকে অন্য কোনো জার্সিতে দেখাটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার হবে, আর তোমার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারটা তো আরও বেশি। ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবেই বিদায়টা প্রাপ্য ছিল তোমার, ব্যক্তিগত ও দলীয় শিরোপা জয়ের আনন্দের মধ্যে। যেভাবে তোমাকে ক্লাব থেকে বের করে দিল ওরা, এটা তোমার প্রাপ্য ছিল না কোনোভাবেই। কিন্তু সত্যিটা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে (ক্লাবে) যা হচ্ছে, তাতে আমি কোনো কিছুতেই আর অবাক হই না।’

প্রিয় বন্ধুর বিদায় বার্তার শেষটুকু এমন অপ্রিয় বার্তায় শেষ করতে চাননি মেসি। তাই নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এখন থেকে শিরোপার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে খেলবেন জেনেও সুয়ারেজকে শুভকামনা জানিয়েছেন, ‘নতুন যাত্রায় তোমার জন্য শুভকামনা। তোমাকে খুব ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালোবাসি। খুব শিগগিরই দেখা হবে, বন্ধু।’

মন্তব্য পড়ুন 0