সেই রাতেও মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণে বসে সতীর্থ ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিনি। মুড়িমাখা আর চা খাওয়ার সঙ্গে চলছিল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। বাঙালির আড্ডায় রাজনীতি থাকবে না, সেটা কী করে হয়! ১৯৭১ সালের মার্চের সেই সন্ধ্যার রাজনৈতিক আলোচনায় মিশে ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে নিজেদের অস্তিত্ব আর ভবিষ্যৎ ভাবনাও। কিন্তু তখনো তিনি ঘুণাক্ষরে ভাবেননি, কী নিদারুণ দুর্যোগ নেমে আসছে বাঙালিদের ওপর। মাত্র একটা রাতই বদলে দিতে যাচ্ছে একটি জাতি, একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ তো বটেই।

বলা হচ্ছে খোন্দকার মো. নূরুন্নবীর কথা। ঢাকার মাঠের পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো জনপ্রিয় এক দলের গোলরক্ষক। তত দিনে খেলে ফেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলেও। জাতীয় দলের ব্লেজার গায়ে চাপিয়ে রীতিমতো উড়ছেন। খেলা না থাকলে ভেসপা নিয়ে শহরে ঘুরে বেড়ান। এই খোন্দকার নূরুন্নবীই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পুরো অন্য মানুষ। সেই ভয়াল রাতে স্বজাতির যে অপমান চোখের সামনে দেখেছিলেন, সেটি তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়। প্রতিশোধের স্পৃহা জ্বলে উঠল। ফুটবল-ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে চলে গেলেন জাতির মুক্তির যুদ্ধে যোগ দিতে। তারকাদ্যুতির চাকচিক্য পায়ে ঠেলে বেছে নিলেন রণাঙ্গনের জীবনকে।

default-image

এরপর মুক্তিযুদ্ধের অনন্য এক সেনানী হয়েই কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার আক্ষেপ তাঁকে কখনোই পেয়ে বসেনি। যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। অধিষ্ঠিত হয়েছেন সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে। দেশের মুক্তির জন্য উজ্জ্বল ফুটবল ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দেওয়ার অনন্য নজির গড়েই খোন্দকার মো. নূরুন্নবী ঠাঁই নেন ইতিহাসে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত। সেদিন মোহামেডান ক্লাব থেকে আড্ডা শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল। হাতমুখ ধুয়ে মুখে কিছু দিয়েছেন কি দেননি, এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় তাণ্ডব। বুঝতে পারছিলেন না কী হচ্ছে চারদিকে। বুলেট, বোমা আর মেশিনগানের কান ফাটানো শব্দ। মানুষের আহাজারি। ঢাকার আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে কি! বুঝে যান, প্রিয় স্বদেশ আক্রান্ত, আক্রান্ত বাঙালি জাতি।

default-image
বিজ্ঞাপন

মে মাসে প্রতাপ শংকর হাজরার পরিবারকে সীমান্ত পার করে নিয়ে যান ভারতের আগরতলার শরণার্থী শিবিরে। নিজের চোখে দেখলেন কী অসহায় সেই জীবন! আগরতলা থেকে কলকাতায় গেলে দেখা হয় মোহামেডান ও পাকিস্তান জাতীয় দলের সতীর্থ মেজর হাফিজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে। হাফিজ তখন ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ইউনিট নিয়ে বিদ্রোহ করে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়েছেন। কলকাতায় নূরুন্নবী হাফিজউদ্দিন আহমদকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানালেন। হাফিজ একটু দ্বিধার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু সতীর্থের তীব্র আকুতির কাছে হার মানেন তিনি। নূরুন্নবীকে বাতলে দেন যুদ্ধে যাওয়ার রাস্তা।

৫০ বছর পর আজও সেই সময়ের কথা মনে করে আপ্লুত হন মেজর হাফিজ, ‘নূরুন্নবী খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মাঠে ভদ্র খেলোয়াড় যাকে বলে, নূরুন্নবী ছিলেন তা-ই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় যখন দেখা হলো, তখন দেখি ওই শান্ত স্বভাবের মানুষটিই বদলে গেছেন। কী এক প্রতিশোধস্পৃহা তাঁর মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি নূরুন্নবীকে প্রথমে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা বলি। কিন্তু তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। আমি তখন তাঁকে যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার পরামর্শ দিই।’

default-image

এই প্রশিক্ষণ শিবির থেকেই বের হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচের অফিসারেরা। নূরুন্নবী প্রশিক্ষণ নিয়ে কমিশন পান দ্রুতই। এরপর কুষ্টিয়া অঞ্চলে চলে যান যুদ্ধ করতে। অস্ত্র হাতে নেমে পড়েন মাতৃভূমিকে রক্ষায়। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতায় রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আসলে ওই একটা রাতই বদলে দিয়েছিল তাঁকে। নইলে ফুটবল নিয়েই ছিল তাঁর সব স্বপ্ন। ১৯৬৫ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে করেছিলেন ইরান সফর। খেলেছিলেন পাকিস্তান, তুরস্ক আর ইরানকে নিয়ে আয়োজিত সে সময়ের বিখ্যাত আরসিডি টুর্নামেন্টে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ছয় বছরের মাথাতেই তিনি বিসর্জন দেন ফুটবল নিয়ে সব স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের পর তো জীবনের গতি আরও বদলে যায়। সেনাবাহিনীতে উঠেছেন চতুর্থ সর্বোচ্চ পদে। অবসরে যান মেজর জেনারেল হিসেবে।

মুক্তিযুদ্ধের পর খেলতে পারতেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলেও। সে সময় তাঁর মানের গোলরক্ষক আর কে ছিল! কিন্তু এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিল না খোন্দকার নূরুন্নবীর। জীবিত অবস্থায় প্রথম আলোর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া এবং দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করাটাকে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠতম ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি, ‘মাত্র ছয় বছর ফুটবল খেলেছি। মুক্তিযুদ্ধ না হলে অন্তত ১২ বছর খেলতে পারতাম। কিন্তু দেশ মাতৃকার ডাক অন্য জিনিস। আমি সে ডাক শুনতে পেয়েছিলাম। আমাদের প্রজন্ম শুনতে পেয়েছিল। কী গর্বের সেই দিনগুলো! না, আমার কোনো আক্ষেপ নেই। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমি কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এটা অনেক বড় গর্বের বিষয়।’

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে খোন্দকার নূরুন্নবী চলে যান না ফেরার দেশে। তবে স্বাধিকারের যুদ্ধে বীর হিসেবে এ দেশের ইতিহাসে তিনি রয়ে যাবেন চিরকাল।

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন